আজকের পত্রিকা করপোরেট কর্নার মত-বিশ্লেষণ

‘চাকরি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে লক্ষণীয় বিষয়’

আমরা করপোরেট জব করি। আমাদের অনেকে চাকরির নানা বিষয় ভালোই বুঝি। আর সেই আমরাই আবার মাঝে মাঝে আমাদের কৃতকর্মের জন্য বোকা বনে যাই অহরহ? তবে বিষয়টি সবার ক্ষেত্রে সব সময় প্রযোজ্য নাও হতে পারে। নতুন কোম্পানিতে অতিরিক্ত পারিশ্রমিক ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে যোগদান করেছেন, সেক্ষেত্রে আপনার সিদ্ধান্ত কি সঠিক ছিল?

নতুন কোম্পানিতে যোগদানের আগে তো অনেক হিসাব কষেছেন, কিন্তু যোগদানের পর দেখলেন অনেক কিছুরই অমিল, তখন আপনার চাকরির ঝুঁকি বাড়ল না কমল-ভেবে দেখেছেন কি?

-আপনার স্যালারি কি ঠিক সময়মতো পাচ্ছেন?
-বোনাস কি কমিটমেন্ট মতো পাচ্ছেন?
-প্রফিট শেয়ারিং কি ঠিকমতো পাচ্ছেন?
-ইনক্রিমেন্ট রেট কি সঠিক আছে?
-দরকারি ট্রেনিং কি কমিটমেন্ট অনুযায়ী পাচ্ছেন? কর্মঘণ্টা, ছুটি, দৈনন্দিন কাজের চাপ, যা আপনাকে ইন্টারভিউ বোর্ডে বলা হয়েছিল এবং যা আপনি তাদের সঙ্গে মধ্যস্থতা করেছিলেন-এগুলো কি সব ঠিক আছে?

১. শুরুতেই আপনার নতুন বসকে নিয়ে আলোচনা করা যাক

নতুন বস আপনাকে অনেক চাপের মধ্যে রেখেছেন, যে বিষয়টি নতুন চাকরিতে যোগদানের আগে বোঝা আপনার পক্ষে খুবই কঠিন ছিল। দেখুন তো নতুন কর্মস্থলের বস আপনার একটু ভুলের জন্য বকাঝকা করছেন, একপর্যায়ে আপনার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন এবং উচ্চতর কর্তৃপক্ষের কাছে পর্যন্ত আপনার ব্যাপারে নালিশ করছেন। এর ফলে আপনি নতুন উদ্যমে কাজ করার মনোবল হারাচ্ছেন। তাহলে কি আপনার আগের বসই ভালো ছিলেন? তো চাকরি কেন ছাড়লেন?

২. কর্মপরিবেশ

নতুন চাকরিতে যোগদানের কিছুদিনের মধ্যেই আপনি টের পেলেন সেখানকার কর্মপরিবেশ যেমন প্রত্যাশা করেছিলেন, তেমন নয়। লক্ষ করলেন, নতুন কর্মস্থলে অফিস পলিটিক্স অনেক বেশি এবং অনেকেই এর কথা ওকে বলছে, ওর কথা একে বলছে। এতে অন্যের প্রতি আস্থা রাখবেন কী করে? আর দৃঢ় মনোবল নিয়ে এগোবেন কীভাবে? দেখলেন, এ বিষয়গুলো তো আগের কোম্পানিতে ছিল না? তাহলে কি আপনার নতুন চাকরিতে যোগদান করা ভুল হলো?

৩. নতুন কিছু শেখা

আপনি তো নতুন কোম্পানিতে যোগদান করেছেন প্রায় এক বছর হলো। আপনি কি ওখানে নতুন কিছু শিখেছেন? ধরি আপনার বস, কর্মপরিবেশ সবই ভালো। তাহলে ওই ভালো পরিবেশ থেকে এবং ওই ভালো বসের কাছ থেকে গত এক বছরে কি নতুন কিছু শিখেছেন? চাকরিটা তো পরিবর্তন করেছেন, কারণ আপনার উচ্চাকাক্সক্ষা আছে এবং আপনি আপনার আগের প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত শেখার সুযোগ পেতেন, যা বর্তমান (নতুন কোম্পানিতে) কোম্পানিতে পাচ্ছেন না! তাহলে কি আপনার নতুন চাকরিতে যোগদান করা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল?

৪. বাসস্থান থেকে কর্মস্থলের দূরত্ব

বর্তমান কর্মস্থল বেশি দূরত্বে থাকা সত্তে¡ও এ চাকরি নিয়েছিলেন, কিন্তু দেখা গেল কোম্পানির গাড়ি (ট্রান্সপোর্ট) ব্যবহারের সুবিধা পাওয়া গেলেও গাড়ি আপনাকে প্রতিদিন বাসা থেকে জ্যাম ঠেলে নিয়ে যেতে তিন ঘণ্টা আর নিয়ে আসতে তিন ঘণ্টা সময় নিচ্ছে! অথচ আগের কর্মস্থলে আপনি পায়ে হেঁটে অফিসে যেতেন? সেক্ষেত্রে তো আগের চাকরিটাই ভালো ছিল!

৫. কর্মঘণ্টা

আপনি আগের কোম্পানিতে সপ্তাহে এক দিন বা দুই দিন ছুটি কাটিয়েছেন এবং কর্মঘণ্টা ছিল প্রতিদিন আট থেকে ৯ ঘণ্টা। আর এখন যেখানে আছেন সপ্তাহে সেখানে এক দিন বন্ধ, কিন্তু কর্মঘণ্টার কি হিসাব করেছেন? বর্তমান কর্মস্থলে কি ওই আট থেকে ৯ ঘণ্টা কাজ করতে হয়, নাকি তার চেয়েও বেশি? যদি অফিস একটু দূরে হয় তাহলে কত ঘণ্টা আপনার অপচয় হচ্ছে প্রতিদিন আসা-যাওয়ায়? সপ্তাহে এক দিন বন্ধ আর বর্তমান অফিসে যেতে-আসতে যে সময় অপচয় হচ্ছে, তার কি কোনো গাণিতিক হিসাব কখনও কষেছেন? তাহলে কি আগের চাকরিটাই ভালো ছিল?

৬. ডিপার্টমেন্টের লোকবল

বর্তমানে কর্মরত ডিপার্টমেন্টে কতজন লোক কাজ করছেন? দেখুন তো আগের কর্মস্থলের চেয়ে কম বা বেশি কি না? যদি বেশি হয় তাহলে তো কথাই নেই (যদিও এটা নির্ভর করে কোম্পানির ‘কি রেজাল্ট এরিয়া’র (কেআরএ) ওপর, আর যদি লোকবল কম হয়, সেক্ষেত্রে ভেবে দেখেছেন কি আগে যেখানে কাজ করতেন একটা সুগঠিত টিমের সহায়তায় আর এখন সেখানে অল্প কয়েকজন নিয়ে বিশাল অপারেশনের দায়িত্ব নিয়েছেন এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বলেছে, আপাতত আর কোনো লোকবল নেওয়া হবে না। হয়তো কখনও কখনও আপনাকে একাই সম্পূর্ণ কাজ সামলাতে হতে পারে, যা আপনি যোগদানের আগে বুঝতে পারেননি, যদিও যোগদানের আগে অনেক হিসাব কষেছেন বর্তমান কোম্পানি নিয়ে। তাহলে চাকরিটা কি একটু রিস্কি হয়ে গেল না!

৭. আপনি ইন্টারভিউয়ে মধ্যস্থতা করলেন যে, বাংলাদেশের যেকোনো জায়গায় কাজ করতে আগ্রহী এবং দেখা গেল যোগদানের দু-তিন মাসের মধ্যে দেশের একটা প্রত্যন্ত এলাকায় আপনাকে ট্রান্সফার করা হলো এবং সেখানে চলেও গেলেন। সেখানে প্রথমে নিজের মনকে মানিয়ে রাখলেও পরে আপনি ওখানকার পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারলেন না।

দেখা যাচ্ছে, প্রায়ই অসুস্থতা বোধ করছেন, কোনোভাবেই খাপ খাওয়ানো যাচ্ছে না। আবার মাঝে মাঝে দেখা যায়, আপনার ক্যারিয়ার প্ল্যান ছিল যে উচ্চতর কোনো ডিগ্রি নেবেন, কিন্তু যোগদান ও দর কষাকষির সময়ে আপনার এ বিষয়টি মাথায়ই ছিল না, যদিও আপনি অন্যান্য সিদ্ধান্তকে বেশি প্রাধান্য দিতে গিয়ে এটা আমলে নেননি। তাহলে চাকরি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত কি ঠিক ছিল?

যাহোক, টাকা আসবে-যাবে এবং উপার্জন তো আপনিই করবেন এবং করছেনও। সামান্য কিছু অতিরিক্ত পারিশ্রমিক আপনাকে সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধান নাও দিতে পারে। তাই চাকরি পরিবর্তনের আগে বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বসহ ভেবে নিন।

নিজের পরিবারকে সময় দিন, নিজেকে পুরস্কৃত করুন এবং শুধু টাকার পেছনে ছুটবেন না। হ্যাঁ, সঠিক ক্যারিয়ার প্ল্যান নিয়েই এগিয়ে যান (এ বিষয়ে ভুলটা যাতে না হয়, সেদিকে লক্ষ রেখে অবশ্যই), জীবন উপভোগ করুন, মানসিক প্রশান্তি নিন এবং পরিবার ও অন্যরা যারা আপনার ওপর নির্ভরশীল তাদের নিয়ে নিজে বাঁচুন।

মো. মশিউর রহমান
প্রধান মানবসম্পদ কর্মকর্তা
বিআরবি হসপিটালস লিমিটেড

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..