প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

চাঙা পুঁজিবাজার: কারসাজি রোধে নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ বিএসইসির

 

নিয়াজ মাহমুদ: দেশের পুঁজিবাজারে সূচকের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। গত দুই মাসে সূচক ও লেনদেন ধীরে ধীরে বেড়েছে। চলতি বছরে সূচক ও লেনদেন বেড়েছে বড় ব্যবধানে। এ সুযোগ নিয়ে কেউ কোনো কারসাজির চেষ্টা করছে কি না, মার্জিন ঋণ নিয়ে কোনো অনিয়ম হচ্ছে কি না, এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে আরও কঠোর হচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

কারসাজি রোধে কমিশনার ও নির্বাহী পরিচালক পর্যায়ে একটি জরুরি বৈঠকও করেছে সংস্থাটি। বৈঠকে সার্ভিল্যান্স বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগকে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া সম্প্রতি কিছু কোম্পানির শেয়ারদর অস্বাভাবিকভাবে বাড়ার বিষয়টিও নজরে নিয়েছে বিএসইসি। এক্ষেত্রে তদন্ত কমিটি গঠনেরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ওই বৈঠকে।

এ প্রসঙ্গে গতকাল বৃহস্পতিবার কথা হয় বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সাইফুর রহমানের সঙ্গে। তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, ‘পুঁজিবাজার ভালো করার জন্য আমাদের উদ্যোগ আগে থেকেই নেওয়া আছে। বাজারে আস্থার সংকট ছিল, এখন সেই সংকট দূর হয়েছে। তাই বাজার ভালোর দিকেই এগোচ্ছে। তবে এ সুযোগে যেন কেউ অনিয়ম করতে না পারে, সে বিষয়ে বিএসইসি আরও কঠোর হয়েছে। ইতোমধ্যে নানা উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে’ বলে জানান তিনি।

তবে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বাজার মৌলের ভিত্তিতে সূচক বাড়লে সেটি নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই বলেও বৈঠকে মত দেওয়া হয়।

উল্লেখ্য, গত বুধবার অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিএসইসির চেয়ারম্যান ড. এম খায়রুল হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সব কমিশনার, একাধিক নির্বাহী পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।

বৈঠকে অংশ নেওয়া বিএসইসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বাজারে লেনদেন বৃদ্ধি নিয়ে আমাদের কোনো উদ্বেগ নেই। কোনো নীতিমালায়ও কোনো পরিবর্তন আনা হচ্ছে না। বাজারে দৈনিক ৩০০ কোটি টাকার লেনদেনের সময় সংশ্লিষ্টদের যে সহযোগিতা করা হয়েছে, তার ধারাবাহিকতা এখনও বজায় থাকবে। আমরা শুধু সতর্ক থাকতে চাই, বাজারের গতিশীলতার সুযোগে যাতে কোনো অনিয়ম বা আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড না হয়। তাই মনিটরিং বাড়ানো এবং কোনো অনিয়ম চিহ্নিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

চলতি বছরে মাত্র এক দিনের মূল্য সংশোধনের পর থেকে অনেকটা লাগামহীনভাবেই যেন ছুটছে পুঁজিবাজার। গত চার দিনে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স বেড়েছে যথাক্রমে ৫৬, ৬২, ৫৬ ও ৯ পয়েন্ট। চার দিনে ডিএসইএক্স মোট ১৮৪ পয়েন্ট বেড়েছে। বুধবার আগের সাড়ে পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ লেনদেন হয়।

পুঁজিবাজার ইতিবাচক ধারায় চলতে থাকার বিষয়টি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত রোববার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত দেশের পুঁজিবাজার নিয়ে ইতিবাচক বক্তব্য দিয়েছেন। এতে বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজার নিয়ে আশাবাদী। তাই গত দুদিনে পুঁজিবাজারে সূচক ও লেনদেনের বড় উল্লম্ফন ঘটেছে বলে মনে করছেন তারা।

এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক পুঁজিবাজার সম্পর্কে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে বর্তমানে বিনিয়োগের ‘স্বর্গ’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। যার ইতিবাচক প্রভাব পুঁজিবাজারে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তারা বলছেন, বাজার উন্নয়নের বিষয়ে সরকারের প্রতি বিনিয়োগকারীরা আস্থা রাখতে চাইছেন। পাশাপাশি বড় মূলধনি কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকেও তোড়জোর শুরু হয়েছে। যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বাজারে। পরবর্তী সময়ে এ ধারা বিদ্যমান থাকতেও পারে বলে মনে করছেন তারা।

বাজারের বর্তমান অবস্থা নিয়ে কথা হয় আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনিরুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, বাজারে বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। সঙ্গে বাড়ছে তারল্য। অন্যদিকে মার্জিন লোনের প্রতি বিনিয়োগকারীরা উৎসাহিত হচ্ছেন।

দেশের পুঁজিবাজারের এ উল্লম্ফন গত বছরের নভেম্বর থেকেই বজায় রয়েছে। তবে গত দুই মাসে সূচক ও লেনদেন ধীরে ধীরে বেড়েছে। আর চলতি সপ্তাহের দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ কার্যদিবস সূচক ও লেনদেন বেড়েছে বড় ব্যবধানে।

সূচকের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় আবারও পুঁজিবাজারমুখী হচ্ছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। এর সঙ্গে বাড়ছে বিও অ্যাকাউন্ট সংখ্যা। বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, সব মিলিযে পুঁজিবাজারে এখন ইতিবাচক প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। তবে পুঁজিবাজারে ধারাবাহিক উত্থানে এর মধ্যে কিছুটা হলে শঙ্কায় রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। তারা এ বাজারে বিনিয়োগ করবেন কি করবেন না, তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছেন। কারণ ২০১০ সালে এমন বাজারে বিনিয়োগ করে তাদের চরম মূল্য দিতে হয়েছিল। অন্যদিকে সংশ্লিষ্টরা বলছেন,  বাজার এখনও ঝুঁকিপূর্র্ণ হয়নি তবে টানা উত্থান বা টানা পতন কোনোটাই পুঁজিবাজারের জন্য শুভ লক্ষণ নয়। সে কারণে তারা বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন।

এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, পুঁজিবাজার এক্ষুনি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে, আমি সেটা মনে করছি না। নিয়ম অনুযায়ী সূচক যদি প্রতিদিন ১ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পায় তবে সেটাকে ঝুঁকিপূর্ণ বলা যায়। আমাদের বাজারে এখনও তা হচ্ছে না। তবে বর্তমানে ভালো শেয়ারের পাশাপাশি কিছু দুর্বল কোম্পানির শেয়ারের দর বাড়ছে, এটা মোটেও স্বাভাবিক নয়। এসব কোম্পানিতে বিনিয়োগ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। আর ঊর্ধ্বমুখী বাজারে এসব কোম্পানি সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করে। তাই বিনিয়োগকারীদের এখনই সতর্ক থাকা দরকার। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেও আরও কঠোর হওয়ার পরামর্শ দেন প্রবীণ এ অর্থনীতিবিদ।