দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

চাঙা হওয়ার আভাস দিচ্ছে পুঁজিবাজার

মুস্তাফিজুর রহমান নাহিদ : করোনাভীতি আর পতনের রেশ ধরে পুঁজিবাজার ছেড়ে গিয়েছিলেন বিনিয়োগকারীরা; যার ফলে আশঙ্কাজনকহারে কমে গিয়েছিল লেনদেন। একইভাবে সূচক এবং বাজার মূলধনও আশঙ্কাজনকহারে কমে যায়। পরিস্থিতি বিবেচনায় ফ্লোর প্রাইস বেঁধে দেওয়া হয়।

যদিও এ প্রক্রিয়া নিয়ে শঙ্কায় ছিলেন বিনিয়োগকারীরা। যে কারণে বাজারের সার্বিক অবস্থাও নাজুক ছিল। সম্প্রতি সেই পরিস্থিতি কেটে গেছে। সব ভীতি কাটিয়ে পুঁজিবাজারে ফিরে আসছেন বিনিয়োগকারীরা। ফলে বাজারেও চাঙাভাব ফিরে এসেছে।

সাম্প্রতিক বাজারচিত্র লক্ষ্য করলে দেখা যায়, গতকাল নিয়ে টানা ১০ কার্যদিবস ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে পুঁজিবাজার। এই সময়ে ডিএসইর প্রধান সূচক বেড়েছে ২৮৮ পয়েন্ট বা প্রায় ৭ শতাংশ। ১০ দিন আগে সূচকের অবস্থান ছিল ৪ হাজার ৭৬ পয়েন্টে। গতকাল তা স্থির হয়েছে ৪ হাজার ৩৬৪ পয়েন্টে। অর্থাৎ এই সময়ে দৈনিক গড়ে সূচক বেড়েছে ২৮ পয়েন্ট করে।

এদিকে ১০ কার্যদিবসের ব্যবধানে লেনদেন বেড়েছে ৫৮৯ কোটি টাকা। ১০ দিন আগে ডিএসইতে লেনদেন ছিল ২৪৭ কোটি টাকা। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে লেনদেন বাড়তে থাকে। গতকাল দিনশেষে লেনদেন দাঁড়ায় ৮৩৬ কোটি টাকা। অন্যদিকে এই সময়ে বেশিরভাগ দিনই অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারদর বাড়তে দেখা গেছে। যে কারণে বেড়েছে বাজার মূলধনও। আলোচিত এই সময়ে ডিএসইতে তালিকাভুক্ত কোম্পানির বাজার মূলধন বেড়েছে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা।

এদিকে বাজার পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে লেনদেনের সময় ৩০ মিনিট করে বাড়িয়েছে উভয় স্টক এক্সচেঞ্জ। আগামী রোববার থেকে উভয় স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেন ১০টায় শুরু হয়ে ২টা ৩০ মিনিটে শেষ হবে। গতকাল পর্যন্ত লেনদেন শুরু হওয়ার সময় ছিল সকাল সাড়ে ১০টা।

বর্তমান বাজার পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ করলে পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা বলেন, পুঁজিবাজারে বহু আগে থেকেই অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার বিনিয়োগ যোগ্য অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন বাজারের সার্বিক পরিবেশ ভালো না থাকায় বিনিয়োগকারীরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। মূলত এ কারণেই বাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। পরে করোনাভাইরাস আতঙ্কের কারণে বাজার আরও তলানিতে চলে যায়। অন্যদিকে ফ্লোর প্রাইস নিয়েও বিনিয়োগকারীদের ভয় ছিল। এতে তারা বিনিয়োগ কমিয়ে দেন। ফলে বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এখন বিনিয়োগকারীরা এসব ভীতি কাটিয়ে বাজারে ফিরছেন। ফলে বাজার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে।

জানতে চাইলে ডিএসইর পরিচালক শাকিল রিজভী শেয়ার বিজকে বলেন, ‘বিনিয়োগকারীরা ফিরে আসছেন এটা পুঁজিবাজারের জন্য শুভ লক্ষণ। কারণ তারা বিনিয়োগবিমুখ থাকলে বাজার কখনোই স্বাভাবিক হতে পারবে না। তারা ফিরে আসা আমাদের জন্যও ভালো খবর। এতে তারা যেমন উপকৃত হবেন, বাজারও ভালো হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।’

এদিকে বাজার ভালো হওয়ার কারণে ব্রোকারেজ হাউসগুলোতেও বিনিয়োগকারীদের উপস্থিতিও বেড়েছে। গতকালও হাউসগুলোয় বিনিয়োগকারীদের উপস্থিতি ছিল সন্তোষজনক। অথচ কিছুদিন আগে বেশিরভাগ হাউসে বিনিয়োগকারীদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যেত না। তবে হাউসে ফিরলেও তাদের মধ্যে এক ধরনের শঙ্কা কাজ করছে। বাজার কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও তা স্থিতিশীল হবে কি নাÑএ নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করছে তাদের মধ্যে। তারা একটি দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল পুঁজিবাজার চান।

বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলাপ করলে তারা জানান, কয়েকদিন থেকে বাজারচিত্র কিছুটা স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। বাজারে যদি এই পরিবেশ স্থায়ী হয় তাহলে হয়তো এখানে বিনিয়োগের পরিবেশও ফিরে আসবে। আমরাও কিছুটা মুনাফা করতে পারব। তবে বাজার ঘুরে দাঁড়ালে সবসময়ই কিছু সুযোগসন্ধানীরা এখান থেকে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করেন। তাই বাজারের প্রতি নজর রাখার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান তারা।

প্রসঙ্গত, গত ২০১০ সালে পুঁজিবাজার পরিস্থিতি যখন খুবই ভালো ছিল, তখন ডিএসইর দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ ছিল আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার কোটি টাকা। কারণ তখন পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের উপচেপড়া ভিড় ছিল। ফলে লেনদেনও বেশি হতো। সে কারণে ঢাকার প্রতিটি হাউসে গড়ে ৩০ কোটি টাকা লেনদেন হতো। পরবর্তী সময়ে বাজার মন্দা যাওয়ায় তা অনেক নিচে নেমে যায়। বিনিয়োগকারীরাও বাজার ছেড়ে চলে যায়, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে ব্রোকারেজ ব্যবসায়। এখন পুঁজিবাজার পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হওয়ায় ব্যবসাও ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি ব্রোকারেজ হাউসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, ‘বিনিয়োগকারীদের বাজারে ফিরে আসা মানে লেনদেন বৃদ্ধি পাওয়া। তারা লেনদেন না করলে ব্যবসা চালিয়ে নিতে আমাদের খুব বেশি বেগ পেতে হয়। সেই সময় আমরা বাধ্য হয়েই কর্মী ছাঁটাই করি। একসময় আমাদের হাউসে লেনদেন হতো ৭০ কোটি টাকা। পরে তা অস্বাভাবিক হারে কমে যায়। করোনায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। এখন বাজার ভালোর দিকে যাচ্ছে। আশা করছি, আমাদেরও সুদিন ফিরে আসবে। তবে এর জন্য দরকার ধারাবাহিক স্থিতিশীলতা।’

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..