দিনের খবর মত-বিশ্লেষণ

চামড়াশিল্প বাঁচাতে নতুন করে ভাবতে হবে

আফসারুল আলম মামুন : পাটের সোনালি দিন অনেক আগেই চলে গেছে। এরপর চামড়া ও চামড়াজাত শিল্প এদেশের অর্থনীতির জন্য স্রষ্টার আশীর্বাদ হয়ে এলেও কয়েক বছর ধরে তার অবস্থাও রুগ্ণ। কিন্তু কিছু বছর আগেও কাঁচামালের পর্যাপ্ততার পাশাপাশি মূল্য সংযোজনের হিসেবে কোনো একটি নির্দিষ্ট খাত থেকে এদেশের সবচেয়ে বেশি রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস ছিল চামড়া ও চামড়াজাত শিল্প। যদিও এখনও এই শিল্পে প্রায় দুই লাখ কর্মী নিযুক্ত রয়েছেন এবং ভবিষ্যতে আরও কয়েক লাখ কর্মী নিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রায় ২২০টি ট্যানারি, তিন হাজার ৫০০টি ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান, প্রায় ৯০টি বড় সংস্থা এবং ১৫টি বড় প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে চামড়াশিল্প গঠিত। এখনও দেশে বছরে ৩১০ মিলিয়ন বর্গফুট চামড়ার কাঁচামাল উৎপাদিত হয়। দেশের প্রায় ৭৬ শতাংশ ট্যানারি রপ্তানিমুখী। ফরাসিদের ‘ফ্রেঞ্চ কাফেরথের পর মানের দিক থেকে আমাদের দেশের চামড়াই দুনিয়ার সেরা। চামড়াশিল্পের বোদ্ধারা মনে করেন, এরকম স্মুথ গ্রেইনের চামড়া বিশ্বের আর কোথাও মেলে না। কিন্তু আজ দেশের সম্ভাবনাময় চামড়াশিল্পে চরম হতাশা দেখা দিয়েছে। ধারাবাহিকভাবে রপ্তানি ধসে মুষড়ে পড়েছেন এ শিল্পের উদ্যোক্তারা। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় স্রোতের উল্টো পথে চলছে বৃহত্তর এই রপ্তানি খাত। প্রতি বছরই কমছে রপ্তানি আয়। রপ্তানিকারক হারাচ্ছেন বিশ্ববাজার। বেকার হচ্ছেন চামড়াশিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হাজারো শ্রমিক। কিন্তু কিছুদিন আগেও চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বিরাট বাজার এদেশের হাতে ছিল।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে ৩৫টি মাঝারি ও ২৫টি ক্ষুদ্র ট্যানারি নিয়ে এদেশে চামড়াশিল্পের যাত্রা শুরু হয়। এর মধ্যে ৩৫টি মাঝারি ট্যানারির মধ্যে অবাঙালি মালিকানাধীন ৩০টি ট্যানারি সরকার অধিগ্রহণ করে, যদিও তখন রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকা এসব ট্যানারি লাভজনক শিল্পে রূপ নিতে পারেনি। ফলে বিরাষ্ট্রীয়করণ প্রক্রিয়ায় এসব ট্যানারি পরে ব্যক্তিমালিকানায় চলে যায়, যার পরিক্রমায় বর্তমানে দেশে ট্যানারির সংখ্যা প্রায় ২২০টির মতো। এগুলো থেকে প্রতি বছর কাঁচা চামড়াসহ চামড়াজাত হাজারো পণ্য উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ থেকে বর্তমানে প্রক্রিয়াজাত চামড়ার পাশাপাশি চামড়া থেকে তৈরি জুতা, জ্যাকেট, বেল্ট, ব্যাগ, ওয়ালেট, হাতমোজাসহ চামড়ার তৈরি হস্তশিল্পের নানা পণ্য বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। বাংলাদেশি চামড়ার বড় বাজারগুলোর মধ্যে রয়েছেÑজাপান, জার্মানি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, ব্রাজিল, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য, স্পেন, পোল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ভারত, ইতালি, অস্ট্রেলিয়া, তাইওয়ান ও সিঙ্গাপুর। তবে বাংলাদেশের চামড়াজাত পণ্যের সবচেয়ে বড় ক্রেতা জাপান। শুরু থেকেই এ দেশটি বাংলাদেশে তৈরি চামড়ার জুতায় ‘ডিউটি ও কোটা ফ্রি’ সুবিধা চালু রেখেছে। চামড়াজাত পণ্যের মোট রপ্তানি পণ্যের ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশই যায় জাপানে। টাকার হিসাবে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে আয় হয় ১১৩ কোটি ডলার। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রপ্তানি আয় বেড়ে দাঁড়ায় ১১৬ কোটি ডলারে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এই আয়ের পরিমাণ আরও বেড়ে হয় ১২৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার। কিন্তু ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রপ্তানি আয় অস্বাভাবিকভাবে কমে ১০৮ কোটি ৫৪ লাখ ডলারে দাঁড়ায়। ওই অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য খাতে রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১২ কোটি ডলার। আয় হয়েছে ১০১ কোটি ডলার। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এ ক্ষেত্রে আয় কম হয়েছে ৯ দশমিক ২৭ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে আয় হয়েছে ৪৭ কোটি ৫৮ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে রপ্তানি আয় থেকে ১০ দশমিক ৬১ শতাংশ কম। অর্থবছরের ষষ্ঠ মাস তথা ডিসেম্বরে রপ্তানি কমেছে আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে পাঁচ দশমিক ৮৪ শতাংশ কম। এ সময়ে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আয় কম হয়েছে ১২ দশমিক ৫৭ শতাংশ। ২০১৮ সালের শেষ ছয় মাসে রপ্তানি কমেছে ১৪ দশমিক ১৮ শতাংশ।

এই পরিসংখ্যানটি সহজভাবে বোঝার জন্য একটি ঘটনা উল্লেখ্য করি। ২০১৫ সালে আমাদের পালনকৃত একটি গরু জবাই করে মাংস বিক্রির কথা চিন্তা করি। এ জন্য এলাকার পরিচিত এক কসাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলো। নির্দিষ্ট দিনে তার দলবল নিয়ে এসে গরু জবাই করে মাংসসহ হাড়গুলো বিক্রির উপযোগী টুকরো করে তাদের কাজ সম্পাদন করল। এরপর তাদের মজুরির বিষয় এলে তারা চামড়া বাবদ তিন হাজার টাকা দাম বলে এবং তাদের মজুরি দুই হাজার ২০০ টাকা নির্ধারণ করে। সে হিসাবে তারা আমাদের ৮০০ টাকা দিয়ে চামড়া নিয়ে চলে যায়। আর গত বছর কোরবানিতে আমাদের গরুর চামড়ার দাম নির্ধারিত হয় মাত্র ২৫০ টাকা।

বিশেষজ্ঞরা এই অবনতির কারণ উল্লেখ্য করতে গিয়ে বেশকিছু সমস্যার কথা তুলে ধরেন। এর মধ্যে হাজারীবাগে প্রায় ২০০টি কারখানা থাকলেও সাভারে মাত্র ১৫০টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। চার বছরেও সাভারের চামড়াশিল্প নগরীতে প্রত্যাশা অনুযায়ী সুবিধা নিশ্চিত করতে না পারা এবং সুবিধার অভাবে অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে যেতে না পারায় রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়ে যাওয়া, অবৈধ পথে চামড়া পাচার হওয়া, বিশ্ববাজারের দরপতনে দেশের চামড়াশিল্পের অবস্থান দুর্বল হয়ে যাওয়া, পুঁজি সংকট, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা প্রভৃতি বিষয়গুলোকে বিশেষজ্ঞরা প্রাধান্য দিয়েছেন। গত পাঁচ বছরে চামড়ার দাম কমেছে অর্ধেক। বিপরীতে চামড়া ও চামড়াজাত সব পণ্যের দাম বেড়েছে কয়েকগুণ। তাহলে কাঁচা চামড়ার দাম কমছে কেন, সেই উত্তর মিলছে না কোথাও।

প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, সারা বছর দেশে প্রায় দুই কোটি ৩১ লাখ গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া জবাই হয়। এর অর্ধেকই হয় কোরবানির ঈদে। গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া মিলিয়ে দেশে কোরবানি হয়েছে প্রায় এক কোটি ১৬ লাখ পশু। যদিও এই বছর করোনার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ কোরবানি হয়নি। যত কোরবানি হয়েছে তার মধ্যে থেকেও শতভাগ চামড়া সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। চামড়া খাতের সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, স্মরণকালের সবচেয়ে কম দাম ছিল এই বছরের কাঁচা চামড়ার। বড় গরুর চামড়া ৪০০-৫০০ টাকায় বিক্রি হলেও মাঝারি গরুর চামড়া ২০০-২৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ছাগলের চামড়া ২০-৩০ টাকাও দাম করা হয়েছে। এর ফলে চামড়া বিক্রি না করে রাস্তায় ফেলে দেওয়ার ঘটনাও গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। আবার সংগ্রহকৃত চামড়ায় পচন ধরার খবরও পাওয়া গেছে। এসবের অন্যতম কারণ কোরবানির পশুর চামড়া ক্রয়-বিক্রয়ে একটি বিশেষ নির্দেশনা মানতে হয়। ট্যানারির মালিকরা দাম কম দিলে অন্যরাও কম দিতে বাধ্য হয়। তবে ট্যানারি মালিকরা বিশ্ববাজারে ভালো দামে বিক্রি করে মোটা অঙ্কের বাণিজ্য করলেও আড়তদার ও চামড়া সংগ্রহকারীদের সে সুযোগ থাকে না। এর ফলে এ সময় হাজারো মৌসুমি ব্যবসায়ী এ খাতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর নানা ধরনের সিন্ডিকেটের সামনে তারা প্রতিনিয়তই অসহায় হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় এসব সমস্যা সমাধান করে চামড়ার আগের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজন উচ্চতর নজরদারি। চামড়া সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব দূরীকরণ, চামড়া প্রক্রিয়াকরণে লবণ ও অন্যান্য ব্যবহƒত কেমিক্যালের মূল্য না বাড়ানো, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোকে আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এদিকে নগরীর পরিবেশ দূষণের কারণে তখনকার সরকার ঢাকার অদূরে সাভারের হেমায়েতপুরে চামড়াশিল্প নগরী গড়ে তুলতে ২০০৩ সালে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। পরে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারিগুলো সাভারে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়। বাস্তবতা হলো, দীর্ঘ ১৭ বছরেও সেখানে কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) পুরোপুরি প্রস্তুত হয়নি। এর ফলে চামড়াশিল্পের সব বর্জ্য এই বুড়িগঙ্গায় পড়ছে আর প্রতিনিয়ত বুড়িগঙ্গা বুড়ি হয়ে যাচ্ছে।

এসব সমস্যা ও সম্ভাবনাগুলোকে সামনে রেখে এখনই প্রয়োজন যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এই কোরবানির চামড়া যেন বিদেশে অবৈধ পথে পাচার না হয়, সেজন্য সচেষ্ট থাকা চাই। সব সিন্ডিকেট ভেঙে পশুর মালিক থেকে কল মালিক সবাই যেন ন্যায্য দাম পায় সেজন্য এবং ভবিষ্যতে চামড়াশিল্পের উন্নয়নে অবশ্যই বড় আকারের খামার গড়ে তুলতে সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে। কারণ এই চামড়াশিল্পকে রক্ষা করতে হলে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরও এগিয়ে আসতে হবে। আর এভাবেই হয়তোবা চামড়াশিল্প ফিরে পাবে তার হারানো ঐতিহ্য।

শিক্ষার্থী, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..