মত-বিশ্লেষণ

চামড়া শিল্পের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

মো. জিল্লুর রহমান : আমাদের রপ্তানির এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ চামড়া শিল্প। পোশাক শিল্পের পরই সম্ভাবনাময় এ শিল্পের অবস্থান। রপ্তানি খাতে আয়ের প্রায় ৯ শতাংশ আসে চামড়া শিল্প থেকে। আর এক্ষেত্রে প্রতি বছর কোরবানি ঈদের সংগ্রহ এ শিল্পে বয়ে আনে বাড়তি প্রণোদনা। সেই প্রণোদনায় এবারে সৃষ্টি হয়েছে হাহাকার। চামড়ার মূল্যের ভয়াবহ দরপতন দিশাহারা করে তুলেছে এ পেশার সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ী আর উৎপাদনকারীদের। নোনাজলে ভেসে গেছে গতবারের মতো এবারও মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীদের ঈদ আনন্দ। নানা কারণে দেশের চামড়া শিল্পে দুর্দিন চলছিল আগে থেকেই। এর মধ্যেই শিল্প খাতটিকে আরও দুর্দশায় ফেলেছে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব।

প্রতি বছর কোরবানি এলেই চামড়ার চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। এ বছরও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কোরবানির পশুর চামড়ার দাম পুনর্নির্ধারণ করে দিয়েছে এবং এ দাম গত বছরের তুলনায় ২০ শতাংশ কম। চামড়ার কম মূল্য নির্ধারণে মন্ত্রণালয় স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজার, ট্যানারি মালিকদের সংগঠন ইত্যাদির সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। 

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এ বছর লবণযুক্ত গরুর কাঁচা চামড়ার দাম ঢাকা শহরে প্রতি বর্গফুট ৩৫-৪০ টাকা আর ঢাকার বাইরে ২৮-৩২ টাকা। গত বছর এটি ছিল ঢাকায় ৪৫-৫০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৩৫-৪০ টাকা। সে অনুযায়ী, কোরবানির সময় জবাই করা অন্যান্য পশু যেমন ছাগল, খাসি বা বকরি সবগুলোরই চামড়ার দাম কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে।

চামড়া শিল্পে দরপতনের ঘটনা নতুন কিছু নয়। তবে এবারের করোনাভাইরাসের মতো বৈরী অবস্থা কখনোই হয়নি বলে মনে করেন চামড়া ব্যবসায়ীরা। তারা মনে করেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কাঁচা চামড়ার মূল্য কয়েক বছর ধরে স্থিতিশীল নয়। চামড়ার বাজার নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেটের কারসাজি রয়েছে। ২০১৩ সালে গরুর চামড়ার দাম ছিল প্রতি বর্গফুট ৮৫-৯০ টাকা; আর খাসির ৫০-৫৫ টাকা। ২০১৪ সালে দরপতন ঘটে।

২০১৫ সালে আরও কমে যায় চামড়ার দাম। ২০১৫ সালে গরুর চামড়া প্রতি বর্গফুট ৫০-৫৫ এবং খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ২০-২২ টাকায় নেমে আসে। এবার তা আরও নি¤œমুখী হয়েছে। এ বছর গরুর চামড়ার দাম সরকার নির্ধারণ করেছে প্রতি বর্গফুট ৩৫-৪০, ঢাকার বাইরে ২৮-৩২ টাকা এবং খাসির চামড়ার দাম ১৩-১৫ টাকা। এ বছর চামড়া বিক্রি করতে না পেরে দেশের বিভিন্ন স্থানে তা মাটির নিচে পুঁতে ফেলার ঘটনা ঘটেছে। পানিতে রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় একেবারেই চামড়ার ক্রেতা পাওয়া যায়নি। গত বছরও একই ঘটনা ঘটেছে।

ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে বছরে প্রায় ২২ কোটি বর্গফুট চামড়া পাওয়া যায়; এর অর্ধেকের বেশি সংগ্রহ করা হয় কোরবানির ঈদের সময়। মোট চামড়ার ৬৪.৮৩ শতাংশ গরুর, ৩১.৮২ শতাংশ ছাগলের, ২.২৫ শতাংশ মহিষের এবং মাত্র ১.২০ শতাংশ ভেড়ার চামড়া। ২০১৪ সালে ঢাকায় প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম ৮৫-৯০ টাকা থাকলেও এ বছর তা ৩৫-৪০ টাকা।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে আয় হয় ১০৮.৫৪ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। আগের বছরের তুলনায় আরও ৬.০৬ শতাংশ কমে রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ১০১.৯৭ কোটি ডলার। সর্বশেষ ২০১৯-২০ অর্থবছরের (জুলাই-মার্চ) আট মাসে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি হয়েছে ৬৩.১৮ কোটি ডলারের সমপরিমাণ। গত সাত বছরে ফিনিশড চামড়ার রপ্তানি আয় ৮০.৫৫ শতাংশ কমেছে। অবশ্য এ সময়ে চামড়াজাত পণ্য ও চামড়া জুতার রপ্তানি আয় কিছুটা বেড়েছে।

আমরা অনেক ক্ষেত্রেই সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের কথা শুনে থাকি। বিশেষত ব্যবসায়িক গোষ্ঠী বা গোষ্ঠীগুলো তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে স্বার্থ রক্ষার জন্য বিভিন্ন সিন্ডিকেট গড়ে তোলে। যেমন রোজা এলেই পেঁয়াজের সিন্ডিকেট; চাল, ডাল, চিনি, তেল এমনকি মাংসের বাজারের সিন্ডিকেট। তারা অনেকটা প্রেশার গ্রুপ। অনেক ক্ষেত্রে তারা মজুত বা সরবরাহে কৃত্রিম সংকট তৈরির মাধ্যমে অস্বাভাবিক মুনাফা করে থাকে। পক্ষান্তরে সরকারের তরফ থেকে ভোক্তা অধিকার বা ভোক্তার স্বার্থ রক্ষার নামে সরকারিভাবে কিছু দ্রব্য বাজারে সরবরাহ, বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অপারেশনের মাধ্যমে মূল্য সহনীয় রাখার ব্যবস্থা করে; যদিও খুব কম ক্ষেত্রেই ফলপ্রসূ হয়। নিয়ত ভোক্তারা এটা মেনেই নিয়েছে।

আসলে সরকার ক্ষেত্রবিশেষে বাজারে হস্তক্ষেপ করে যদি তারা নিশ্চিত হয় যে কোনো একটা পক্ষের স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে না। এরকম অবস্থা নানাভাবে নানা সময়ে সৃষ্ট এবং বিরাজ করতে পারে। সরকারের হস্তক্ষেপের প্রধানতম উদ্দেশ্য হচ্ছে ভোক্তা এবং উৎপাদক বা সরবরাহকারী উভয়ের জন্যই উত্তম বা উইন-উইন পরিস্থিতির নিশ্চয়তা প্রদান করা। সরকারি হস্তক্ষেপে কোনো পক্ষ যাতে ক্ষতির সম্মুখীন বা স্বার্থ হানি না হয়, তা দেখতে হয়।

যারা কোরবানি করেন তারা ধর্মীয় বিধি মেনে সামর্থ্য অনুযায়ী পশু কেনেন এবং কোরবানি করেন। পশুর চামড়া বিক্রি করে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা তা গরিব মিসকিন, অসহায় নারী-পুরুষ, অভাবী লোকজন, পাড়া প্রতিবেশীদের মাঝে অর্থ বিতরণ করেন। তবে উল্লেখযোগ্য অংশের পশু চামড়া সাধারণত বিভিন্ন এতিমখানা, অনাথ আশ্রম, মসজিদ, মাদ্রাসায় দান করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠান সংগৃহীত চামড়া বিক্রি করে লব্ধ অর্থ প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট ছাত্রছাত্রী এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় ব্যয় করেন। যুগ যুগ ধরে চলে আসা প্রচলিত এই নিয়মে কেউ কখনও প্রশ্ন তোলেননি। সুতরাং যদিও কোরবানির পশুর চামড়ার সরবরাহকারী আপাত দৃষ্টিতে কোরবানিকারী ধর্মপ্রাণ মুসলিম, কিন্তু এর বিস্তৃত সুবিধা পায় সমাজের একটি সুবিশাল জনগোষ্ঠী। ধর্মীয় রীতি মেনে কোরবানি করা ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা তাই খুব বেশি দর কষাকষির অবস্থানে থাকেন না।

ইসলামের নির্দেশানুসারে কোরবানির চামড়া বিক্রয়লব্ধ অর্থ দরিদ্র মানুষের মাঝে বিতরণ করা হয় অথবা এতিমখানায় দান করা হয়। এবার এক্ষেত্রেও চরম হাহাকার। চামড়ার দাম কমে যাওয়ার মানে দেশের হতদরিদ্র মানুষের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। আর দেশ তো বৈদেশিক মুদ্রা হারালই।

পক্ষান্তরে, পশু চামড়ার ক্রেতা বা চাহিদার দিকটি সুবিস্তৃত। এখানে পশু চামড়া অনেক শিল্প পণ্যের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অতি প্রয়োজনীয় জুতা থেকে শুরু করে বিলাসী জুতা, জ্যাকেট, ব্যাগ ও অন্যান্য দ্রব্য দেশ-বিদেশের বাজারে খুবই আকর্ষণীয়। অনেক চামড়াজাত পণ্য অতি প্রয়োজনীয় বিধায় এগুলোর চাহিদা তেমন কমে না বরং বৃদ্ধি পায়। জনসংখ্যা বাড়লে চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা বাড়ে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়লে ও চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা বাড়ে।

এদেশে চামড়া শিল্পের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৫১ সালের ৩ অক্টোবর। নারায়ণগঞ্জ থেকে সরকার চামড়া শিল্পকে ঢাকার হাজারীবাগে নিয়ে আসে। কিন্তু এখানে বর্জ্য শোধনের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। ট্যানারিগুলো প্রতিদিন প্রায় ২৪ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য বুড়িগঙ্গায় ফেলে দিত। ফলে বছরের পর বছর বুড়িগঙ্গার পানি দূষিত হয়েছে। পরিবেশ দূষণ রোধ করার জন্য সরকার ২০০৩ সালে হাইকোর্টের নির্দেশে সাভারে বিসিকের তত্ত্বাবধানে চামড়া শিল্পনগরী স্থাপন করে। এতে করে একটি শক্ত ভিত্তির ওপর এ শিল্পের দাঁড়ানোর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল।

কিন্তু শুধু চামড়া শিল্পে নয়, করোনার কারণে অনেক ব্যবসায় এখন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ চলছে। কারণ চামড়া শিল্প ২০১৭ সাল থেকেই সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কোনো মতেই সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না। বিসিকের কিছু সিদ্ধান্তহীনতা, সময়মতো সরকারের প্রণোদনা না পাওয়া এবং নীতিগত সহযোগিতা না পাওয়ায় ইউরোপ-আমেরিকার বাজার ধরতে পারছে না। তার ওপর আবার এখন করোনার প্রভাবে ব্যবসাই বন্ধ হওয়ার উপক্রম।

আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার চাহিদা কমেছে এবং সাভারে চামড়া শিল্পপল্লি স্থাপিত হলেও ব্যবসায়ীরা ওখানে পুরোপুরি কাজ শুরু করতে পারেননি আজও। ফলে ঠিকমতো চামড়া প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হচ্ছে না বলে এই বছরও চামড়ার দাম কম ধরা হয়েছে। যেখানে সব পণ্যের দাম সবসময় ঊর্ধ্বগতি কিন্তু সেখানে প্রতি বছর চামড়ার দাম কমলে এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্পের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? সম্ভাবনাময় চামড়া শিল্পের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হলে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিও বিপর্যস্ত হবে। সরকারের সম্ভাবনাময় এ খাতে সুনজর দেওয়া খুবই জরুরি।

ব্যাংকার ও ফ্রিল্যান্স লেখক

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..