মত-বিশ্লেষণ

চামড়া শিল্পের অপার সম্ভাবনা

সেলিনা আক্তার: চামড়া শিল্প একটি সম্ভাবনাময় খাত। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা এবং বিদেশে রপ্তানির উদ্দেশ্যে চামড়া ও চামড়াজাত বিভিন্ন সামগ্রী উৎপাদন করে আসছে। বিশ্ববাজারে সবসময়ই বাংলাদেশের গরু, ছাগল ও মহিষের চামড়ার চাহিদা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের ব্ল্যাকবেঙ্গল ছাগলের চামড়া বিশ্বখ্যাত। গত দু’দশকে বাংলাদেশ সরকারের এ খাতে অর্জন উল্লেখযোগ্য। ফলে বিশ্বে প্রথম শ্রেণির চামড়া ও চামড়াজাত সামগ্রী প্রস্তুতকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আত্মপ্রকাশ করেছে। বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক পশুপালনের জন্য সবুজ ঘাস ও খামার রয়েছে; যার কারণে এখানে প্রস্তুতকৃত চামড়ার গুণগত মান ভালো। 

বাংলাদেশে উৎপাদিত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যসামগ্রীর প্রধান কাঁচামাল হলো কোরবানির পশুর চামড়া। এ বছর বাংলাদেশে কোরবানিযোগ্য মোটা গরু ও মহিষের সংখ্যা ৪৫ লাখ ৪৭ হাজার। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এবারের ঈদে কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে বিভিন্ন জাতের ১ কোটি ১৯ লাখ ১৬ হাজার ৭৬৫টি পশু। যার মধ্যে রয়েছে গরু, ছাগল, মহিষ, উট, দুম্বা ও ভেড়া। এর মধ্যে ছাগল ও ভেড়ার সংখ্যা ৭৩ লাখ ৬০ হাজার ১টি। সারাদেশের ৫ লাখের বেশি খামারি এবারের ঈদে কোরবানির পশু জোগান দিয়েছেন। কোরবানির পশুর জোগানে এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ।

বাংলাদেশে কোরবানি, মিলাদ, বিবাহ, সুন্নতে খতনাসহ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে তুলনামূলক বেশিসংখ্যক পশু জবাই করা হয়। এর মধ্যে একমাত্র কোরবানির পশুর মাধ্যমেই সারা বছরের ৪৫ শতাংশ চামড়া উৎপাদন সম্ভব হয়। ৯৫ শতাংশ কাঁচা চামড়া এবং চামড়াজাত দ্রব্যাদি, প্রধানত আধা পাকা ও পাকা চামড়া, চামড়ার তৈরি পোশাক এবং জুতা হিসেবে বিদেশে বাজারজাত করা হয়।

আমাদের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বড় বাজার হলো ইতালি, যুক্তরাজ্য, জাপান, জার্মানি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ড, ব্রাজিল, রাশিয়া, চীন, সিঙ্গাপুর, স্পেন, পোল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ভারত, নেপাল, অস্ট্রেলিয়া, তাইওয়ানসহ বেশ কয়েকটি দেশ। বাংলাদেশ থেকে প্রক্রিয়াজাত চামড়ার পাশাপাশি চামড়া থেকে তৈরি জুতা, ব্যাগ, জ্যাকেট, হাতমোজা, ওয়ালেট, বেল্ট, মানিব্যাগসহ চামড়ার তৈরি হস্তশিল্প পণ্যসামগ্রী বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। বাংলাদেশ বিশ্বের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বাজারের ২১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে মাত্র ০.৫ ভাগ রপ্তানি করে। স্বাধীনতার পর ৩৫টি মাঝারি ট্যানারির মধ্যে অবাঙালিদের মালিকানার ৩০টি ট্যানারি সরকার অধিগ্রহণ করে কিন্তু রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে এসব ট্যানারি লাভজনক শিল্পে রূপ নিতে পারেনি। ফলে বিরাষ্ট্রীয়করণ প্রক্রিয়ায় এসব ট্যানারি ব্যক্তি মালিকানায় চলে যায়। বর্তমানে দেশে ট্যানারির সংখ্যা প্রায় ২৭০টি।

একটি হিসাবে, বাংলাদেশে প্রাপ্ত ২২ কোটি বর্গফুট চামড়ার মধ্যে গরুর চামড়া ৫০ লাখ পিস, ছাগল এক কোটি পিস এবং মহিষ ও ভেড়া ১৫ লাখ পিস। এর মধ্যে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ২ কোটি ৭৫ লাখ বর্গফুটের মতো। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রাপ্ত চামড়ার প্রায় অর্ধেকই সংগৃহীত হয় কোরবানির ঈদে। গত বছরগুলোতে একশ্রেণির স্বার্থান্বেষী মহল বৈদেশিক চক্রান্তে লিপ্ত হয়ে কোরবানির পরপরই সাতক্ষীরা, যশোর সীমান্তসহ দেশের অন্যান্য সীমান্ত পথে কাঁচা চামড়া পাচারে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিছু দালাল কোরবানির আগেই অগ্রিম টাকা সরবরাহ করে এ চামড়াগুলোর এক বিরাট অংশ নিজেদের দখলে রাখে, যা কাঁচা অবস্থায় পার্শ্ববর্তী দেশে পাচার করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।

দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ সময় অগ্রণী ভূমিকা রাখার জন্য সরকারি উদ্যোগে স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা প্রদানের ব্যবস্থা থাকলেও চামড়া শিল্প মালিকদের বক্তব্য হচ্ছে অর্থ প্রদানের এ ঋণ সুবিধা খুবই অপ্রতুল। তাই ব্যবসায়ীদের হাতে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে ও সীমান্ত এলাকায় চামড়া পাচাররোধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এ শিল্পকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব। এতে একদিকে যেমন শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে, তেমনি চামড়া নিয়ে দুর্নীতি দমনে আরও এক ধাপ অগ্রসর হওয়া সম্ভব হবে।

প্রসঙ্গত ২০১৭ সালকে বর্ষপণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল চামড়া শিল্পের নাম। রপ্তানি আয় বৃদ্ধি করতে সরকার এ উদ্যোগ নেয়। বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি আয় ছিল ১১৬ কোটি ৯ লাখ ৫ হাজার মার্কিন ডলার; যা ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ বেড়ে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে হয় ১২৩ কোটি মার্কিন ডলার। ২০১৯-২০ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি আয় হয় ৭৩ কোটি ৯৩ লাখ ৯ হাজার মার্কিন ডলার। সর্বশেষ ২০২০-২১ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে ৯৪ কোটি ১৬ লাখ ডলার আয় হয়েছে। এক বিলিয়নের ঘর অতিক্রম করতে না পারলেও গত বছরের তুলনায় ১৮ দশমিক ০৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি রয়েছে রপ্তানিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এই চামড়া শিল্প।

বিসিকের চামড়া শিল্পনগরী প্রকল্পটির মাধ্যমে ঢাকা মহানগরী ও বুড়িগঙ্গা নদীর পরিবেশ দূষণ রোধে রাজধানীর হাজারীবাগের ট্যানারি শিল্পগুলোকে সাভারে পরিবেশবান্ধব স্থানে স্থানান্তর করা হয়েছে। এ প্রকল্পে সাভারে ২০০ একর জমিতে উন্নত প্লট তৈরির মাধ্যমে ট্যানারি শিল্পগুলো স্থানান্তরের লক্ষ্যে ১৫৫টি শিল্প ইউনিট প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বর্তমানে এ চামড়া শিল্পনগরীতে মোট কাজের ৯৭ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। সাভারে চামড়া শিল্পনগরী সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে শিল্প মন্ত্রণালয়ের বিসিকের অধীনে রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মসের মাধ্যমে ‘ঢাকা ট্যানারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান কোম্পানি লিমিটেড’ নামে একটি কোম্পানি গঠন করা হয়েছে।

চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য শিল্প দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনকারী গুরুত্বপূর্ণ খাত। এ খাতে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৬ লাখ এবং পরোক্ষভাবে আরও ৩ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। বাংলাদেশের মোট রপ্তানির মধ্যে এ খাতের অবদান ৪ শতাংশ। বিশ্বব্যাপী চামড়া, চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা খাত খুব দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধির হার নি¤œমুখী। সে কারণে এ শিল্পের উন্নয়নের জন্য ইতোমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। যেমন হাজারীবাগ থেকে ট্যানারিসমূহে সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে স্থানান্তরিত হয়ে উৎপাদন শুরু করেছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে চামড়া শিল্পনগরী স্থাপন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

এ শিল্পে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে অনেকটা এগিয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে গুণগত মান ঠিক রেখে চামড়া রপ্তানি করতে সরকার আরও কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। এ শিল্পের সঙ্গে যেসব শ্রমিকরা জড়িত তাদের জন্য যে জায়গা বরাদ্দ সেখানে দ্রুত আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। শিল্প এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এবং রাস্তাঘাট নিয়মিত সংস্কার করতে হবে যেন ক্রেতারা অবাধে সেখানে যাতায়াত করতে পারেন। মালিকদের মধ্যে তাদের জন্য বরাদ্দকৃত প্লটের দলিল হস্তান্তর করতে হবে। তাহলে ক্রেতারা আরও বেশি আগ্রহী হবেন এবং যে অভিযোগ করেন তা করার আর সুযোগ পাবেন না।

বাংলাদেশে এ খাতে রয়েছে অপার সম্ভাবনা। বাংলাদেশে এখনও পর্যন্ত পুমা, পিভোলিনোস, হুগো বস, এপেক্স, বে এম্পোরিয়াম প্রভৃতি কোম্পানি যে বাংলাদেশ থেকে চামড়া শিল্পের কাঁচামাল ব্যবহার করছে তা থেকেই বোঝা যায় যে, চামড়া শিল্পের বিকাশে বাংলাদেশের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে।

পিআইডি নিবন্ধন 

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..