সারা বাংলা

চামড়া কিনে বিপাকে যশোরের ক্ষুদ্র ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা

মীর কামরুজ্জামান মনি, যশোর: রেকর্ড দরপতনের কারণে জমেনি খুলনা বিভাগের সর্ববৃহৎ চামড়ার হাট যশোরের রাজারহাট। ন্যায্য দাম না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন এ হাটের চামড়া ব্যবসায়ীরা। চামড়ার টানা দরপতন ও ট্যানারি মালিকদের কাছে বকেয়া আদায় না হওয়ায় ঈদ-পরবর্তীতে এ হাটে চামড়া কেনেননি বড় ব্যবসায়ীরাও।
যশোরের রাজারহাটে যশোরসহ খুলনা বিভাগের ১০ জেলার ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, ঝালকাঠি, রাজশাহী, পাবনা, ঈশ্বরদী ও নাটোরের বড় ব্যবসায়ীরা চামড়া বেচাকেনা করেন। অন্যান্য বছর ঈদুল আজহার পরের দ্বিতীয় হাট জমজমাট হলেও এবারের হাট জমেনি। সাধারণত কোরবানির পর এ হাটে ৭০-৮০ হাজার চামড়া ওঠে। তবে গতকাল শনিবার চামড়ার সরবরাহ ছিল কম। সব মিলিয়ে চার থেকে পাঁচ হাজার চামড়া উঠলেও বিকিকিনি তেমন হয়নি।
গতকাল রাজারহাটে অল্পসংখ্যক চামড়া কেনাবেচা হয়েছে। গরুর বড় চামড়া প্রতিটি ৩০০, ছোট ১০০ থেকে ২০০ এবং ছাগলের চামড়া বিক্রি হয়েছে প্রতিটি মাত্র ১৫ থেকে ৩০ টাকায়। ঈদের পরদিন মঙ্গলবার ঈদ-পরবর্তী প্রথম চামড়ার হাটও জমেনি। ওইদিন অল্প কজন ব্যবসায়ী হাটে চামড়া আনলেও কাক্সিক্ষত দাম না পেয়ে হতাশ হয়ে কেউ কেউ চামড়া ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন; আবার অনেকে হাটেই চামড়া ফেলে গেছেন।
হাটে চামড়া নিয়ে আসা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জানান, সরকার নির্ধারিত দরে চামড়া কিনলেও সে দামে বিক্রি করতে পারছেন না তারা। এমন চলতে থাকলে চামড়া পাচার হয়ে যেতে পরে। আর ট্যানারি প্রতিনিধিসহ চামড়া ক্রেতাদের দাবি, বাজারের অবস্থা ভালো আছে। তবে যে চামড়া উঠেছে, তার মান ভালো না হওয়া সত্ত্বেও দাম বেশি চাওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে বকেয়া টাকা না পাওয়ায় তারা দাম দিয়ে চামড়া কিনতে পারছেন না।
গতকালের হাটে মাগুরা থেকে ২৯টি গরুর চামড়া নিয়ে আসা গোপাল চন্দ্র দাস জানান, প্রতিটি চামড়ায় সব মিলিয়ে তার খরচ হয়েছে ৪৫০ টাকার বেশি। কিন্তু সেই চামড়া থেকে ভালোগুলোর ৮টির দাম বলছে ৩৫০ টাকা করে। বাকিগুলো গড়ে ১০০ টাকা করে দিতে চাইছে। দুপুর ১২টা নাগাদ তিনি কোনো চামড়া বিক্রি করেননি।
পিরোজপুরের ব্যবসায়ী খোকন ব্যাপারী জানান, তিনি ১৪০টি গরুর চামড়া এনেছেন। কেনা, লবণ দেওয়া ও পরিবহন খরচ বাবদ প্রতিটিতে খরচ পড়েছে প্রায় ৫৫০ টাকা। কিন্তু বাজারে বড় ১০টি চামড়ার দাম বলছে ৩০০ টাকা করে। বাকিগুলোর দাম এখনও বলেনি কেউ। হাটে ক্রেতার সংখ্যাও বেশ কম।
টেকেরহাট থেকে আসা ব্যবসায়ী কামরুল শেখ জানান, হাটে এসেছেন চামড়ার বাজার দেখতে। তার প্রায় তিন হাজার চামড়া মজুত রয়েছে। দাম আশানুরূপ না হলে বিক্রি করবেন না।
রূপদিয়ার চামড়া ব্যবসায়ী আবদুল ওহাব জানান, ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে তার পাওনা রয়েছে এক কোটি টাকা। এখন পর্যন্ত সে টাকা পাননি। তাহলে চামড়া কিনবেন কি দিয়ে? ফলে এ বছর চামড়া কিনতে পারছেন না। এমন পরিস্থিতিতে তৃণমূলের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বাঁচাতে এবং চামড়া ব্যবসার সুদিন ফিরিয়ে আনতে নতুন বাজার সৃষ্টিতে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।
এদিকে চামড়া বিক্রি না হওয়া ও দাম কম হওয়ার কারণে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে চামড়া ভারতে পাচার করতে পারে বলে অনেকে অভিযোগ করেন।
বৃহত্তর যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন মুকুল জানান, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোনো চামড়াই নষ্ট বা পাচার হয়নি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাঁচা চামড়া রফতানির ঘোষণা বাস্তবায়ন হলেই চামড়ার বাজার চাঙা হবে। ব্যবসায়ীরা সে আশাতেই চামড়া মজুত করে রেখেছেন। আশা করা যায়, সামনের হাটে বেশি চামড়া বিকিকিনি হবে। তবে বেশিরভাগ ব্যবসায়ী নগদ টাকার অভাবে চামড়া কিনতে পারছেন না। কেননা, ট্যানারি মালিকদের কাছে এখানকার ব্যবসায়ীদের বকেয়া রয়েছে ২০ কোটি টাকার ওপরে। আবার মাদরাসাগুলো বেশি দামের আশায় সরাসরি নওয়াপাড়ায় অবস্থিত এসএএফ ও ফুলতলার সুপার ট্যানারিতে চামড়া নিয়ে যাচ্ছে। সে কারণে হাটে চামড়া উঠছে কম।

সর্বশেষ..