সম্পাদকীয়

চামড়া সমস্যার স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করুন

অনেক আগে থেকেই আমাদের দেশে চামড়াশিল্প গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম উৎসও। পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও এ খাতের অবদান অনেক। বিশ্বজুড়ে চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা ক্রমেই বাড়তে থাকায় এ খাতের ভবিষ্যৎও উজ্জ্বল। কিন্তু নানা জটিলতা আর অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের চামড়াশিল্প বড় সংকটের মুখে পড়েছে। ব্যবসায়ী, আড়তদার ও ট্যানারি মালিকদের মধ্যে এ নিয়ে জটিলতা রয়েছে। ফলে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পাশাপাশি চামড়াশিল্পও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
গতকালের দৈনিক শেয়ার বিজে ‘পাওনা পরিশোধ না করা: ট্যানারি মালিকদের কাছে চামড়া বিক্রি না করার ঘোষণা আড়তদারদের’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। খবরটিতে বলা হয়েছে, পাওনা টাকা পরিশোধ না করলে এবার ট্যানারি মালিকদের কাছে চামড়া বিক্রি করবে না বলে জানিয়ে দিয়েছেন পুরান ঢাকার পোস্তার কাঁচা চামড়ার আড়তদাররা। ২০১২ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সরবরাহ করা অর্থ বকেয়া রয়েছে বলেও দাবি করেছেন তারা। বিষয়টি গুরুতরই বটে। এভাবে চলতে থাকলে আগামীতে চামড়া খাত গভীর সংকটে পড়বে। চামড়াশিল্প ও দেশের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট সবাই আলোচনার মাধ্যমে এ সংকট অবসানে উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন।
প্রাচীনকাল থেকেই উপমহাদেশে গবাদিপশু পালনের নজির রয়েছে। কয়েক বছর আগে ভারত থেকে বৈধ পথে গরু আসা বন্ধ হওয়ায় দেশে গরুর খামার বেড়েছে বৈপ্লবিকভাবে। ছাগল পালনও বাড়ছে। পাশাপাশি দুই ঈদের মতো ধর্মীয় উপলক্ষ থাকায় দেশে বিপুল পরিমাণ মানসম্মত চামড়া উৎপাদন হচ্ছে। সে হিসেবে চামড়াশিল্প আমাদের জন্য আশীর্বাদ ও সম্ভাবনাময়। চামড়াজাত পণ্য তৈরির কাঁচামাল মিলছে পর্যাপ্ত। কিন্তু নানা ধরনের অপ্রত্যাশিত জটিলতার কারণে চামড়া খাত গভীর সংকটে। এ অবস্থায় সম্ভাবনাময় এ খাতকে এগিয়ে নিতে হলে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণের বিকল্প নেই।
খবরেই উল্লেখ করা হয়েছে, শুধু রাজধানীর পোস্তার ব্যবসায়ীরাই ট্যানারি মালিকদের কাছে অন্তত ১০০ কোটি টাকা পান। আর সারা দেশে অন্তত ৪০০ কোটি টাকার ওপরে বকেয়া রয়েছে। বিষয়টি উদ্বেগজনক। চামড়া খাতের শীর্ষস্থানীয় এ দুই পক্ষের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক না থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যেতে পারে। এক্ষেত্রে মূল সমস্যা বের করে তা সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। এছাড়া চামড়া খাত নিয়ে কোনো দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র চলছে কি না, তাও খতিয়ে দেখতে হবে। চামড়া খাত রক্ষায় শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে সবার আগে উদ্যোগী হওয়া জরুরি বলে আমরা মনে করি।

আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত বস্তিবাসীর পুনর্বাসনে ব্যবস্থা নিন

জীবন-জীবিকার জন্য প্রত্যন্ত এলাকার গরিব-নিঃস্ব মানুষ শহরে পাড়ি জমায়। আবার নদীভাঙনসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে গৃহহীন ও ছিন্নমূল মানুষ বেঁচে থাকার তাগিদে শহরে আসে। শহরে এসে তাদের ঠাঁই হয় কোনো বস্তিতে। এখানেও স্বস্তি নেই, জীবনের নিরাপত্তা নেই। পুড়ে মরতে হয় তাদের।
নগরায়ণের এ যুগে বস্তি ক্রমেই বিলুপ্ত হচ্ছে। কিন্তু বস্তি খালি করতে সেটি পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। যতবারই বস্তি পুড়েছে, ততবারই এটিতে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার পুড়েছে রাজধানীর মিরপুর থানার চলন্তিকা বস্তি। এখানেও অভিযোগ উঠেছে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার। গণপূর্ত অধিদফতরের জমির ওপর গড়ে ওঠা বস্তিটি দীর্ঘদিন থেকেই খালি করার চেষ্টা করছে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। কিন্তু বস্তিবাসীর বাধায় সেটি সম্ভব হয়নি। ঈদের ছুটিতে বস্তিতে যখন লোকজন কম, ঠিক ওই সময় শুক্রবার সন্ধ্যায় আগুন লাগে বস্তিতে। মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়া সেই আগুনে গৃহহীন হয়ে পড়ে প্রায় দুই হাজার পরিবার। তাদের সবকিছু পুড়ে যাওয়ায় একরকম নিঃস্ব হয়ে পড়ে তারা। অভিযোগের আঙুল স্থানীয় সংসদ সদস্যের দিকে। যদিও অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলছেন, ‘আগুন লাগার পর বস্তির লোকজনকে স্থানীয় স্কুলগুলোতে থাকার জায়গা করে দিয়েছি। তাদের মধ্যে রান্না করা খাবার দিচ্ছি। তাদের পুনর্বাসনের চেষ্টা করছি।’
বস্তিবাসী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, বস্তি দখল করতে এবং জায়গা খালি করে দেওয়ার জন্য দুদিক থেকে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। দুর্ঘটনা হলে একদিকে আগুন লাগবে; কিন্তু একই সময়ে দু’পাশে আগুন লাগবে কেন?
বস্তিবাসীকে উচ্ছেদ করা কঠিন নয়। তারা এত প্রতাপশালী নয় যে, সরকারের সঙ্গে বিরোধে যাবে। বস্তিবাসী জানেন, এটি সরকারের জায়গা। তারা যে যেভাবে পারছে ঘর বানিয়ে বা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকছে। ছেড়ে যেতে বললে চলে যেত তারা।
বস্তি উচ্ছেদে এমন কৌশল নেওয়া হয়েছে কি না, আমাদের জানা নেই। তবে হয়ে থাকলে তা দুঃখজনক। নিঃস্বরা সর্বস্বান্ত হয়ে গেল। বস্তিটি অবৈধভাবে গড়ে উঠেছিল। প্রতিটি ঘরেই ছিল বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের অবৈধ সংযোগ। চলত মাদক ব্যবসাও। ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা এসব নিয়ন্ত্রণ করতেন বলে গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে।
বস্তিতে গৃহকর্মী, পোশাকশ্রমিক, রিকশাচালকসহ দিনমজুরশ্রেণির লোকজন থাকতেন। এরা এখন কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন। তাদের বাউনিয়া বাঁধে পুনর্বাসন করা হবে বলে জানিয়েছেন ডিএনসিসি মেয়র। কিন্তু যত দিন পর্যন্ত তারা পুনর্বাসিত না হচ্ছেন, তত দিন পর্যন্ত তাদের থাকা, খাওয়া ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

সর্বশেষ..