চার বিদ্যুৎকেন্দ্রে ক্যাপাসিটি চার্জে গচ্চা যাবে ২,৭০০ কোটি টাকা

এলএনজি আমদানির ব্যর্থ চেষ্টা

ইসমাইল আলী: আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এজন্য কয়েক দফা দরপত্র আহ্বান করেও উচ্চ দরের কারণে এলএনজি কিনতে পারেনি সরকার। ফলে গ্যাসের সংকট বাড়ছে। বসিয়ে রাখতে হচ্ছে গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। এ অবস্থায় আগামী দুই বছরের মধ্যে উৎপাদনে আসবে আরও চারটি বড় আকারের এলএনজি তথা গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র। আর এলএনজি না পাওয়ায় এ কেন্দ্রগুলো বসিয়ে রাখা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।

চারটির মধ্যে রয়েছে ভারতের রিলায়েন্স গ্রুপের ৭১৮ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। এছাড়া দেশীয় ইউনাইটেড গ্রুপ, ইউনিক গ্রুপ ও আনলিমা গ্রুপের তিন বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা যথাক্রমে ৫৯০, ৫৮৪ ও ৪৫০ মেগাওয়াট। তবে এলএনজি বা গ্যাস না পাওয়া গেলে এসব কেন্দ্র বসিয়ে রেখে গুনতে হবে উচ্চ হারে ক্যাপাসিটি চার্জ। এতে বছরে প্রায় দুই হাজার ৭০০ কোটি টাকা গচ্চা যাবে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি)।

তথ্যমতে, ২০১৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি অনুমোদন পায় ইউনাইটেড গ্রুপের এলএনজিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় নির্মাণাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদন সক্ষমতা ৫৯০ মেগাওয়াট। গ্যাস/এলএনজিচালিত কেন্দ্রটি আগামী বছর উৎপাদনে আসার কথা রয়েছে। একইভাবে ২০১৯ সালের ২৫ জুন অনুমোদন পায় আনলিমা পাওয়ারের কেন্দ্রটিও। মেঘনাঘাটে নির্মাণাধীন কেন্দ্রটির উৎপাদন সক্ষমতা ৪৫০ মেগাওয়াট। গ্যাস/এলএনজিভিত্তিক কেন্দ্রটি ২০২২ সালে উৎপাদনে আসার কথা।

একইভাবে ২০১৯ সালের ২৪ জুলাই অনুমোদন পায় ইউনিক গ্রুপের ৫৮৪ মেগাওয়াটের কেন্দ্রটি। নারায়ণগঞ্জে অবস্থিতি গ্যাস/এলএনজিভিত্তিক নির্মাণাধীন কেন্দ্রটি ২০২২ সালে উৎপাদনে আসার কথা। আর ২০১৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর অনুমোদন পায় ভারতের রিলায়েন্স পাওয়ারের মেঘনাঘাট বিদ্যুৎকেন্দ্র। ৭১৮ মেগাওয়াটের কেন্দ্রটিও ২০২২ সালে উৎপাদনে আসার কথা রয়েছে। সব মিলিয়ে চার বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা দুই হাজার ৩৪২ মেগাওয়াট।

সূত্র জানায়, চারটির মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্যাপাসিটি চার্জ রিলায়েন্সের বিদ্যুৎকেন্দ্রটির। এর ক্যাপাসিটি চার্জ প্রতি কিলোওয়াট প্রতি ঘণ্টায় দুই দশমিক শূন্য পাঁচ সেন্ট। এতে ৮০ শতাংশ প্লান্ট ফ্যাক্টরে প্রতি মেগাওয়াটের জন্য বছরে ক্যাপাসিটি চার্জ দাঁড়ায় এক লাখ ৪৩ হাজার ৬৬৪ ডলার বা ১২২ কোটি ১১ লাখ ৪৪ হাজার টাকা (১ ডলার = ৮৫ টাকা)। আর পুরো বিদ্যুৎকেন্দ্রটির জন্য বছরে ক্যাপাসিটি চার্জ দাঁড়ায় ৮৭৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকা।

যদিও দেশীয় তিন গ্রুপের এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। এতে ইউনাইটেডের বিদ্যুৎকেন্দ্রটির জন্য বছরে গুনতে হবে ৬৬৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা, ইউনিকের কেন্দ্রের জন্য ৬৬০ কোটি ৯৭ লাখ টাকা ও আনলিমার কেন্দ্রটির জন্য ৫০৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে চার বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ গুনতে হবে দুই হাজার ৭১৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা।

এ প্রসঙ্গে ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম শেয়ার বিজকে বলেন, জ্বালানি তেল বা গ্যাসের আন্তর্জাতিক বাজার খুবই অস্থিতিশীল। যুদ্ধ, মন্দা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রভৃতি কারণে এগুলোর দাম নিয়মিত ওঠানামা করে। আবার অনেক সময় কৃত্রিমভাবে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে দাম বাড়ানো হয়। তাই অনিশ্চিত জ্বালানি উৎসের ওপর নির্ভর করে বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলা বড় ধরনের ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। এক্ষেত্রে ডুয়েল ফুয়েল তথা গ্যাস ও ডিজেলচালিত হলে কেন্দ্রগুলো বসিয়ে রেখে ক্যাপাসিটি চার্জ গুনতে হতো না।

জানতে চাইলে পিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. বেলায়েত হোসেন বলেন, এ চারটির বাইরে সামিট গ্রুপকেও এ ধরনের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের লাইসেন্স দেয়া হয়েছে, যেটি ডুয়েল ফুয়েল। তবে সেক্ষেত্রে ক্যাপাসিটি চার্জ বেশি হয়। তাই শুধু গ্যাস/এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল। মূলত পেট্রোবাংলা গ্যাস সরবরাহে নিশ্চয়তার পরিপ্রেক্ষিতে লাইসেন্স দেয়া হয়। তবে তারা এলএনজি আনতে না পারায় এখন জটিলতা তৈরি হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এলএনজির দাম সবসময়ই এ ধরনের বাড়তি থাকে, তা নয়। দাম কমলে আবারও এলএনজি আমদানি বাড়ানো হবে। তখন গ্যাস তথা এলএনজিভিত্তিক কেন্দ্রগুলো ভালোভাবেই চালানো যাবে।

এদিকে এলএনজিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর লাইসেন্স দেয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের দরপত্র আহ্বান করা হয়নি। এমনকি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণব্যয় নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারদরও যাচাই করা হয়নি।

সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেন, কোম্পানিগুলোকে নিজ উদ্যোগে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে প্রস্তাব জমা দেয়ার কথা জানানো হয়। ফলে সরাসরি প্রস্তাব দেয় কোম্পানিগুলো। তখন কোম্পানিগুলোর দেয়া প্রস্তাবের ওপর দরকষাকষি করে নির্ধারণ করা হয় বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ ব্যয়, যার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয় ক্যাপাসিটি চার্জও। যদিও আন্তর্জাতিক বাজারদর বিবেচনা করলে এ ব্যয় ৩০-৪০ শতাংশ কমানো যেত। এতে ক্যাপাসিটি চার্জও কমত।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৯ সালে অনুমোদন দেয়া কেন্দ্রগুলোর নির্মাণব্যয় মূলত এক দশক আগে অনুমোদন দেয়া বেসরকারি খাতের মেঘনাঘাট বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ভিত্তি ধরে নিরূপণ করা হয়। যদিও বৈশ্বিক মন্দাসহ নানা কারণে এক দশকে বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রপাতির দাম ৫০-৬০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এছাড়া উন্নত প্রযুক্তি আসায় হিট রেটও বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই উৎপাদন ব্যয় অনেক কমে গেছে। ফলে যথাযথ প্রক্রিয়ায় লাইসেন্স দেয়া হলে ক্যাপাসিটি চার্জ প্রতি কিলোওয়াট প্রতি ঘণ্টায় দেড় সেন্টের বেশি হতো না বলে মনে করেন পিডিবির প্রকৌশল বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ খাতের নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসেইন বলেন, ২০১৯ সালে বিশেষ পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল। তবে আপাতত বিদ্যুৎকেন্দ্রের লাইসেন্স দেয়া বন্ধ রাখা হয়েছে। আগামীতে লাইসেন্স দেয়া হলে অবশ্যই দরপত্রের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে অনুমোদন দেয়া হবে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন   ❑ পড়েছেন  ৯২  জন  

সর্বশেষ..