ওয়ালিউর রহমান ফরহাদ : কুষ্টিয়ার খাজা নগরের রশিদ এগ্রো অ্যান্ড ফুড প্রোডাক্টসের মালিক আব্দুর রশিদ দেশের একজন শীষস্থানীয় চাল ব্যবসায়ী। তিনি বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি। দেশের শীর্ষস্থানীয় একাধিক ব্যাংকে তার ঋণ হাজার কোটি টাকা। প্রতিদিন শতকোটি টাকার চালের বাণিজ্য তার। অথচ নিয়মিত ঋণ পরিশোধ না করায় ঋণগুলো খেলাপি হয়ে পড়েছে। তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে পরিশোধ করছেন না বলে ব্যাংকগুলো অভিযোগ করছে।
ব্যাংকগুলো বলছে, বছরে কমপক্ষে ৩০০-৪০০ কোটি টাকা মুনাফা করে রশিদ। এ টাকা থেকে কিছু করে ঋণ পরিশোধ করলেও ঋণগুলো নিয়মিত থাকত। কিন্তু তিনি ব্যাংকগুলোর সঙ্গে সেভাবে যোগাযোগ রক্ষা করছেন না। এ ধরনের আচরণকে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির লক্ষণ বলে মনে করেন ব্যাংক কর্মকর্তারা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, তিন ব্যাংকে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে রশিদের। এর মধ্যে শুধু ট্রাস্ট ব্যাংকেই তার ঋণ প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। ট্রাষ্ট ব্যাংক ছাড়াও শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংকে মোটা অঙ্কের টাকা ঋণ রয়েছে তার। ঋণগুলো দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি হয়ে আছে।
ব্যাংকে ঋণখেলাপি হলে বড় পরিসরে ব্যবসা পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু সেই অসম্ভবকে খুব সহজে সম্ভবে পরিণত করেছেন আবদুর রশিদ। ঋণ দিয়ে ব্যাংক যেন ঠেকে গেছে। ব্যাংকগুলো কোনোভাবে রশিদের কাছ থাকে ঋণ আদায় করতে পারছে না, পারছে না কোনো আইনি ব্যবস্থা নিয়ে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে।
জানা গেছে, রশিদ ব্যাংকঋণ পরিশোধের পরিবর্তে একজন ব্যারিস্টারকে আইন উপদেষ্টা নিয়োগ দিয়েছেন। ওই ব্যারিস্টার তার আইনি বিষয়সহ পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। ফলে ব্যাংকের টাকা না দিয়ে ফাঁকফোকর দিয়ে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ পাচ্ছেন রশিদ।
সূত্র জানায়, রশিদের ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য আছে। চাইলে এক মাসের মধ্যে সব ঋণ পরিশোধ করতে পারেন। কিন্তু অর্থ পরিশোধের ইচ্ছা না থাকায় ব্যাংকগুলোর কোনো তাগাদা তিনি আমলে নিচ্ছেন না। অর্থ আদায়ের জন্য ব্যাংকগুলো তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি তার আইন উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বলতে বলেন। ব্যাংকগুলো ঋণ পরিশোধ নিয়ে আইন উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বললে তিনি রসিকতা করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।
জানতে চাইলে গতকাল বুধবার আবদুর রশিদ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘ঋণগুলো পুনঃতফসিল হয়ে যাচ্ছে। আমি ঋণ পুনঃতফসিল করছি। আশা করি খেলাপি থাকবে না।’
এদিকে খেলাপি হওয়া সত্ত্বেও রশিদ চাল আমদানির জন্য এলসি (ঋণপত্র) খোলার সুযোগ পাচ্ছেন বলে জানা গেছে। জরুরি খাদ্যপণ্য হিসেবে চাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হয়েছে রশিদকে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইনে (এনআই অ্যাক্ট) রশিদের বিরুদ্ধে মামলা চলমান থাকলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছেন এই ঋণখেলাপি। প্রধান খাদ্যপণ্য চালের বাজারের সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী হওয়ায় সব সরকারের আমলেই সুবিধাজনক অবস্থানে থাকেন।
অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাবশালী নেতা মাহবুবুল আলম হানিফের প্রশ্রয়ে তিনি অধিকতর বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। বিগত সরকারের পতণের পর গ্রেপ্তার হলে তার অনুগত সিন্ডিকেট সদস্যরা চালের দাম কেজিপ্রতি চার-পাঁচ টাকা কারসাজি করে বাড়িয়ে দেন, ফলে তখন চালের বাজারে চরম অস্থিরতা দেখা দেয়।
আকিজ গ্রুপের সঙ্গে প্রতারণা এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে চার মাস আগে কুষ্টিয়া মডেল থানায় প্রতারণার একটি মামলায় রশিদকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে ২০২৪ সালের ১৬ নভেম্বর তিনি আরও একবার গ্রেপ্তার হন এবং পরবর্তী সময়ে জামিনে মুক্ত হন। তার বিরুদ্ধে ১৯টি প্রতারণা মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি থাকলেও গ্রেপ্তার এড়িয়ে চলতে সক্ষম হয়েছেন তিনি।
রশিদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ তিনি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। স্থানীয়দের কাছে তিনি চাল বাজারের মাফিয়া হিসেবে পরিচিত।
চাল ব্যবসা দিয়ে ব্যবসায়িক জীবন শুরু করে বর্তমানে রশিদ পেপার মিল ছাড়াও তার রয়েছে আরও নানা ধরনের ব্যবসা। এমনকি তিনি একটি বড় ব্যবসায়ী গ্রুপেরও মালিক। তার ব্যবসা-বাণিজ্য সকল কিছু সচল থাকলেও তিনি ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের টাকা পরিশোধে অত্যন্ত অনিয়মিত।
জানা গেছে, বর্তমানে ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন না করে নগদ টাকায় লেনদেন করছেন রশিদ। ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ না করতে এই কৌশল নিয়েছেন তিনি। আরও জানা গেছে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী আবদুর রশিদকে ঋণ পরিশোধ করা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বলেছেন, ব্যাংকঋণ পরিশোধ না করলে বাংলাদেশে কোনো অসুবিধা হয় না। আর এতেই রশিদ ঋণ পরিশোধ করা বন্ধ করে নগদ টাকায় লেনদেন করতে শুরু করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই তিন ব্যাংকসহ এক ডজন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তার আরও ঋণ রয়েছে। সব মিলিয়ে ঋণের পরিমাণ এক হাজার ২২ কোটি টাকা বা তার বেশি হবে। একাধিক ব্যাংক তার কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে নিলামেও তুলেছিল। একজন পাওনাদারের করা মামলায় তিনি গ্রেপ্তারও হয়ে পরে জামিনে মুক্ত হন।
এদিকে ব্যাংক কর্মকর্তারা ঋণ আদায়ে নিয়মিত রশিদের অফিস এবং বাড়িতে ধরনা দিচ্ছেন। ভাঁজ পড়ছে ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কপালে।
অথচ আবদুর রশিদ কুষ্টিয়া শহরের কোর্টপাড়ায় আলেয়া ভবন, গোশালা সড়কের নবনির্মিত আলিশান বাড়িতে আয়েশি জীবন কাটাচ্ছেন। কুষ্টিয়া কলেজ মোড়ে ৪৫ কাঠা জমি, পোড়াদহে মাতৃছায়া নামের আলিশান বাড়ি, ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর থানাপাড়া বাজার এলাকায় ১১ বিঘা বাণিজ্যিক জমি, মানিকগঞ্জে ১৭ বিঘা জমি, বালুঘাট এলাকায় ১০ বিঘা জমি, ঢাকা শহরের ধানমন্ডি ও গুলশানে আলিশান বাড়ি ও অফিস, সিরাজগঞ্জে ১০ কোটি টাকা মূল্যমানের একটি পুরোনো জুট মিল, ব্র্যাক ব্যাংকের নিলাম থেকে ভিআইপি ফ্লাওয়ার মিল এবং ভিআইপি অটো রাইস মিল চালু অবস্থায় ২০ কোটি টাকায় কিনেছেন। বর্তমানে এ দুটি কারখানায় পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে। কুষ্টিয়া শহরের মজমপুর গেটে কয়েক বিঘা জমির ওপর ভবন ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
কুষ্টিয়া ছাড়াও ঢাকা, মানিকগঞ্জ, ঝিনাইদহ, বগুড়া, নাটোরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিপুল পরিমাণ জমি ও একাধিক চালু কারখানা রয়েছে আবদুর রশিদের।
রয়েছে দামি মডেলের একাধিক গাড়ি, যা তিনি নিজে এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা ব্যবহার করছেন। পাঁচ শতাধিক ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহন রয়েছে, যার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত শত শত কোটি টাকা আয় করছেন রশিদ।
প্রিন্ট করুন








Discussion about this post