কৃষি কৃষ্টি

চাষ লেবু

বাংলাদেশের সব স্থানে চাষ করা যায় লেবু, যা অর্থকরী ফসল হিসেবে সমাদৃত। আজকের আয়োজন এর নানা দিক নিয়ে

সঠিক চাষাবাদে ভালো ফলন
বাংলাদেশে লেবু বেশ জনপ্রিয়। এটি দেশের সব স্থানেই চাষযোগ্য। তবে সিলেট, পার্বত্য চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও মৌলভীবাজারে তুলনামূলক বেশি জন্মে। এছাড়া অন্য জেলায়ও প্রচুর পরিমাণে লেবু উৎপন্ন হয়। কৃষক অল্প খরচে অনায়াসে চাষ করতে পারেন। সঠিক নিয়মে লেবুর চাষাবাদ সম্পর্কিত কয়েকটি বিষয় তুলে ধরা হলো।

জলবায়ু ও মাটি
যথেষ্ট বৃষ্টিপাত হয় এমন আর্দ্র ও উঁচু পাহাড়ে লেবু ভালো জন্মে। গভীর, হালকা, দো-আঁশ পলি নিষ্কাশন সম্পন্ন মাটি লেবু চাষের জন্য উত্তম।

জমি নির্বাচন ও তৈরি

লেবু চাষের জন্য উঁচু জমি নির্বাচন করতে হবে। জমি নির্বাচনের পর গভীরভাবে চাষ করতে হবে। চাষকৃত জমি আগাছামুক্ত করতে হবে। সমতল জমি হলে আড়াআড়ি চাষ ও মই দিয়ে জমি তৈরি করে নিতে হবে। শুকনো গোবর ও ছাই ছিটিয়ে মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে নিতে হবে। এভাবে দু-একদিন ফেলে রেখে ১০ থেকে ১২ দিন আগে চারা রোপণের জন্য গর্ত করতে হবে। গর্ত করতে হবে ৩ী৩ মিটার দূরত্বে ৬০ী৬০ী৬০ সেন্টিমিটার আকারে। এরপর জৈব সার, টিএসপি ও এমওপি সার মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে গর্ত ভরাট করে পানি দিতে হবে। কয়েকদিন এভাবে রাখতে হবে।

জাত ও চারা নির্বাচন

বাংলাদেশে লেবুর বিভিন্ন জাত রয়েছে। এদের মধ্যে উফশী জাত হচ্ছে- বারি
লেবু-১, বারি লেবু-২, বারি লেবু-৩। এসব জাতের গাছ থেকে বেশি ফল পাওয়া যায়। লেবুর চারা সাধারণত বীজ থেকে উৎপন্ন করা হয়। তবে গুটি কলমের মাধ্যমে চারা তৈরি করা যায়। রোপণের জন্য সোজা ও দ্রুত বৃদ্ধিসম্পন্ন চারা নির্বাচন করতে হবে। আট থেকে ১০ মাস বয়সের চারা রোপণের জন্য ভালো।
রোপণের সময় ও পদ্ধতি
মে থেকে অক্টোবর-লেবুর যে কোনো জাত রোপণ করা যায়। অধিক বৃষ্টিপাতের সময় চারা রোপণ না করাই ভালো। সেচসুবিধা থাকলে সারা বছর লেবু রোপণ করা যায়। গর্ত ভরাটের কয়েকদিন পর গর্তের মাঝখানে চারা সোজাভাবে রোপণ করতে হবে। রোপণের সময় চারার চারদিকের মাটি হাত দিয়ে চেপে ভালোভাবে বসিয়ে দিতে হবে। চারা রোপণের পর হালকা পানির সেচ, খুঁটি ও বেড়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

নানা জাতের

বারি লেবু-১
বারি লেবু-১ জাতটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সংগৃহীত ৩০ জাতের মধ্য থেকে বাছাই করা হয়েছে। এ জাতের লেবু এলাচি মসলার মতো গন্ধযুক্ত হওয়ায় এর আরেক নাম এলাচি লেবু। এ জাতের গাছ ও পাতা আকারে বড় হয়ে থাকে। ফলও কিছুটা বড় আকারের হয়। সঠিক পরিচর্যায় বছরে দুবার ফল দেয় এ জাত। ফলের বাইরের আবরণ অমসৃণ ও পুরু। প্রতি গাছে প্রায় ১৫০টি ফল ধরে। এ জাত বাংলাদেশের সবখানে চাষ করা যায়। তবে পাহাড়ি এলাকায় এর ফলন ভালো হয়।

বারি লেবু-২
বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে জার্মপ্লাজম সংগ্রহ করে জাত মূল্যায়নের মাধ্যমে বারি লেবু-২ জাতটি উদ্ভাবন করা হয়। এটি প্রায় সারা বছর পাওয়া যায়। এর পাতা ছোট। এ জাতের ফল গোলাকার, বাইরের আবরণ মসৃণ। নিয়মিত ফল ধরে। প্রতি গাছে ফলের সংখ্যা প্রায় ১৮৬। এর স্বাদ মাঝারি টক, তবে রসের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি।

বারি লেবু-৩
দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে সংগৃহীত লেবুর জার্মপ্লাজম মূল্যায়নের মাধ্যমে বারি লেবু-৩ উদ্ভাবন করা হয়। এর পাতা বারি লেবু-২’র মতো ছোট। নিয়মিত ফল ধরে। ফলের আকার গোলাকার। বাইরের আবরণ মসৃণ। এর রসের পরিমাণ বারি লেবু-২’র তুলনায় বেশি। প্রতি গাছে ফলের সংখ্যা প্রায় ২১০।

বাউ কাগজি লেবু-১
জাতটি বাংলাদেশের মাটিতে চাষের উপযোগী। তবে এ জাত বেশি দিন জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। এ ফলটিও গোলাকৃতির হয়ে থাকে। আবরণ মসৃণ। উফশী বারমাসি জাত। একটি থোকায় দুই থেকে পাঁচটি ফল পাওয়া যায়। প্রতি গাছে ৫০টির মতো ফল ধরে।

বাউ লেবু-২
বাই লেবু-২ সেন্টেড এলাচি নামে পরিচিত। এ জাতের গাছ বেশ ঝোপালো হয়। ফল ডিম্বাকৃতি ও সুগন্ধিযুক্ত। আবরণ মসৃণ। প্রতি গাছে প্রায় ২৫০ ফল ধরে।

বাউ লেবু-৩
সারা বছরই এ জাতের ফল পাওয়া যায়। এর জনপ্রিয় নাম সেমি সিডলেস। এটি লম্বা হয়। প্রায় বীজশূন্য। একটি গাছে প্রায় ৩০০ ফল পাওয়া যায়।

রোগবালাই ও দমন ব্যবস্থা

রোগ ডাই-ব্যাক
লেবুর একটি একটি মারাত্মক রোগ ডাই-ব্যাক। এ রোগের কারণেই লেবুর উৎপাদন কমে যায়। রোগটি সাধারণত কোলিট্রোটিক্যাম গোলিওসপোরডিস নামক এক ধরনের ছত্রাকের মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত গাছের পাতার শিরা হলুদ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে পাতা হলুদ হয়ে ঝড়ে পড়ে। গাছের শাখা-প্রশাখা পুড়ে যাওয়ার মতো দেখা যায়। আক্রান্ত গাছকে বয়সের তুলনায় অনেকটা ছোটো দেখায়।
ডাই-ব্যাক দমনের জন্য গাছের আক্রান্ত অংশ পুড়িয়ে ফেলতে হবে। গোড়ায় পরিমাণ মতো দস্তা ও পটাশ সার দিতে হবে। ফল সংগ্রহের পর বাগান পরিষ্কার করতে হবে। এছাড়া পরিষ্কার পানিতে ছত্রাকনাশক ওষুধ মিশিয়ে রোগাক্রান্ত গাছে স্প্রে করতে হবে।

স্ক্যাব
এ রোগে আক্রান্ত হলে লেবুর ওপরের অংশ বিশ্রি দেখায়। এ কারণে বাজার দর কমে যায়। রোগটি সাধারণত ইলন্সিনও ফাউসেটি নামক ছত্রাকের কারণে হয়ে থাকে। স্ক্যাবে আক্রান্ত হলে প্রথমে ফলের ওপর হলুদ, কমলা বা লালচে দাগ দেখা যায়। পরে ছোটো ছোটো দাগ একসঙ্গে হয়ে খসখসে কর্কের মতো দেখা যায়। এছাড়া লেবু গাছের কচি পাতাগুলোয়ও হালকা দাগ পড়তে শুরু করে।
দমনের জন্য সব ডাল ও পাতা কেটে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। বর্ষা আসার আগে মাটি আলগা করে জিংক সালফেট ও ছাই গাছের গোড়ায় ছিটিয়ে দিতে হবে। এরপর ছত্রাক নাশক ওষুধ স্প্রে করতে হবে।

ক্যাংকার
লেবু গাছে প্রায়ই দেখা যায় ক্যাংকার। রোগটি সাধারণত জেনথোমোনাস এক্সোনোপোডিস নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়ে থাকে। ফলে গাছের ফল ও পাতার ওপর ছোটো পানি ভেজা দাগ দেখায়। এ দাগ পরবর্তী সময়ে বাদামি রং ধারণ করে ফোসকার মতো হয়ে যায়। পরে ফোসকাগুলো ফেটে যায়। এছাড়া লেবুর ওপর হলুদ রঙের এক ধরনের বেষ্টনীও দেখতে পাওয়া যায়।
দমনের জন্য সুস্থ সবল চারা গাছ নির্বাচন করে রোপণ করতে হবে। গাছের যে শাখায় রোগটি দেখা দিয়েছে সে শাখাগুলো কেটে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। আক্রান্ত গাছে নিম পাতার রস পরিষ্কার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

অ্যানথ্রাকনোজ

সাধারণত দুই ধরনের ছত্রাকের কারণে অ্যানথ্রাকনোজ হয়ে থাকে। রোগটির কারণে গাছের পুরাতন পাতায় ঈষৎ সবুজ রঙের দাগ দেখা যায়। পরে দাগগুলো দ্রুত বাদামি রং ধারণ করে। পরবর্তীকালে গাছের ডাল শুকিয়ে যায়, পাতাগুরো ঝরে পড়ে। আক্রান্ত গাছে ফল থাকলে ফলের বোটায় সংক্রমিত হয়। ধীরে ধীরে লেবু বাদামি বর্ণের হয়ে যায়। এ ফল সংরক্ষণ করলে অল্প সময়ের মধ্যে নষ্ট হয়ে যায়।
দমনের ক্ষেত্রে চারা রোপণের পর জানুয়ারি ও সেপ্টেম্বরে এক বার করে ছত্রাকনাশক ওষুধ গাছে স্প্রে করতে হবে। ভালো মানের সার গাছের গোড়ায় দিয়ে এ রোগ দমন করা সম্ভব।

পোকামাকড় প্রজাপতি

এরা সাধারণত গাছের কচি পাতায় বসে পাতা খেয়ে থাকে। এ পোকা অনেক সময় গাছে কোনো পাতাই রাখে না, ফলে গাছ থেকে ফল ও গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।
দমনের জন্য গাছ থেকে পোকার ডিম ও রোগাক্রান্ত গাছের ডাল কেটে ফেলতে হবে। কৃষি অধিদফতরের পরামর্শ অনুযায়ী কীটনাশক পানিতে মিশিয়ে রোগাক্রান্ত গাছ ও পাতায় স্প্রে করতে হবে।

আঁকি
লেবু গাছে প্রায়ই এ পোকাটি দেখা যায়। এরা কচি লেবুতে আক্রমণ করে। এছাড়া পাতার ওপরের অংশ থেকে শিরার মধ্যের সবুজ অংশ খেয়ে ফেলে। ফলে পাতাগুলো কুচকে যায়। ফল ধরার সময়ে এ পোকা আক্রমণ করলে ফলন ভালো হয় না।
দমনের জন্য গাছে যখন আক্রান্ত পাতার সংখ্যা কম থাকবে তখন পাতাগুলো সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। আর যদি আক্রমণ বেশি থাকে তাহলে কীটনাশক ওষুধ পানিতে মিশিয়ে গাছে স্প্রে করতে হবে।

ছাতরা
এ পোকার আক্রমণে গাছের কাণ্ডে সাদা তুলার মতো দেখা যায়। এতে হাত দিয়ে টিপ দিলে বোঝা যায় পোকাদের অবস্থান। এ পোকা সাধারণত গাছের কাণ্ড থেকে রস চুষে খায়। এরা যে জায়গায় থাকে সেখানে ক্ষতের সৃষ্টি করে।
দমনের জন্য প্রাথমিক অবস্থায় রোগাক্রান্ত কাণ্ড কেটে ফেলতে হবে। অতিরিক্ত আক্রান্ত হলে বালাইনাশক ওষুধ ‘ম্যালাথিয়ন ৫৭ ইসি’ পানির সঙ্গে মিশিয়ে গাছে স্প্রে করতে হবে।

পরিচর্যা ও ফল সংগ্রহ
লেবু গাছের চারা লাগানোর পর ভালো ফলন পেতে হলে সময়মতো সঠিক নিয়মে পরিচর্যা করতে হবে।

সার দেওয়া
পচা গোবর, ইউরিয়া, টিএসপি প্রভৃতি সার একসঙ্গে মিশিয়ে গাছের গোড়া থেকে কিছু দূরে ছিটিয়ে মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। এক মাস পর পর সার এভাবে ছিটিয়ে দিতে হবে।

ছাঁটাই
গাছের গোড়া থেকে কোনো শাখা বের হলে সেই শাখা কেটে ফেলতে হবে। এছাড়া গাছের যেসব ডালপালা দুর্বল ও রোগাক্রান্ত, সেগুলোও কেটে ছাঁটাই করতে হবে। ডাল কাটার পর ওই স্থানে ছত্রাকনাশক দিতে হবে, এতে ছত্রাকে আক্রমণ হবে না। এছাড়া ফল সংগ্রহের পর শুকনো ডাল বা অপ্রয়োজনীয় শাখা থাকলে ছাঁটাই করতে হবে।

সেচ ও নিষ্কাশন
গাছ রোপণের পর অবশ্যই নিয়মিত সেচ দিতে হবে। তবে গাছের গোড়ায় যাতে পানি জমে না থাকে সেজন্য নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। ফুল আসার সময় ও ফল ধরার সময় পানি দিতে হবে। কারণ এ সময় পানির অভাবে ফুল ও ফল ঝরে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।

ফল সংগ্রহ
গাছ রোপণের চার থেকে পাঁচ মাস পর ফল সংগ্রহ করা যায়। গাছ হতে ফল সংগ্রহ করার সময় লক্ষ রাখতে হবে ফলে যেন আঘাত না লাগে। যদিও এদের খোসা শক্ত তারপরও আঘাতপ্রাপ্ত না হওয়াই ভালো। দীর্ঘদিন গাছে রেখেও লেবু সংরক্ষণ করা যায়।

 

সর্বশেষ..