প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

চাহিদার তুলনায় বাড়তি জোগান: মন্দায় মুরগির বাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক: সাধারণত শীতের সময়ে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানের আয়োজন বেশি হয়। বিশেষ করে বিয়ে, পিকনিক ও  সভা-সেমিনারের মতো অনুষ্ঠান আয়োজন বেড়ে যায়।  ফলে মুরগিসহ অন্যান্য মাংসের চাহিদাও বাড়ে। এর ধারাবাহিকতায় বৃদ্ধি পায় পণ্যটির দামও। কিন্তু চলতি বছরে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে মুরগির দামে। গরু ও খাসির মাংসের দাম বাড়লেও কমছে মুরগির দাম। এর কারণ অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে মুরগির চাহিদার চেয়ে সরবরাহ বেশি। ফলে মন্দা অবস্থা বিরাজ করছে মুরগির বাজারে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে ক্রমাগত উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে চাহিদা না বাড়াই পোলট্রি বাজার মন্দার বড় কারণ। বিশেষ করে ভোগ বৃদ্ধি না পাওয়ায় বাড়তি উৎপাদন উদ্বৃত্ত থেকে যাচ্ছে। এছাড়া মাছ-সবজির উৎপাদন বৃদ্ধিরও প্রভাব রয়েছে মুরগি বাজারে। সব মিলে উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়াতে সরবরাহ বৃদ্ধির তুলনায় বাড়ছে না চাহিদা।

রাজধানীতে পোলট্রির সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার কাপ্তান বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১১০ টাকা থেকে ১১৫ টাকার মধ্যেই পাইকারিতে কেনাবেচা হচ্ছে পোলট্রির ব্রয়লার মুরগি। চাহিদা বৃদ্ধি বা সরবরাহের কোনো সংকট নেই। উল্টো পণ্য বেচতে হিমশিম খাচ্ছেন পাইকারি বিক্রেতারা। কাপ্তান বাজারের সানজিদ পোলট্রি হাউজের স্বত্বাধিকারী ইসমাইল হোসেন বলেন, প্রতিদিন এ বাজারে ১০০ থেকে ১১৫টি পিকআপ ভ্যানের প্রতিটিতে দুই থেকে তিন হাজার পিস ফার্মের মুরগি আসে। সে তুলনায় চাহিদাই নেই। প্রতিটি ভ্যানে দুই থেকে পাঁচ লাখ টাকা মূল্যের মুরগি এনে অনেকে লোকসান দিয়ে বিক্রি করছেন।

তবে শুধু ফার্মের মুরগি নয়, সব ধরনের মুরগির কেনাবেচাতে একই অবস্থা বলে জানান সোনালি মুরগির ব্যবসায়ী আরজু শিকদার। তিনি বলেন, ‘প্রায় ৩০ বছর ধরে মুরগির ব্যবসা করে আসছি। আমার ব্যবসা জীবনে এত দীর্ঘ সময় মুরগির বাজার নি¤œমুখী দেখিনি।’

পণ্যের ভোগ না বাড়লে চাহিদা বাড়ে না। তবে নানা তথ্যউপাত্ত বলছে, উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়েনি দেশে মুরগির মাংসের ভোগের পরিমাণ। যেখানে প্রাণিসম্পদ অধিদফতর বলছে, ২০০৬-০৭ অর্থবছরে দেশে পোলট্রি মুরগির সংখ্যা ছিল ২০ কোটি ৬৮ লাখ। তা ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এসে দাঁড়িয়েছে ২৬ কোটি ৪৩ লাখে। একই ধরনের বৃদ্ধির তথ্য দিয়ে ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ বলছে, দেশে বর্তমানে মুরগির দৈনিক উৎপান এসে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৭০০ মেট্রিক টন। কিন্তু মাংসের দৈনিক চাহিদা এক হাজার ৪০০ মেট্রিক টন। ফলে মাংস উদ্বৃত্ত থেকে যাচ্ছে।

অপরদিকে গত কয়েক বছর থেকে মুরগির মাংসের ভোগে কোনো উন্নতি হয়নি। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মতে, সুস্থ থাকার জন্য প্রতিটি মানুষকে বছরে মুরগির মাংস খাওয়া উচিত ন্যূনতম ১৮ থেকে ২০ কেজি। আমাদের দেশের মানুষ মুরগির মাংস খায় বছরে গড়ে মাত্র তিন দশমিক ৬৫ কেজি। আর প্রান্তিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে ওই হার আরও কম। বিগত এক দশক থেকে ভোগের পরিমাণ এমনই রয়েছে। অথচ বিশ্বে উন্নত দেশগুলোতে বর্তমানে জনপ্রতি মুরগির মাংস ভোগের পরিমাণ ৪০-৪৫ কেজিতে পৌঁছেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ বছরে গড়ে ৫১ দশমিক এক কেজি মুরগির মাংস খায় এবং কানাডায় জনপ্রতি ভোগের পরিমাণ ৩৬ দশমিক ৫০ কেজি।

এ অবস্থায় দীর্ঘদিন ধরেই বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা দরে। একইভাবে বাজারে লেয়ার ও কক জাতের মুরগির কেজি ১৫০ থেকে ১৫০ টাকা। যদিও বিক্রেতারা বলছেন, প্রতি বছর কোরবানি ঈদের পর থেকেই বাজারে বাড়তে থাকে মুরগির চাহিদা। যা এসে ঠেকে শীতে। এর মধ্যেই বছরের শেষে ও শুরুর সময় পড়াতে নানা ধরনের অনুষ্ঠান সভা-সেমিনার হয়। সেগুলোতে প্রচুর মুরগির মাংস বিক্রি হয়। ফলে ওই মৌসুমে মুরগির চাহিদা ভালো থাকায় দামও কিছুটা বাড়ে। তবে এ বছর তার কোনোই প্রভাব নেই।

মগবাজার বড় বাজারের বিক্রেতা শফিক মিয়া বলেন, চাহিদা নেই, উল্টো সরবরাহ প্রচুর। এ কারণে এবার দামও সব সময়ের তুলনায় অনেক কম। গত ছয় মাসের বেশি সময় ধরে ১২০ টাকা থেকে ১৪০ টাকার মধ্যে রাজধানীর বাজারে ব্রয়লার মুরগি কেনাবেচা হচ্ছে। এতে লোকসানে পড়ছেন প্রান্তিক খামারিরা।

এদিকে মুরগির দাম কমলেও বেড়েছে খাসি ও গরুর মাংসের দাম। বছর না ঘুরতেই গরুর মাংসের দাম কেজিতে ৩০-৫০ টাকা বেড়ে বর্তমানে ৪৩০-৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে খাসির মাংসের দাম বেড়েছে প্রায় ১০০ টাকা। বছরের শুরুতে ৬০০ টাকায় পাওয়া গেলেও বর্তমানে প্রতি কেজি খাসির মাংস বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৭০০ টাকা।