প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

চাহিদার ৯০ শতাংশই আমদানি দেশীয় রেশম শিল্প উন্নয়নে ‘সিল্কজোন’ চান উদ্যোক্তারা

 

জাকারিয়া পলাশ: অভিজাত ও শৌখিন মানুষের পছন্দ সিল্ক বা রেশমের পোশাক। তাই অনেকে একে বলেন রয়্যাল ফেব্রিকস। কিন্তু পৃষ্ঠপোষকতা আর উদ্যোগের অভাবে জৌলুস হারিয়েছে শিল্পটি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট, শিবগঞ্জ আর রাজশাহীর কিছু এলাকায় বহুকাল ধরেই চাষ হয় রেশমের গুটি। সুতা তৈরি, লুমের সাহায্যে কাপড় বোনাসহ সব কাজেই আছে ওই এলাকার খ্যাতি। প্রায় ৯০ শতাংশ বিদেশি সুতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন সংশ্লিষ্টরা। খাতের প্রাণ ফেরাতে ভোলাহাটকে রেশমশিল্পের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক জোন ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। রেশম চাষের জন্য এক হাজার একর জমি নির্দিষ্ট করে তরুণ প্রজš§কে শিল্পের কাজে আগ্রহী করার উদ্যোগ চান তারা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে সিল্কের মতো শৌখিন পণ্যের চাহিদা। বিদেশেও সিল্কের চাহিদা রয়েছে। এ শিল্পের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। কিন্তু পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ধীরে ধীরে শিল্পের সূক্ষ্ম কাজগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা লোকজন পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন। নতুন প্রজš§ এ শিল্পের সঙ্গে তাদের ক্যারিয়ার গড়তে আগ্রহী হচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রেশম উৎপাদন ও রফতানিকারকদের সমিতির (এসএমইএবি) সভাপতি আলাউদ্দিন আহমেদ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘রেশমশিল্পের ঐতিহ্য আছে, কিন্তু প্রাণ নেই। কিন্তু এটা একটা সম্ভাবনাময় শিল্প। এ শিল্পে নারী-বৃদ্ধ থেকে শুরু করে পরিবারের সবাই কাজ করতে পারে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট ও শিবগঞ্জ হলো রেশম চাষের জন্য সুবিধাজনক জায়গা। আর পার্শ্ববর্তী পশ্চিমবঙ্গের মালদহে ও মুর্শিদাবাদে রেশম চাষ হয়। তাই বিশ্বের মধ্যে ভারত ও চীনের পাশাপাশি বাংলাদেশ হলো রেশম চাষের জন্য সম্ভাবনাময় এলাকা।’

এ শিল্পের উন্নয়নে ভোলাহাটকে ‘সিল্কজোন’ ঘোষণা করে এক হাজার একর জমি রেশম চাষের জন্য নির্ধারিত করার আহ্বান জানিয়ে ওই উদ্যোক্তা বলেন, ভারত রেশমশিল্পের জন্য কর্নাটক ও পশ্চিমবঙ্গকে বেছে নিয়েছে। চীন সুকিয়াংসহ কিছু এলাকাকে বেছে নিয়েছে। ওই বিশেষ অঞ্চলে রেশম চাষ বাড়াতে কৃষকদের উৎসাহ দিতে উন্নত প্রযুক্তি ও সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি বড় আকারের বিনিয়োগ আহ্বান করা যেতে পারে। সেখানে তুঁত চারার চাষ, গুটি উৎপাদন, সুতা তৈরি থেকে কাপড় তৈরির জন্য হ্যান্ড লুম, পাওয়ার লুম, ডায়িং, পেইন্টিংয়ের আলাদা আলাদা বিভাগ চালু করা উচিত।’

তিনি জানান, কয়েক বছর আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে আটটি আদর্শ রেশমপল্লি গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেগুলো বিভিন্ন স্থানে প্রক্রিয়াধীন আছে। কিন্তু সম্ভাবনাময় এলাকা ভোলাহাটকে সিল্কজোন হিসেবে গড়ে তোলা দরকার। তাহলে অন্য পেশা ছেড়ে তরুণরা এ শিল্পে ফিরে আসবে।

জানা গেছে, দেশে রেশমের মোট চাহিদা ৩০০ টন। এর মধ্যে মাত্র ৩০ টন এখন দেশে উৎপাদিত হচ্ছে। প্রায় ৯০ শতাংশ রেশমের সুতা আমদানি হয় চীন ও ভিয়েতনাম থেকে। প্রধানত চীন থেকেই কয়েকজন আমদানিকারক রেশম সুতা আমদানি করেন।

উদ্যোক্তারা জানান, একসময় আমদানি করাত রেশম সুতার প্রতি কেজি ছিল এক হাজার টাকা। এখন সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় মূল্য বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। এক কেজি রেশম সুতা কিনতে হচ্ছে প্রায় ছয় হাজার টাকায়।

রাজধানীর ধানমন্ডির মমতাজ প্লাজায় রয়েছে সিল্কের বেশ কিছু শোরুম। এছাড়া মিরপুর, বাড্ডা, গুলশান, ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন স্থানে প্রায় অর্ধশত সিল্ক পণ্যের শোরুম রয়েছে। বিভিন্ন উদ্যোক্তা বেসরকারিভাবে সেগুলো চালাচ্ছেন।

ধানমন্ডির উষা সিল্কের সিইও মো. লাবিবুল হক শাওন শেয়ার বিজকে বলেন, ‘একসময় সেরিকালচার বোর্ড থেকে অত্যাধুনিক মেশিন সরবরাহ করতে পারতো। সেখানে যে মেশিন ছিল তাতে প্রতি মিনিটে পাঁচটি শাড়ি প্রিন্ট করা যেতো। সিল্ক ফাউন্ডেশন সেটি তদারকি করতো। হ্যান্ডলুম, পাওয়ার লুম, ডায়িং, পেইন্টিংয়ের আলাদা আলাদা বিভাগ ছিল। রমরমা ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু ১৯৯০ সালের দিকে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। এখন এ খাতের জন্য কোনো ধরনের প্রণোদনা নেই। অনেক ফ্যাক্টরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে।’

দোয়েল সিল্কের স্বত্বাধিকারী আলমগীর হোসেন বলেন, ‘হ্যান্ড পেইন্ট ও এমব্রয়ডারির মাধ্যমে নানা ডিজাইন ফুটিয়ে তোলেন সিল্কের কারিগররা। কিন্তু এ শিল্পে এখন নতুন প্রজšে§র ছেলেমেয়েরা নেই। আসলে সিল্কের কাজ হচ্ছে খুবই সুক্ষ কাজ। ধৈর্যের কাজ। এ কাজের প্রতি তেমন আগ্রহ এখনকার ছেলেমেয়েদের মধ্যে নেই। ফলে চাহিদার তুলনায় খাদের উৎপাদন সক্ষমতা কমে গেছে ব্যাপক হারে। আগে প্রতিদিন ১২০ পিস সিল্কের শাড়ি তৈরি করতাম। এখন ৫০ পিসও তৈরি করতে পারি না। আগে আমরা এক পিস শাড়ি বিক্রি করতাম ৪৫০ টাকায়। এখন সেই কাপড়ের দাম দুই হাজার ৭০০ টাকা। কিন্তু আমরা চাহিদামতো সরবরাহ করতে পারি না। শিল্পে কারিগর নেই, শিল্পও বেঁচে নেই। কিন্তু ব্যাপক চাহিদা আছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘গত ৩০ বছরে ধীরে ধীরে শিল্পটি বিলুপ্তির পথে এগিয়েছে। এখন সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রুচিশীল উদ্যোক্তা সৃষ্টি করতে হবে। শিল্পের সঙ্গে অলংকরণ যুক্ত করতে হবে। সেই সঙ্গে উন্নত তুঁতপাতা, বীজ, আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করতে হবে।’

এদিকে রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সিল্ক থেকে রফতানি আয় ছিল ২০ হাজার ডলার। সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা জানান, একসময় এলসির মাধ্যমে সিল্কের কাপড় রফতানি হতো। তবে এখন এর পরিমাণ কমে গিয়েছে। তবে এখনও ইন্টারন্যাশনাল ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে বেশ রফতানি হয়, যা রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর হিসাবে আসে না।

এ প্রসঙ্গে এসএমইএবি’র সভাপতি আলাউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বিদেশিরা বেড়াতে এসে অনেকেই সিল্কের পণ্য ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে কিনে নিয়ে যায়। সেটাও এক ধরনের রফতানি। কিন্তু সেটা হিসাবে আসে না। সেই পরিমাণটিকেও হিসাবে আনলে আমাদের খাতের রফতানির পরিমাণ মিলিয়ন ডলারের বেশি।’ এর পাশাপাশি রফতানি বৃদ্ধির জন্য নগদ সহায়তার দাবি করেন তিনি।