দিনের খবর বাণিজ্য সংবাদ শিল্প-বাণিজ্য

চাহিদা বাড়ছে খাদ্য ও খামারে এক বছরে ভুট্টার আমদানি দ্বিগুণ

শেখ আবু তালেব: দেশের চাহিদা বাড়ায় বড় হচ্ছে ভুট্টার বাজার। দেশীয় ভুট্টার ভালো মান ও চাষাবাদে মুনাফা বেশি হওয়ায় কৃষকরাও আগ্রহী হয়ে উঠছেন। তারপরও চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। ফলে ক্রমেই বাড়ছে ভুট্টা আমদানি। এক বছর আগেও যেখানে প্রতি মাসে গড়ে ৩৫ হাজার টন ভুট্টা আমদানি হতো, বর্তমানে তা ৬৭ হাজার টনে উন্নীত হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য জানা গেছে। আমদানি ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে খাদ্য মন্ত্রণালয়ও ভুট্টা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ শুরু করেছে। গত ডিসেম্বরে মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভুট্টার চাহিদা ও উৎপাদন পরিস্থিতির তথ্য নিয়ে মাসভিত্তিক পর্যালোচনা করবে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ভুট্টার বার্ষিক চাহিদা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০ লাখ টন। এর মধ্যে দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে ৫৪ লাখ টানের ওপরে অর্থাৎ চাহিদার এক-পঞ্চমাংশ দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে। উৎপাদন শেষে ছড়ানো, শুকানো ও সংরক্ষণ করতে গিয়ে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় দেশে প্রতি বছর এক দশমাংশ ভুট্টা নষ্ট হয়ে যায়।

বর্তমানে দেশে ভুট্টার বাজারের আকার দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে দেশে ভুট্টা উৎপাদন হচ্ছে প্রায় আট হাজার কোটি টাকার। অন্যদিকে গত অর্থবছরে আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে আমদানিতে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আমদানি তথ্য অনুযায়ী, গত নভেম্বর মাসে ভুট্টা আমদানি হয়েছে ৩৪ হাজার ১৮৯ টন। এরপরের মাস থেকে তা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত জানুয়ারি হয়েছে ১৫ হাজার ২৭২ টন, আগস্টে ৮০ হাজার ৭১৫ টন ও অক্টোবর মাস শেষে তা ৬৬ হাজার ৮৫১ টন আমদানি হয়।

বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছর আগে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশে ভুট্টার উৎপাদন ছিল ২৭ লাখ টন। সর্বশেষ গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা বেড়ে ৫৪ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। চাহিদার অবশিষ্ট অংশ আমদানি করতে হয়।

যদিও আমদানিকৃত ভুট্টার প্রোটিন মান দেশীয় ভুট্টার চেয়ে কম বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে ব্রাজিল, বেলজিয়াম, তুরস্ক ও ভারত থেকে ভুট্টা আমদানি হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি হচ্ছে ব্রাজিল থেকে। অপরদিকে দেশীয় ভুট্টাও রপ্তানি শুরু হয়েছে। ছোট ছোট চালানে সার্কভুক্ত নেপালসহ কয়েকটি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। গত বছরে ভুট্টা রপ্তানি করে বাংলাদেশের আয় হয়েছে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশীয় ভুট্টার ভালো মান ও উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় কৃষকরাও চাষাবাদে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। ফলে প্রতি বছরই বাড়ছে ভুট্টার উৎপাদন।

জানা গেছে, প্রাণিজ এ খাদ্য তৈরির মূল উপদানই হচ্ছে ভুট্টা। এ খাদ্য তৈরিতে প্রায় ৬০ শতাংশের প্রয়োজন হয় ভুট্টা। পশুখাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে বাড়ছে ছোট ছোট ফিড মিলের সংখ্যাও। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে সাড়ে পাঁচ লাখ হেক্টর জমিতে ভুট্টার আবাদ হচ্ছে। সারা দেশে উৎপাদিত ভুট্টার সিংহভাগই হচ্ছে রংপুর বিভাগে। ঢাকার পার্শবর্তী মনিকগঞ্জ, উত্তরের জেলা লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঠাকুরগাঁও এবং পঞ্চগড় ভুট্টা উৎপাদনে বিখ্যাত। চড় অঞ্চলে উৎপাদিত ভুট্টার মান সবচেয়ে ভালো বলে জানা গেছে।

ভুট্টার চাহিদা বৃদ্ধির বিষয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়, দেশে মুরগি, গবাদি পশু ও মৎস্য খামারের সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে গরু ও মুরগির খামার পালন জনপ্রিয় হচ্ছে। গরু মোটা তাজকরণ, দুগ্ধ ও মৎস্য খামার সম্প্রসারিত হচ্ছে। এজন্য মৎস্য চাষ ও পশু খাদ্য উৎপাদনে বেড়েছে প্রক্রিয়াজাত পশু খাদ্যের চাহিদা। অপরদিকে বেকারি পণ্যে ভুট্টার ব্যবহার বেড়েছে। বেকারি পণ্যর চাহিদা ও সরবরাহ বাড়ছে। সব মিলিয়ে প্রাণিজ খাদ্য চাহিদা মেটাতে বৃদ্ধি পাচ্ছে ভুট্টার ব্যবহার। দেশে উৎপাদিত ভুট্টা দিয়ে চাহিদা না মেটায় আমদানি বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে আমদানির পরিমাণ হঠাৎ করেই বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ হিসেবে মন্ত্রণালয় বলছে, করোনা মহামারিতে আমদানির পরিমাণ কমে গিয়েছিল। দেশের সাম্প্রতিক বন্যায় পশু খাদ্যর সংকট দেখা দেওয়ায় আমদানি করতে হচ্ছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সুপারিশ করা হয়েছে, ভুট্টা চাষের পরিমাণ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..