মত-বিশ্লেষণ

চিকিৎসাব্যবস্থায় বৈষম্য দূর হোক

মাহমুদুল হাসান ইজাজ: যখনই নিজেকে বিষণ মনে হয় আমি সময় করে হাসপাতালে ঘুরে আসি। তবে রোগী হয়ে নয়, বরং হাসপাতালে অবস্থানরত মানুষদের যন্ত্রণাটুকু নিজের মধ্যে অনুভব করে নিতে। শত শত মানুষের দুর্দশার চিত্র দেখে নিজের বিষন্নতাকে জলাঞ্জলি দিতে হয়; কেননা স্রষ্টার দেয়া উপহারের কাছে আমার বিষন্নতা তুচ্ছ মাত্র। প্রতিবারই ফেরার সময় স্রষ্টার কাছে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে হয় এই সুন্দর জীবন উপহার দেয়ার জন্য। তবে শেষবার যেদিন হাসপাতালে গিয়েছি, আমার মনস্তাত্ত্বিক চেতনা ক্ষণিকের জন্য থমকে দাঁড়ায় একটি ঘটনার প্রেক্ষাপটে।

হাসপাতাল থেকে যখন বের হব, ঠিক সেই মুহূর্তে অপূর্ব ভালোলাগার এক দৃশ্য আমাকে থামিয়ে দেয়। হাসপাতালে কর্মরত এক নার্স এবং অপূর্ব সুন্দর ছোট এক বাচ্চা হাসিমাখা মুখে গল্পে মশগুল। হঠাৎই একজন লোকের আগমন ঘটল। তার আসামাত্রই বাচ্চাটির আবদার শুরু‘বাবা আমি বড় হয়ে নার্স হব।’ লোকটি তৎক্ষণাৎ জবাবে বললেন, ‘না, মা, তোমাকে বড় হয়ে ডাক্তার হতে হবে।’ মেয়েটি আবারও বলল, ‘না, বাবা, আমি নার্সই হব। এই নার্স আন্টি আমাকে অনেক আদর করেন। আমিও নার্স হলে সবাইকে ভালোবাসতে পারব, সবাই আমাকে ভালোবাসবে।’ বাচ্চা মেয়েটির এসব কথা শুনে রাগান্বিত চোখে তার বাবার তাকানো দেখে বাচ্চা মেয়েটির মুখ কালো হয়ে গেল। আমি দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম মাত্র, ইচ্ছা হলো সুট-টাই পরা ভদ্রলোককে গিয়ে জিজ্ঞেস করিÑ‘আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজš§কে কী শেখাচ্ছি?’ কিন্তু বিশাল এই জগতে আমি নিতান্তই ছোট একজন মানুষ, সামনে গিয়ে কিছু বলার মতো সাহসটুকু হয়নি তখন। পরিস্থিতির একপর্যায়ে গম্ভীর মুখে নার্স মেয়েটি সেখান থেকে চলে গেল। মেয়েটির গম্ভীর মুখের চাহনিতে জানান দিচ্ছে হয়তো মেয়েটির নিজেরই ইচ্ছা ছিল ডাক্তার হওয়ার, অথবা তার পরম ভালোবাসার কাজকে কেউ অবজ্ঞা করছেÑব্যাপারটি সে নিতে পারেনি।

ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দ যখন জানান দেয় গভীর রাত নেমে এসেছে। নগরীর ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত মানুষগুলো যখন ঘুমের ঘোরে অচেতন ঠিক তখনই একদল মানুষ হাসপাতালের এক বেড থেকে আরেক বেডে পায়চারি করে চলছে। চিকিৎসা জগতের অ্যাপ্রোন পরিহিত নার্সিং পেশার এই মানুষগুলোর যেন কোনো ক্লান্তি আসে না কখনও। এই অ্যাপ্রোন যেন আমৃত্যু সেবার প্রতীক। মাতৃস্বাস্থ্যের সঠিক সেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নার্সিংয়ের বিকল্প নেই। স্বাভাবিকভাবে জন্মদান সম্ভব হলেও বর্তমানে আমাদের দেশে সিজারের মাধ্যমে জন্মদানের বিষয়টি রমরমাভাবে চলছে। জরিপে উঠে এসেছে প্রতিরোধযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও প্রতি এক বছরে পাঁচ হাজার ২০০ নারী জন্মদানের সময় মারা যান, যা আমাদের দেশের স্বাস্থ্যসেবা ক্ষেত্রে চরম ভয়াবহ দিক। সঠিকভাবে চিকিৎসা করলে ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে মাতমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু রোধ করা সম্ভব। এক্ষেত্রে আমাদের প্রশিক্ষিত নার্স খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ২০১৬ সালে সরকারিভাবে নার্সিংয়ে পদ বরাদ্দ ছিল ৩২ হাজার ২৩৯টি, তবে কর্মরত আছেন ২৭ হাজার ৪৩২ জন। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে দেশে আরও নার্সিং কলেজ ও ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

সঠিক চিকিৎসাসেবা প্রদানের জন্য কোনো চিকিৎসকের তিন নার্সের প্রয়োজন হয়। কিন্তু আমাদের দেশে তিন চিকিৎসকের ক্ষেত্রে এক নার্স রয়েছে। এর কারণ আমাদের অভিভাবক সমাজে একটি প্রচলিত রীতি আছেÑছেলেমেয়ে বড় হয়ে ডাক্তার হবে। মা-বাবারা তাদের ছেলেমেয়েদের চিকিৎসক বানাতে চান, কিন্তু কেউই চান না তার সন্তান একজন প্রশিক্ষিত নার্স হোক। তবে সামাজিক সচেতনতার অভাবেও এমনটি হচ্ছে, কেননা প্রায় সময়ই আমরা নার্সদের ধর্ষণ করার সংবাদ পেয়ে থাকি। এক্ষেত্রে নার্সদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা খুবই জরুরি।

বর্তমান করোনা পরিস্থিতি আমাদের জানান দিচ্ছে নার্সিং পেশা নিঃসন্দেহে মর্যাদার ও সম্মানের। এ ব্যাপারে জাতিকে সচেতন করতে হবে। মানুষকে বোঝাতে হবে ডাক্তার-নার্স এই দুই পেশার মানুষ কত উঁচু পর্যায়ের। বহির্বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও নার্সিং পেশাকে মর্যাদার পেশায় পরিণত করার জন্য নার্সদের জণগণের প্রতি সদয় মনোভাব নিয়ে কাজ করতে হবে এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন সভা-সেমিনারের আয়োজন করতে হবে। নার্সিং খাতে বিনিয়োগ আরও বৃদ্ধি করতে হবে। নার্সিং প্রশিক্ষণের জন্য মানসম্মত প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। তাহলে প্রত্যাশা করা যায়, অচিরেই নার্সিং পেশা বাংলাদেশে অতি মর্যাদার পেশা হিসেবে সবার মাঝে পরিচিতি লাভ করবে।

শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..