মত-বিশ্লেষণ

চিকিৎসাসেবায় নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি চাই

এসএম নাজের হোসাইন: রোনাকালে অনুধাবন করা যাচ্ছে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রকৃত হাল কেমন। দেশজুড়ে বিনা চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যুর দীর্ঘ সারি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হওয়া, সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) শয্যা ও সাধারণ রোগীর শয্যা খালি না থাকা, বেসরকারি ক্লিনিক/হাসপাতালে সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে রোগী ভর্তি না নেয়া, করোনা টেস্টের পিসিআর মেশিন ও কিট সংকট, সরকারি হাসপাতালগুলোয় চরম অব্যবস্থাপনায় রোগীর চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়া, শ্বাসকষ্টজনিত রোগীর চিকিৎসায় অক্সিজেন সিলিন্ডারের সংকট, করোনা-সংক্রান্ত ওষুধ ফার্মেসি থেকে উধাও ও আট থেকে দশগুণ পর্যন্ত দামবৃদ্ধি, রোগী ভর্তি ও অক্সিজেনের জন্য ক্লিনিকে ক্লিনিকে ঘুরে পথেই অ্যাম্বুলেন্সে মারা যাওয়া প্রভৃতি সমস্যা করোনাকালে প্রকট হতে দেখা যাচ্ছে। দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় চলছে চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে শুরু করে এ খাতে নিয়োজিত সব পর্যায়ে চলছে রোগীদের সঙ্গে প্রতারণা ও পকেট কাটার মহোৎসব। এ কারণে প্রতিদিন চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যাওয়া মানুষের সারি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। হাসপাতাল ও ক্লিনিকে গেলে মনে হবে এখানে খোদ সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি নেই। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এ ব্যবস্থা সরকারের নিয়ন্ত্রণের প্রায় বাইরে চলে গেছে। #দেশীয় চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট নয়, বড় রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তাÑযারাই রোগাক্রান্ত হচ্ছেন, তারাই দ্রুত দেশের বাইরে চলে যাচ্ছেন। খোদ রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও এমপিরা প্রতিনিয়তই দেশের বাইরে চিকিৎসা নিতে যাচ্ছেন। এটা কি আমাদের জন্য সুখকর সংবাদ? দেশব্যাপী অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও তদারকির অভাবে হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোর সেবার মান নিম্ন পর্যায়ে চলে গেছে এবং রোগীদের আস্থার সংকট চরমে উঠেছে। পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থায় এখন চলছে মালিক ও চিকিৎসকের স্বেচ্ছাচার এবং চিকিৎসাসেবার নামে প্রতারণা। হয়রানি, ভোগান্তি বা প্রতারিত হলে প্রতিকারের ব্যবস্থা না থাকায় এ খাতে অনিয়ম ক্রমেই বাড়ছে। স্বাস্থ্যসেবা এখন একটি অতি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। সে কারণে গাছ, বাঁশ ও মুদির দোকানের মালিকরাও এ ব্যবসায় ঝুঁকে পড়েছেন। ফলে হুমকির মুখে পড়েছে দেশের স্বাস্থ্যসেবা। খোদ রাজধানী থেকে শুরু করে মফস্বল শহরে ব্যাঙের ছাতার মতো অসংখ্য বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে। অধিকাংশ প্রশিক্ষণবিহীন ও ভুয়া ডিগ্রিধারী ডাক্তার দ্বারা ওইসব হাসপাতাল-ক্লিনিকে চিকিৎসাসেবা পরিচালিত হচ্ছে।

সেবামূল্য আদায়ে নৈরাজ্য: ক্লিনিক ও হাসপাতালে মালিক ও চিকিৎসকদের ইচ্ছা ও মর্জিতেই সেবার মূল্য নির্ধারণ করা হচ্ছে, সরকারি আইনের কোনো প্রয়োগ নেই। তারা ‘মেডিকেল প্র্যাকটিস, প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স, ১৯৮২’ তোয়াক্কা না করেই রোগীদের কাছ থেকে ইচ্ছামতো বিভিন্ন ফি আদায় করছেন। সংবিধানের ১৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা রাষ্ট্রের কাছ থেকে জনগণের মৌলিক সাংবিধানিক অধিকার হলেও সরকারি স্বাস্থ্যসেবা অপ্রতুল ও মানহীন। এ সুযোগে দেশজুড়ে গজিয়ে উঠেছে সরকার অনুমোদিত ও অননুমোদিত অসংখ্য বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। অধিক ব্যয়সাপেক্ষ এসব বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান থেকে নিম্ন আয়ের মানুষ কোনো সেবা পাচ্ছে না। বরং সেবার নামে অনেক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অধিক অর্থ আদায়, প্রতারণা, ভুল চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে। চিকিৎসা ফি, বেড ও ক্যাবিন ভাড়া, অপারেশন, প্যাথলজি টেস্টের ফি প্রভৃতিও প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই নির্ধারণ করছে। নতুন প্রযুক্তি, আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপনা খরচের নামে তারা চিকিৎসার খরচ বাড়াচ্ছে। তাদের স্বেচ্ছাচারিতার কাছে জিম্মি রোগীরা। তাদের ব্যবসায়িক নির্মম মানসিকতার বলি হয়ে অনেকে নিঃস্ব হচ্ছেন, অনেকে ভুল চিকিৎসায় মারা যাচ্ছেন। একই চিকিৎসার ফি ক্লিনিক-হাসপাতাল ভেদে ভিন্ন। সরকারি নীতিমালার তুলনায় ফি কোথাও শত গুণ, কোথাও হাজার গুণ, আবার কোনো কোনো কেন্দ্রে কয়েক হাজার গুণ বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, সরকারি স্বাস্থ্যসেবার ব্যর্থতার কারণে দেশের শতকরা ৬৮ ভাগ লোক বেসরকারি ক্লিনিক-হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। অথচ প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের স্বাস্থ্যসেবা করার নামেই সরকারের অনুমোদন নেয়। সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে তারা চিকিৎসা সামগ্রী ও ওষুধ আমদানিতে সরকারি ভর্তুকিও পেয়ে থাকে। অথচ প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হচ্ছে সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক ভিত্তিতে। এজন্য সরকার আরোপিত মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পরিশোধ করার কথা থাকলেও তা আদায় করা হচ্ছে বিপদগ্রস্ত রোগীদের কাছ থেকে, যা অসাংবিধানিক ও বেআইনি। কিন্তু সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো ধরনের তদারকি বা নজরদারির লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়নি। মাঝে মাঝে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান পরিচালনা করলেও ক্লিনিক-হাসপাতালগুলোর ধর্মঘটের কারণে আবার বন্ধ হয়ে যায়।

ফি আদায়ে নৈরাজ্য: রোগী ভর্তি ফি ও শয্যার ভাড়া একেক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে একেক রকম। এখানে সরকারি নীতিমালা উপেক্ষিত। মালিকের ইচ্ছামতো তা আদায় চলছে। ল্যাবএইডে শয্যার ভাড়া দৈনিক এক হাজার ৮০০ থেকে পাঁচ হাজার, স্কয়ারে দুই হাজার থেকে সাড়ে সাত হাজার এবং এ্যাপোলোতে দুই হাজার ৫০০ থেকে সাড়ে ছয় হাজার টাকা। এসব হাসপাতালে রোগীকে ভর্তির আগে শয্যার মান অনুযায়ী টাকা জমা দিতে হয়। এক্ষেত্রেও আছে ভিন্নতা। স্কয়ারে শয্যা পেতে ১০ হাজার থেকে ২৫ হাজার, ল্যাবএইডে ১০ হাজার, পপুলারে পাঁচ হাজার আর এ্যাপোলোতে লাগে ৩০ হাজার টাকা। ক্লিনিক-হাসপাতাল ভেদে পরীক্ষার ফিও ভিন্ন। আলট্রাসনোগ্রাম করাতে ল্যাবএইডে এক হাজার ২০০ টাকা, স্কয়ারে এক হাজার ৫০০ টাকা ও কমফোর্টে লাগে এক হাজার ৩০০ টাকা। ইটিটি করতে স্কয়ারে দুই হাজার ২০০ ও ল্যাবএইডে খরচ হয় দুই হাজার টাকা। এভাবে সব চিকিৎসার ফিও ক্লিনিক-হাসপাতাল ভেদে ভিন্ন। রাজধানীর ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী ও অন্য এলাকার সাধারণ বেসরকারি হাসপাতালে এ পরীক্ষা করাতে লাগে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। অভিজাত ক্লিনিক-হাসপাতালের তুলনায় সাধারণ ক্লিনিক-হাসপাতালে পরীক্ষার খরচ অনেক কম।

সাইনবোর্ডসর্বস্ব ক্লিনিক-হাসপাতাল: দেশের অধিকাংশ বেসরকারি ক্লিনিক-হাসপাতালই সাইনবোর্ডসর্বস্ব। সেগুলোয় সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ, অস্ত্রোপচার কক্ষ (শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত), চিকিৎসার জরুরি যন্ত্রপাতি, ওষুধ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরি প্রভৃতি নেই। অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকার ৫৯২টি ক্লিনিক-হাসপাতালের মধ্যে ৫০০টিতে নীতিমালা অনুযায়ী উপকরণ নেই। বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানেও তা ধরা পড়ে। এসব ক্লিনিক-হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করা হলেও থিয়েটার, দরকারি যন্ত্র ও লোকবল নেই। সার্বক্ষণিকভাবে চিকিৎসক রাখার নিয়ম থাকলেও ‘অন কলে’ এনে চিকিৎসা করানো হয়। অধিকাংশ ক্লিনিক-হাসপাতালে মালিকানার সঙ্গে প্রভাবশালী মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, রাজনীতিবিদ ও চিকিৎসক নেতারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকায় নীতিমালা না মেনেও সরকারের অনুমোদন পাওয়া যায় বলে জানা গেছে। নামসর্বস্ব ক্লিনিক-হাসপাতালের পাশাপাশি অবৈধ প্রতিষ্ঠানও নেহায়েত কম নয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, দেশে বৈধ দুই হাজার ৬০৮টি আর অবৈধ আছে পাঁচ হাজার ১২২টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র। এসব ক্লিনিক-হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবসার শিকার হচ্ছেন অসহায় রোগীরা। তালিকা থাকলেও অবৈধ ক্লিনিক-হাসপাতাল নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোনো কার্যক্রম নেই। অথচ প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার নামেই সরকারের অনুমোদন নেয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হচ্ছে সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক ভিত্তিতে।

আইনের বালাই নেই: বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট আইন রয়েছে। অথচ প্রতিষ্ঠানগুলো দেশে প্রচলিত আইনের তোয়াক্কা করছে না। ১৯৮২ সালের অধ্যাদেশ ৩-এর ধারা অনুযায়ী ফি নেয় না কেউ। আইনে উল্লেখিত ফি’র তুলনায় শত গুণ, এমনকি কয়েক হাজার গুণ বেশি নেয়া হচ্ছে। যেমন গলব্লাডার অপারেশন ফি সাড়ে তিন হাজার টাকা এবং অ্যাপেনডিক্স অপারেশন খরচ এক হাজার ৬০০ টাকা। ঢাকার যে কোনো হাসপাতালে গলব্লাডারে কমপক্ষে ৩০ হাজার এবং অ্যাপেনডিক্স অপারেশনে ২৫ হাজার টাকা লাগে। অধিকাংশ মালিকের অজুহাত, ১৯৮২ সালের অধ্যাদেশটি আজকের প্রেক্ষাপটে অবাস্তব ও অচল। সরকারপন্থি চিকিৎসক নেতাদের বিরোধিতা ও সরকারের সদিচ্ছার অভাবে যুগোপযোগী আইন হচ্ছে নাÑএমনই অভিযোগ করে থাকেন বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের মালিকপক্ষ। কেউ কেউ আবার আরেক ধাপ এগিয়ে বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় নৈরাজ্যের জন্য সরকারকে দায়ী করেন।

অপ্রতিরোধ্য চিকিৎসক: দেশেজুড়ে ব্যাঙের ছাতার মতো যে পরিমাণ বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক গড়ে উঠেছে, তার অনেক চিকিৎসকের ডিগ্রিই অপ্রয়োজনীয় ও ভুয়া। সাধারণ রোগীরা এত ডিগ্রি দেখে সরল মনে এসব ডাক্তারের কাছে দেখানোর জন্য ভিড় জমান। এ সুযোগে তারা রোগীপ্রতি ফি নেন নি¤েœ ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত। এর সঙ্গে প্যাথলজি টেস্টের নামেও চলে কমিশন বাণিজ্য। তারা রোগীকে প্যাথলজি পরীক্ষার জন্য লম্বা সিøপ দিয়ে মনোনীত ক্লিনিক কিংবা ল্যাবরেটরি থেকে পরীক্ষা করার জন্য পাঠান। নির্দিষ্ট প্যাথলজি ল্যাবরেটরি থেকে পরীক্ষা না করালে তারা রোগী দেখেন না। এতে প্রতিটি টেস্টের জন্য প্যাথলজি ল্যাবরেটরি থেকে এই চিকিৎসকরা ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কমিশন পেয়ে থাকেন। মূলত এই ডাক্তাররা রোগীদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত প্রতারণা করছেন। এতে রোগীরা বিভ্রান্ত এবং শারীরিক, মানসিক ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কর্তৃপক্ষ বিষয়টি দেখেও না দেখার ভান করে। এর জের ধরে ভুল চিকিৎসার কারণে রোগী মারা যাওয়ার ঘটনায় উত্তেজিত হয়ে রোগীর আত্মীয়-স্বজনরা অনেক স্থানে বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালের বিরুদ্ধে মামলা করছেন এবং হামলা চালানোর মতো ঘটনা ঘটাচ্ছেন। চিকিৎসাসেবার আইন কেউই মানছেন না। আইনে উল্লেখ থাকা ফি’র চেয়ে তারা শত গুণ বেশি নিচ্ছেন, যা গরিব, এমনকি মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত রোগীদের নাগালের বাইরে। ১৯৮২ সালের অধ্যাদেশে ফি ২০ থেকে ৪০ টাকা। রোগীর বাড়িতে গেলে ফি হবে ৪০ থেকে ৮০ টাকা। পদবি অনুযায়ী এরই মধ্যেই ফির পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে। আইন অমান্য করলে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা, ছয় মাসের জেল বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে। অথচ ঢাকার বেসরকারি ক্লিনিক-হাসপাতালের যে কোনো পর্যায়ের চিকিৎসকের ফি কমপক্ষে ৫০০ টাকা। অভিজাত হাসপাতালগুলোয় কারও হাজার টাকা, অনেকের ফি দুই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা। আইন না মানলেও এজন্য কোনো চিকিৎসককে সরকারি প্রতিষ্ঠান বিএমডিসি’র শাস্তি পেতে হয়নি। তবে চিকিৎসকরা যুগোপযোগী আইন প্রণয়ের দাবি জানাচ্ছেন। এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের অভিমত হচ্ছে, ১৯৮২ সালের অধ্যাদেশ আজকের প্রেক্ষাপটে মানা যায় না। তাদের মতে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ২০০০ সালের আদেশ অনুযায়ী নির্ধারিত ফি যুগোপযোগী। একে কার্যকর করতে হবে। নতুন আইনের মাধ্যমে চিকিৎসকদের ফি একটা কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। ফি নির্ধারণে স্পেশালিস্ট ও নন-স্পেশালিস্টদের বিষয়টিকে প্রাধান্য দিতে হবে। দেশে চিকিৎসকদের ডিগ্রি নিয়ন্ত্রণকারী একমাত্র প্রতিষ্ঠান বিএমডিসি রয়েছে বেহাল অবস্থায়। অথচ এ প্রতিষ্ঠানের অনুমতি ব্যতীত কোনো ডিগ্রি ডাক্তাররা ব্যবহার করতে পারেন না। কিন্তু ভুয়া চিকিৎসকদের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণে এ প্রতিষ্ঠানের একদিকে যেমন যথাযথ কোনো আইন নেই, অন্যদিকে নেই চিকিৎসকদের কার্যক্রম দেখার জন্য পর্যাপ্ত জনবলও। তবে কোনো রোগী অভিযোগ করলেই শুধু বিএমডিসি জুরি বোর্ড গঠন করে ওই ডাক্তারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখে। বিএমডিসির অ্যাক্ট অনুযায়ী তারা বাইরে গিয়ে তদারকি করতে পারে না। ভুল চিকিৎসার জন্য রোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে বিএমডিসি স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত মাত্র ১৯৯৪ সালে এক ডাক্তার ও এক স্বাস্থ্য সহকারীর রেজিস্ট্রেশন বাতিল করেছে। এর বাইরে আর কোনো চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নজির নেই।

কর আদায়ে নৈরাজ্য: বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো পরিচালিত হচ্ছে সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক ভিত্তিতে। সরকার আরোপিত মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পরিশোধ করার কথা থাকলেও তা আদায় করা হচ্ছে বিপদগ্রস্ত রোগীদের কাছ থেকে। তারা আদালতের আদেশ অমান্য করে অব্যাহতভাবে রোগীদের কাছ থেকে ভ্যাট আদায় করছে। তাদের বক্তব্য, এখনও ভ্যাট আদায় অবৈধ ঘোষণার ক্ষেত্রে হাইকোর্টের কোনো দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়নি। শোনা যাচ্ছে, হাইকোর্টের রায় স্থগিত করা হয়েছে। এজন্য ভ্যাট নেয়া হচ্ছে। এ অজুহাত দেখাচ্ছে রাজধানীর নামিদামি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো। গুণগত মানে নিম্ন হলেও দেশের অলিগলিতে গজিয়ে ওঠা প্রায় সব প্রতিষ্ঠানই এভাবে ভ্যাট আদায় করছে। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীদের অভিযোগের অন্ত নেই। আর এসব প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট আদায় তদারকির জন্য কেউ আছেন বলেও ভুক্তভোগীরা মনে করেন না।

নকল ওষুধের ছড়াছড়ি: এসব হাসপাতাল-ক্লিনিকে নকল, ভেজাল বা নি¤œমানের ওষুধ ব্যবহার করা হয়। খাদ্যের বিকল্প হিসেবে ফুড সাপ্লিমেন্টারি নামে এক ধরনের ভেজাল ওষুধের মাধ্যমে মানুষকে প্রতারিত করছে বিভিন্ন অখ্যাত-কুখ্যাত ওষুধ কোম্পানি। কিছু অসাধু ক্লিনিক মালিক ও চিকিৎসক এসব ওষুধ বিপণনকারীদের প্রলোভনে পড়ে রোগীদের এগুলো কিনতে লিখে দিচ্ছেন এবং রোগীরা উচ্চমূল্যের জঞ্জাল কিনে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। মেডিসিন জার্নালের খবরে প্রকাশ, চীন, তাইওয়ান, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ফুড সাপ্লিমেন্টারি হিসেবে আমদানি করা হচ্ছে নকল, ভেজাল ও নি¤œমানের ওষুধ। আর এজন্য বাড়ছে মানুষের ভোগান্তি। কারণ এসব নকল, ভেজাল ও নিষিদ্ধ ক্ষতিকর ওষুধ গ্রহণ করে মানুষ সুস্থ হওয়ার পরিবর্তে আরও বেশি অসুস্থ হচ্ছেন, এমনকি বহু ক্ষেত্রে জীবনও দিচ্ছেন। হেপারিন জীবনরক্ষাকারী ওষুধ। আসল ওষুধের পরিবর্তে নকল হেপারিন প্রয়োগ করলে জীবনহানি হতে পারে। আমাদের মতো দেশে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ অত্যন্ত বেশি। অথচ নকল ম্যালেরিয়ার ওষুধের কারণে হাজার হাজার মানুষের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নকল ও ভেজাল ম্যালেরিয়ার ওষুধের কারণে প্রতিবছর এক লাখ মানুষ মারা যায়। ২০০৩ সালে কম্বোডিয়ায় এক হাজার নকল ও ভেজাল ওষুধ আটক করা হয়। প্রপাইলিন গ্লাইকলের পরিবর্তে বিষাক্ত ডাই ইথালিন গ্লাইকল ব্যবহার করায় বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ, হাইতি, নাইজেরিয়া, ভারত ও আর্জেন্টিনাতে পাঁচ শতাধিক শিশু মারা যায়। নকল, ভেজাল বা নি¤œমানের ওষুধ গ্রহণের ফলে শরীরে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়ায় অনেক সময় নানা ধরনের বিভ্রান্তি দেখা দেয়। ওষুধ যখন সেবন করা হয়, তখন বোঝার উপায় থাকে নাÑওষুধটি নকল না আসল। ওষুধ সেবনের পর কাক্সিক্ষত ফলাফল পাওয়া না গেলে রোগী ভাবেন তার রোগ নির্ণয় ঠিক হয়নি। তখন রোগী অন্য ডাক্তারের কাছে যান, বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে গিয়ে আর্থিকভাবে সর্বস্বান্ত হন। নকল ও ভেজাল ওষুধের কারণে শরীরে কোনো বিষক্রিয়া বা ক্ষতিকর অবস্থার সৃষ্টি হলে তাকে ওষুধের অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে চিহ্নিত করে রোগীকে অন্য ওষুধ দেয়া হয়। মূল দোষী সেই ভেজাল ওষুধটি বরাবরই দৃষ্টির বাইরে থেকে যায়। অনেক ক্ষেত্রে নকল ও ভেজাল ক্ষতিকর ওষুধের কারণে কারও স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটলে বা মৃত্যু হলে দোষ হয় রোগের, নতুবা ডাক্তারের, অথবা হাসপাতালের। নকল, ভেজাল ও নি¤œমানের ওষুধের কারণে বিশ্বের অধিকাংশ রোগী মারা যান, সেটা আমলে নেয়া হয় না। আমাদের দেশের প্রায় সব বেসরকারি ক্লিনিক-হাসপাতালে নিজস্ব ওষুধের দোকান রয়েছে। এসব ওষুধের দোকানে অভিজ্ঞ ফার্মাসিস্ট নেই। অনেক ক্লিনিক-হাসপাতালে ওষুধ ব্যবহারের পর লেবেল, ওষুধের কৌটা বা শিশি, মোড়ক, ডিসপোজেবল সিরিঞ্জ বা গ্লাভস ব্যবহারের পর এগুলো রিপ্যাক করে বাজারজাত করা হয়। র‌্যাবের অভিযানে ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোয় ব্যবহƒত রিএজেন্টগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ ও নকল পাওয়া যায়।

বাংলাদেশ সম্প্রতি মধ্য আয়ের দেশে উপনীত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে। স্বাস্থ্য খাতের এ ধরনের গুরুতর অনিয়ম, রোগী হয়রানি ও প্রতারণার প্রতিকার না হলে দেশের কাক্সিক্ষত এ যোগ্যতা অর্জন বিলীন হতে সময় লাগবে না। কারণ চিকিৎসা ব্যবস্থায় সুশাসন না এলে পুরো জাতি রোগাক্রান্ত হবে, যার খেসারত দিতে হবে বহুগুণ। কারণ কুইনান জ্বর সারাবে, কিন্তু কুইনান সরাবে কে? ভেজাল ও প্রতিকারহীন চিকিৎসা ব্যবস্থার দরুন পুরো জাতিকে পঙ্গু করতে বেশি সময় লাগবে না। তাই চিকিৎসা ব্যবস্থার এ গুরুতর সমস্যাগুলো যত দ্রুত সম্ভব সমাধান না করা হলে স্বাস্থ্যবান জাতি যেমন আশা করা যাবে না, তেমনি জনগণের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ত্রুটি রেখে একটি দেশ কোনোভাবেই উন্নয়নশীল জাতিতে পরিনত হয়ে তার অবস্থান ধরে রাখতে পারবে না। তাই স্বাস্থ্যের সতিক্যারের সুশাসনের বিষয়টিতে অধিক গুরুত্ব দেয়া দরকার।

ভাইস প্রেসিডেন্ট

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..