মত-বিশ্লেষণ

চিকিৎসা পর্যটন হয়ে উঠতে পারে অর্থ উপার্জনের সম্ভাবনাময় খাত

হোসনেয়ারা খাতুন: রোগ-বালাইয়ের চিকিৎসা আর সেইসঙ্গে বিনোদনের জন্য ঘুরেফিরে বেড়াতে এক দেশ থেকে অন্যত্র পাড়ি জমানোকে বলা হয় মেডিকেল ট্যুরিজম বা চিকিৎসা পর্যটন। চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশি উচ্চবিত্ত ও ধনীরা বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। হিসাব-নিকাশ করে দেখা গেছে, অল্প খরচে সুষ্ঠু চিকিৎসাসেবা পাওয়াই এর প্রধান কারণ। আর তাই বাংলাদেশে চিকিৎসাসেবা উন্নত করতে হবে, যাতে স্বদেশি মানুষ বিদেশে পাড়ি না জমায় এবং একই সঙ্গে ভিনদেশিরাও যেন বাংলাদেশে ভিড় জমায় সুষ্ঠু চিকিৎসাসেবা পাওয়ার জন্য। চিকিৎসা পর্যটন বর্তমানে একটি উদীয়মান শিল্প। তাছাড়া চিকিৎসা পর্যটন বিদেশি আয়ের একটা বড় উৎস।

হাসপাতালের পাশাপাশি আয় বাড়ে হোটেল-রেস্তোরাঁয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এমন কিছু অসুখ আছে যেগুলো হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়া ছাড়াও বাইরে থাকার প্রয়োজন হয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য। আবার অনেক সময় রিফ্রেশমেন্টের জন্য ডাক্তারই পরামর্শ দিয়ে থাকেন আউটডোর কোথাও ঘুরে আসার জন্য।

বাংলাদেশ সৌন্দর্যের লীলাভূমি। অথচ চিকিৎসা পর্যটন এদেশে অসংগঠিত অবস্থায় আছে। সাধারণ অর্থে নিত্যদিনের চাপ থেকে নিজেদের চাঙ্গা করতে, একটু-আধটু অবকাশ যাপনের জন্য এদিক-ওদিক গুটি কয়েকদিন কাটিয়ে আসাকেই আমরা পর্যটন বলে থাকি। পর্যটন নিয়ে এই সাবেক ধ্যানধারণা বদলাচ্ছে। পর্যটন এখন আর নিছক বিনোদন ও অবকাশযাপন নয়। ছোট এই গণ্ডি ছাড়িয়ে পর্যটনশিল্প এখন ডানা মেলেছে বিস্তর পরিসরে। এখনই উপযুক্ত সময় স্বাস্থ্য সচেতনতা ও চিকিৎসাশাস্ত্রে কুশলতা বাড়িয়ে চিকিৎসা পর্যটনের বিকাশ ঘটানোর।

বিদেশে চিকিৎসা পর্যটন অন্যতম দ্রুত বৃদ্ধিশীল শিল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসার জন্য মোটা অঙ্কের টাকা জোগাড় করার ক্ষমতা সবার থাকে না। কম ব্যয়ে সুষ্ঠু চিকিৎসাসেবা নেওয়ার জন্য এখন মানুষ পাড়ি জমাচ্ছে বিলেত, আমেরিকা, ভারত প্রভৃতি রাষ্ট্রে। বিদেশে চিকিৎসা খরচ তুলনামূলকভাবে কম এবং চিকিৎসার জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষাও করতে হয় না। দক্ষ ও বিশেষজ্ঞ ডাক্তারও মেলে সহজে। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের চিত্র ভিন্ন। এদেশে চিকিৎসা ব্যয় যেমন বেশি, তেমনি রোগ নির্ণয়ও সঠিক নয়। এদেশে ইউরোপ, আমেরিকা, জাপান, ভারত, চীন প্রভৃতি রাষ্ট্র থেকে ভ্রমণার্থীরা এলেও চিকিৎসা পর্যটক হয়ে আসে না কেউ। ন্যূনতম খরচে আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসার সৌজন্যে চিকিৎসা পর্যটন চালু করতে হবে বাংলাদেশে। চিকিৎসা পর্যটন এদেশে এখনও অসংগঠিত ও প্রাথমিক অবস্থায় আছে। রোগী ব্যবস্থাপনায় জ্ঞানগম্যিহীন দালালদের দাপট ক্ষতি করছে ভয়ংকরভাবে। রোগী ও তার আত্মীয়দের ঠকিয়ে তারা টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। পর্যটনের মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের সেরাটা এদেশে মিললেও চিকিৎসা ক্ষেত্রে জাতীয় ও বিদেশি পর্যটকদের রয়েছে তিক্ত অভিজ্ঞতা।

পর্যটন ও আতিথেয়তা শিল্পে জোর দিয়ে চিকিৎসা পর্যটন চালু করার এখনই উপযুক্ত সময়। সেইসঙ্গে এদেশে ভ্রমণ করতে আসাটা দেশের জন্য লাভজনক হবে এবং এই লক্ষ্য পূরণের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতি-নির্দেশিকা তৈরি করা প্রয়োজন। অন্যথায় এই উদীয়মান শিল্প মুখ থুবড়ে পড়বে। আর যদি এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যায়, তাহলে চিকিৎসা পর্যটন ১০ হাজার কোটি ডলারের শিল্প হয়ে উঠবে। লাখ লাখ লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বেকারত্ব হ্রাস পাবে। সুনাম বাড়বে দেশের।

চিকিৎসার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের লোকজন পাড়ি জমাচ্ছেন বিভিন্ন দেশে। সেইসঙ্গে বাড়তি চাহিদা এদিক-ওদিক ঘুরেফিরে বেড়ানো তো আছেই। এদেশে বেড়ানোর জায়গাও রয়েছে অনেক। আর তাই চিকিৎসা পর্যটনের বিকাশ ঘটাতে স্বাস্থ্য ও পর্যটন শিল্পের রমরমা অবস্থা বোঝাতে পর্যটন সংস্থা ও গণমাধ্যমকে চিকিৎসা পর্যটন শব্দযুগল চালু করতে হবে।

এদেশ থেকে অসংখ্য মানুষ প্রতি বছর চিকিৎসা ভিসা ও পর্যটক ভিসা নিয়ে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও বিলেত যাচ্ছেন ডাক্তার দেখানো ও ভ্রমণের উদ্দেশ্যে। বিশেষ করে ভারতে পাড়ি জমাচ্ছেন অধিক হারে। আরও কী করছে জানেন? দেশে ফেরার সময় ব্যাগ-প্যাক ভরে জিনিসপত্র কিনে আনছেন। দেশের সব অর্থ অন্য দেশে দিয়ে আসছেন তারা।

সম্ভাবনাময় এই চিকিৎসা পর্যটনের মাথাচাড়া দিয়ে দাঁড়ানোর এখনই সময়। সেজন্য সব স্তরে নীতিবান লোকের প্রয়োজন। কারণ প্রত্যেকটা জিনিস একটা আরেকটার পরিপূরক। চিকিৎসা পর্যটন চালু করতে যেমন দক্ষ ডাক্তার, নার্স, হাসপাতাল, ক্লিনিক ও আবাসন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন রাস্তাঘাটের সঠিক কনস্ট্রাকশন, পর্যটনে নিরাপত্তা ও হোটেল-মোটেলের উন্নয়ন। প্রয়োজন পোশাক-কসমেটিক সামগ্রীর মানোন্নয়ন। মোটকথা, সব স্তরে সুদক্ষ ও নীতিবান লোকের প্রয়োজন। এক্ষেত্রে জোড়ামই শিকল পদ্ধতি অনুসরণ করে নীতিবান জনবলের মাধ্যমে সব স্তরের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। কারণ একজন রোগী যখন চিকিৎসার জন্য এক দেশ থেকে অন্য দেশে যান, তখন তারা সব পর্যায়ের সেবার সুনিশ্চয়তা কামনা করেন।

চিকিৎসার পাশাপাশি ভ্রমণ করা, মানসম্মত পণ্যসামগ্রী কেনাকাটা করাÑসবটাই পর্যটকদের কাম্য থাকে। বাংলাদেশে চিকিৎসা পর্যটনের কয়েকটি দিক তুলে ধরা হলো।

অ্যালোপ্যাথি বা আধুনিক চিকিৎসা: ওষুধপত্র দিয়ে চিকিৎসা ছাড়াও অ্যালোপ্যাথির আওতায় পড়ে অস্ত্রোপচার, জয়েন্ট বা সন্ধিস্থল পাল্টানো, অঙ্গপ্রতিস্থাপন, কসমেটিক সার্জারি বা রূপবর্ধক অস্ত্রোপচার। রোগ নির্ণয়, পরীক্ষা, বন্ধ্যাত্ব, রক্তসংক্রান্ত অসুখ-বিসুখ, কৃত্রিম দাঁত বসানো, কিডনি প্রতিস্থাপন, ক্যানসারের চিকিৎসা, লেজার দিয়ে অবাঞ্ছিত লোম নির্মূল, টাকে চুল বসানো বা হেয়ার ট্রান্সপ্লান্টও আছে। স্পা ও রুপটান চিকিৎসারও ধুমধাম এখন কম নয়।

আয়ুর্বেদ: ভারতে খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০ সাল থেকে আয়ুর্বেদ চিকিৎসা প্রণালি চলে আসছে। বাংলাদেশে এই চিকিৎসায় বিশ্বাসী নন অনেকে। তাছাড়া দক্ষ চিকিৎসক ও পর্যাপ্ত গবেষণা এবং পর্যাপ্ত বাজেটের অভাবে এই আয়ুর্বেদ চিকিৎসা পিছিয়ে আছে। প্রায়ই লক্ষ করা যায়, বাংলাদেশে ভারতীয় চিকিৎসক এসে আয়ুর্বেদীয় চিকিৎসা দিচ্ছেন রোগীদের। আয়ুর্বেদীয় চিকিৎসার প্রসার ঘটাতে হবে বাংলাদেশেও।

হোমিওপ্যাথি: রোগীদের জন্য আরেকটি আস্থার জায়গা হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা। এই চিকিৎসার ক্ষেত্রেও রয়েছে আমাদের যথেষ্ট অসংগঠিত অবস্থা। যেখানে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারত বহুবছর আগে থেকেই অনেক এগিয়ে। এ কারণে প্রতি বছর শুধু বাংলাদেশ নয়, আফ্রিকা, সাবেক সোভিয়েত রাশিয়ার দেশগুলো, আফগানিস্তান, পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলো, ইউরোপ, আমেরিকার মতো দেশগুলো থেকেও মানুষ ভারতে ভিড় জমাচ্ছেন চিকিৎসা পর্যটক হয়ে।

অন্যান্য চিকিৎসা বিকাশেও নজর দিতে হবে। নেচারোপ্যাথি, যোগ, মিউজিক থেরাপি, প্রাণিক হিলিং, রেইকি, ধ্যান ও অ্যারোমা থেরাপি চিকিৎসার বিকাশ ঘটাতে হবে।

বাংলাদেশে উন্নতমানের চিকিৎসাসেবার সঙ্গে অতুলনীয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মেলবন্ধন ঘটাতে পারলে এদেশ চিকিৎসা পর্যটকদের কাছে হয়ে উঠবে স্বর্গের নৈসর্গ। চিকিৎসা পর্যটনকে করতে হবে সাফল্যের আরেক হাতিয়ার।

জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি অনুযায়ী বলা যায়, বিদেশি রোগীর চিকিৎসাসেবা প্রদান আইনত এক ধরনের রপ্তানি। রপ্তানির জন্য যাবতীয় ইনসেনটিভ পাওয়ার যোগ্য এই চিকিৎসা পর্যটন খাত। সমীক্ষা করলে দেখা যায়, এই শিল্প থেকে দেশের আয় হতে পারে ১২৫-২৫০ কোটি ইউরো। চিকিৎসা পর্যটনে সিংগাপুর ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলো নামডাকওয়ালা। বছরে ৩০ শতাংশ বিকাশ হার নিয়ে ভারতও এ দেশগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে। অথচ বাংলাদেশের চিকিৎসাসেবা সেই তুলনায় অনেক পিছিয়ে, পাল্লা দেওয়া তো দূরের কথা।

চিকিৎসা পর্যটনের বিকাশে যে বিষয়গুলোয় অধিক নজর দিতে হবে।

বিপণন ব্যবস্থা: পরিশ্রমী শিক্ষার্থীই পাশ করার যোগ্যতা অধিকারে রাখে। অদক্ষ ডাক্তারদের টাকার বিনিময়ে পাশ করানো থেকে বিরত থাকতে হবে, মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতি রোধ করতে হবে। চিকিৎসা পর্যটন বিপণনে দক্ষ কর্মী প্রয়োজন। স্বাস্থ্য পরিচর্যা সহায়কদের মাধ্যমেও বাজার ধরার চেষ্টা করতে হবে। চিকিৎসা পর্যটন শিল্পে নামজাদা হাসপাতালে রোগী আনয়নে ইন্টারনেট কাজে লাগানো হয়। এগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থা করতে হবে।

হসপিটালিটি বা আতিথেয়তা পেশাদার: স্বাস্থ্য পরিচর্যায় দক্ষ চিকিৎসক থাকা যেমন পূর্বশর্ত, তেমনি পরিষেবা ও ব্যবস্থাপনায় কুশলী কর্মীর চাহিদাও যথেষ্ট।

বিদেশি ভাষা জানা লোক: আফ্রিকা ও পশ্চিম ইউরোপীয় দেশ থেকে আসা রোগী ও তাদের সঙ্গীসাথিদের অনেকে ইংরেজি জানেন না। ইউরোপের অনেক দেশের রোগীরাও ইংরেজিতে তেমন পারদর্শী নয়। এদের জন্য একাধিক ভাষীর চাহিদা বাড়বে। অধিক ভাষায় পারদর্শী হতে হবে।

চিকিৎসা পর্যটন বিকাশে আসবে বিভিন্ন সুবিধা।

স্বাস্থ্য, পর্যটন ও ভ্রমণ পরিকাঠামো উন্নয়নের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে। রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাবে। বিশ্বমানের চিকিৎসায় দেশের উজ্জ্বল ভাবমূর্তি যা ব্র্যান্ড ইমেজ বৃদ্ধি করবে। হাসপাতাল ও আতিথেয়তা (হোটেল) শিল্পের মাধ্যমে আরও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বৃদ্ধি পাবে। গবেষণা ও বিকাশের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে। মাথাপিছু সম্পদও বৃদ্ধি পাবে।

সবশেষে চিকিৎসা পর্যটন প্রসারে সরকারের জোরালো উদ্যোগ নিতে হবে। শিল্প, বিমান সংস্থা, হোটেল ও হাসপাতালের মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে হবে। হাসপাতালগুলোয় অভিন্ন দাম নীতি দূর করতে হবে। রোগী ব্যবস্থাপনায় আদৌ কোনো জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ না থাকা এবং দালালের উৎপাত রোধ করতে হবে। তাহলেই চিকিৎসা পর্যটনে আসবে সম্ভাবনাময় সফলতা।

শিক্ষার্থী

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..