প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

চিকিৎসা ব্যবস্থায় আস্থা হারাচ্ছে চট্টগ্রামবাসী: প্রতিবছর বাইরে চলে যাচ্ছে পাঁচ হাজার কোটি টাকা

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: চিকিৎসাসেবায় আস্থাহীনতা ও এর ব্যয় বেশি হওয়ার কারণে প্রতি বছর চট্টগ্রাম থেকে বহুসংখ্যক রোগী ভারত, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে ছুটে যাচ্ছেন। এ সংখ্যা কেবল বাড়ছেই। ফলে প্রতি বছর কয়েক হাজার কোটি টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে। যা একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থনীতির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সরকারি হাসপাতালগুলোয় যথাযথ সেবা না পাওয়া, দক্ষ ও যোগ্য চিকিৎসকের অভাব, মানহীন বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় অধিক সার্ভিস চার্জ গ্রহণ, জটিল ও বিশেষ ক্ষেত্রে মানসম্মত হাসপাতালের অভাব, ওষুধের উচ্চমূল্য ও ভেজাল ওষুধ, মানহীন ল্যাবগুলোর ভুল রিপোর্ট ইত্যাদি কারণে চট্টগ্রামে চিকিৎসাসেবার ওপর আস্থা হারাচ্ছে নগরবাসী। এ অবস্থা দিন দিন আরও ঘনীভূত হচ্ছে। কেউ কোনো রোগে আক্রান্ত হলে আত্মীয়-স্বজন, পরিচিত-অপরিচিতদের পরামর্শ থাকে দেশের বাইরে যেতে। বিশেষ করে পাশের দেশ ভারতে। পাশাপাশি উচ্চ-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা প্রতিনিয়ত উন্নত চিকিৎসার জন্য মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ব্যাংকক, লন্ডন, আমেরিকায় ছুটে যাচ্ছেন।
চট্টগ্রাম থেকে প্রতি বছর কতসংখ্যক লোক চিকিৎসাসেবা নিতে বিদেশ যাচ্ছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে, ভিসাপ্রার্থীদের বিদেশগামীর সঙ্গে আলাপে ধারণা করা যায়, প্রতিবছর চট্টগ্রাম থেকে এক লাখ হতে এক লাখ ২০ হাজার মানুষ বিদেশ যাচ্ছে চিকিৎসাসেবা নেওয়ার জন্য। এতে দেশের প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে। এর মধ্যে প্রতিবেশী ভারতে যাচ্ছে ৮০-৮৫ শতাংশ অর্থ।
চিকিৎসাসেবা গ্রহণে ভারতগামী একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে আলাপে জানা যায়, টাকা নয়Ñসেবার মান, আস্থা ও সন্তুষ্টিই জরুরি। বেশি টাকা ব্যয় করেও দেশে যথাযথ চিকিৎসাসেবা পাওয়া যায় না। তাদের অভিযোগ, দেশের বেশিরভাগ চিকিৎসক রোগী ও রোগীর স্বজনদের সঙ্গে প্রয়োজন-অপ্রয়োজনে দুর্ব্যবহার করেন। কেউ কেউ ছোটখাটো বিষয়ে রোগীদের ধমক দিতেও দ্বিধা করেন না। অধিকাংশ চিকিৎসক পেশাদারিত্ব ও আন্তরিকতার অভাবে রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসায় ভুল করেন। আর ভুলের মাশুল দিতে হয় রোগীকে জীবন দিয়ে। এছাড়া অল্প সময়ে অধিকসংখ্যক রোগী দেখার পাশাপাশি এক গাদা টেস্টের বিড়ম্বনা তো আছেই। চট্টগ্রামের এক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার পরিচালক (প্রশাসন) মামুনুর রশিদ বলেন, ‘ডাক্তারদের কাছে অর্থ উপার্জনই জীবনের চাওয়া-পাওয়া। তাই তারা প্রতিদিন প্রাইভেট প্র্যাকটিসে গড়ে ৫০ জনের অধিক রোগী দেখেন। নামি ডাক্তারদের কেউ কেউ ঘণ্টায় ২০ জন রোগীও দেখেন। রোগীরা তার শারীরিক সমস্যার বিশদ জানাতে চাইলেও ডাক্তারের হাতে সে সময় থাকে না। কারণ তার কাছে সময়ই অর্থ। ভিজিট বাবদ অর্থপ্রাপ্তির পাশাপাশি বিভিন্ন টেস্টের কমিশন, বিভিন্ন কোম্পানির কাছ থেকে উপহারও তারা পেয়ে থাকেন। পৃথিবীর অন্য কোথাও বাংলাদেশের মতো ডাক্তারি পেশা এতটা লাভজনক নয়।’
চট্টগ্রাম মহানগরজুড়ে ব্যঙ্গের ছাতার মতো গড়ে ওঠা অসংখ্য মানহীন ও অনুমোদনহীন রোগ নির্ণয় কেন্দ্র স্বাস্থ্যসেবার নামে ঝুঁকি বৃদ্ধি করছে। এক ধরনের অসাধু চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্মচারীর যোগসাজশে আর মুনাফালোভী কিছু ব্যবসায়ীর কারণে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নামে চলছে রমরমা ব্যবসা ও অনিয়ম। তাছাড়া তাদের দালালের খপ্পরে পড়ে প্রতিনিয়ত প্রতারণার শিকার হচ্ছে সহজ-সরল সাধারণ ও দরিদ্র মানুষগুলো। এসব সেন্টারের একদিকে যেমন নেই সংশ্লিষ্ট দফতরের কোনো অনুমোদন বা নিজস্ব ভবন; একইভাবে নেই পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ জনবল। নেই তদারকি সংস্থাগুলোর কার্যক্রমও। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের রেডিওথেরাপি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম বিভাগে এ বছর নতুন করে ৮০ হাজার মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে। পুরোনো ক্যানসার রোগী আছেন আরও তিন লাখ ২০ হাজার। সব মিলিয়ে মোট রোগীর সংখ্যা চার লাখ। কিন্তু এত রোগীর মধ্যে মাত্র বছরে সেবা পান দুই হাজার হতে আড়াই হাজার। বাদবাকি বিপুল জনগোষ্ঠী সরকারি চিকিৎসাসেবার বাইরে। এছাড়া চট্টগ্রামে তেমন ক্যানসার চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে না ওঠায় বিপুল জনগোষ্ঠী চিকিৎসাসেবা আওতার বাইরে আছে। ফলে এসব রোগীর অধিকাংশ পুরোই চিকিৎসাবিহীন মারা যান। যাদের সক্ষমতা আছে, তারা বিদেশে গিয়ে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করছেন।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, উন্নত চিকিৎসা মানুষ যেখানে পাবে, সেখানে তো যাবেই। আর এটাই স্বাভাবিক।’
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনের দেখা যায়, প্রতি বছর ভারতে চিকিৎসার জন্য ১২ লাখ বিদেশি আসছে। এ খাত হতে ১২০০ মিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হচ্ছে। আর ২০১৬ সাল শেষে তাদের স্বাস্থ্য খাতে মেডিকেল ট্যুরিস্ট হবে ৩২ লাখ; এতে আয় হবে দুই বিলিয়ন ডলার।
চট্টগ্রামে বিভিন্ন বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা ও চিকিৎসক মো. লিয়াকত আলী খান বলেন, ‘মেডিক্যাল ট্যুরিজমের আওতায় প্রতিবছর এক লাখের অধিক পর্যটক বিদেশ ভ্রমণ করেন। এতে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। অথচ চট্টগ্রামে এর চেয়ে কম খরচে চিকিৎসা সুবিধা আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ খাতে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করলে এ দেশের মানুষ উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পাবে। লাভবান হওয়ার পাশাপাশি দেশে কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হবে।’