সম্পাদকীয়

চিনি শিল্পের আধুনিকায়ন নিশ্চিত করা জরুরি

নিত্যপণ্যগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে চিনি। দেশে বছরে চিনির চাহিদা প্রায় ২০ লাখ টনের মতো। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলো উৎপাদন করতে পারে চাহিদার ১০ শতাংশেরও কম। ফলে বিপুল পরিমাণ চাহিদা মেটাতে অপরিশোধিত চিনি আমদানি করতে হয়। আর এ আমদানির সঙ্গে যুক্ত বেশ কয়েকটি বেসরকারি শিল্পগ্রুপ। তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে প্রতিনিয়ত লোকসান গুনছে রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলো। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলোর আধুনিকায়ন জরুরি বলে মনে করি।

দৈনিক শেয়ার বিজে গতকাল ‘চিনি শিল্পে পাঁচ বছরে লোকসান ৩৯৩৮ কোটি টাকা’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এ প্রতিবেদন থেকে স্বাভাবিকভাবেই মনে হতে পারে যে, এসব চিনিকল বাঁচিয়ে রাখার যৌক্তিকতা নেই। কিন্তু এগুলো বন্ধ করে দেয়া হলে চিনির পুরো বাজারটি চলে যাবে বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে। তখন তারা নিজেদের ইচ্ছামতো দাম নির্ধারণ করার সুযোগ খুঁজতে পারে। তাছাড়া বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা যে চিনি আমদানি করেন, সেটির তুলনায় রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলোয় উৎপাদিত চিনির গুণগত মান অনেক ভালো বলেই জানা যায়। কাজেই দামের পার্থক্য থাকলেও সাধারণ ক্রেতারা যাতে এ চিনি কিনতে আগ্রহী হন, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় বিপণন কৌশল গ্রহণ করা জরুরি। আধুনিক যুগে চিনিকে ‘সাদা বিষ’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। কিন্তু দেশের চিনিকলগুলো যে চিনি উৎপাদন করে, সেটি অনেকটা লালচে; যা পুষ্টিগুণে উন্নত বলেই জানা যায়। এ চিনির প্রধান কাঁচামাল ইক্ষু।

দেশের চিনিকলগুলোয় লোকসানের অন্যতম কারণ এর যন্ত্রপাতিগুলো বহু পুরোনো। বর্তমান এ আধুনিক যুগেও ডিজেলচালিত ইঞ্জিনের মাধ্যমে এগুলো পরিচালিত হচ্ছে। আর যন্ত্রাংশগুলোর বয়স ৫০ বছরেরও বেশি হওয়ায় সেগুলোর কার্যক্ষমতাও হ্রাস পেয়েছে। পাশাপাশি চিনিকলগুলো এখনও শুধু একমাত্র ফিনিশড পণ্য উৎপাদন করে। এসব কারখানায় আরও নানা ধরনের পণ্য উৎপাদন চালু করে কারখানাগুলোর বহুমুখীকরণের সুযোগ রয়েছে বৈকি। কিন্তু সে বিষয়ে এখনও কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

আধুনিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি প্রচলনের মাধ্যমে অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানই লাভজনক হয়েছে। পেট্রোবাংলার অধীন বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি এক্ষেত্রে উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এছাড়া বিভিন্ন বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিও এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হয়ে আছে। চিনিকলগুলো লোকসানের হাত থেকে বাঁচাতে এগুলোর ব্যবস্থাপনায় আধুনিকতা আনা উচিত বলে মনে করি। সেটি করা হলে চিনিকলে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীরা নিজেদের স্বার্থেই বেশি বেশি কাজ করতে চাইবেন। বর্তমানে বছরের বেশিরভাগ সময় চিনিকলে মাড়াই বন্ধ থাকে, এর প্রধান কারণ আখের সংকট। কাজেই যে সময় আখের মাড়াই বন্ধ থাকে, সে সময়ে অন্য কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।

এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, রাষ্ট্রের কাজ জনস্বার্থ রক্ষা করা। কাজেই রাষ্ট্র যদি কোনো বিষয়ে পুরোপুরি বেসরকারি খাতনির্ভর হয়ে পড়ে, তাহলে নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। আর চিনিকলগুলো শুরু থেকেই লোকসান দিচ্ছে না, একটা সময়ের পর এগুলোতে লোকসান হচ্ছে। কাজেই এগুলো পুনরায় লাভজনক পর্যায়ে ফিরিয়ে আনার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করি। আর সেটা করতে হলে ব্যবস্থাপনায় আধুনিকতা আনয়নসহ চিনিকলের সার্বিক কার্যক্রম ঢেলে সাজানো প্রয়োজন।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..