প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

চীনা প্রতিষ্ঠানের কাছে বাংলাদেশি গ্যাস প্রকল্প বিক্রি করছে শেভরন

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশে শেভরনের মালিকানাধীন প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্রগুলো কিনতে আগ্রহী চীন। দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ঝেনহুয়া অয়েলের সঙ্গে এ-সংক্রান্ত প্রাথমিক চুক্তি সই করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি শেভরন। সংস্থাটির বাংলাদেশে মোট সম্পদের পরিমাণ ২০০ কোটি ডলারের বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। বেইজিংভিত্তিক দুজন চীনা কর্মকর্তার বরাতে এ খবর দিয়েছে রয়টার্স। তবে ওই দুই কর্মকর্তা তাদের নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।

এতে বলা হয়, চীনের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নরিনকোর সহযোগী ঝেনহুয়া। এ চুক্তি সই হলে দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশে এটিই হবে চীনা কোম্পানিটির জ্বালানি খাতে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ, যেখানে বেইজিং ও নয়াদিল্লি প্রতিযোগিতায় নিয়োজিত।

শেভরনের অধীন গ্যাসক্ষেত্রগুলো কেনার বিষয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলার অগ্রাধিকার রয়েছে। পেট্রোবাংলা চাইলে এ-সংক্রান্ত যে কোনো লেনদেন বন্ধ করতে পারবে। গ্যাসক্ষেত্রগুলো কেনার অর্থ সংগ্রহের জন্য বাংলাদেশের এ সংস্থাটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করছে। ক্ষেত্রগুলো কেনার আগে এগুলোর মজুত গ্যাস সম্পর্কে সমীক্ষা চালাতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এ-সংক্রান্ত পরামর্শক হিসেবে বৈশ্বিক জ্বালানি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জিকে নিয়োগের প্রক্রিয়াও শুরু করা হয়েছে বাংলাদেশের তরফ থেকে।

বাংলাদেশি সূত্রের বরাতে খবরে বলা হয়, সম্পত্তিগুলো কেনার দৌড়ে ঝেনহুয়া অয়েলও যে রয়েছে, বিষয়টি বাংলাদেশের কর্মকর্তারা অবগত ছিলেন না। এ প্রসঙ্গে ঝিনহুয়া অয়েলের স্পকসম্যান ঝ্যাং শিয়াওদি রয়টার্সকে বলেছেন, ‘প্রকল্পটি বাণিজ্যিক আলোচনার অধীনে রয়েছে। তাই এ নিয়ে কোম্পানির নীতি অনুযায়ী কোনো বক্তব্য দেওয়া সম্ভব নয়।’

আগামী জুনের মধ্যে শেভরনের সঙ্গে চুক্তিটি চূড়ান্ত করতে যাচ্ছে সংস্থাটি। গত জানুয়ারিতে এ-সংক্রান্ত প্রাথমিক সমঝোতা হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত অ্যাসেটস সুপারভিশন অ্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কমিশনের (এসএএসএসি) অধীন অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান চায়না রিফর্ম হোল্ডিং র্কপকেও এ প্রকল্পে যুক্ত করবে ঝেনহুয়া। এতে ঝেনহুয়ার অংশ থাকবে ৬০ ভাগ ও চায়না রিফর্মের ৪০ ভাগ শেয়ার।

ই-মেইলে পাঠানো মন্তব্যে শেভরন এ বিষয়ে রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছে, এটা ছিল তাদের বাংলাদেশের সম্পদের বিষয়ে বাণিজ্যিক আলোচনা। কিন্তু নীতিগত সীমাবদ্ধতা থাকায় এর চেয়ে বেশি কিছু বলেনি কোম্পানিটি।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ এ বিষয়ে বলেন, ‘শেভরন বৈশ্বিক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে এ বিষয়টি বাংলাদেশ জানলেও ঝেনহুয়ার এখানে আগ্রহের বিষয়ে কোনো ধারণা ছিল না।’

বাংলাদেশ চীনের এই চুক্তিটিতে বাধা দেবে কি না, এ প্রশ্নে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এটি শেভরনের নিজস্ব বিষয়। আমরা এখানে বাধ সাধবো না। আমাদের অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা ছিল। আমরা আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেবো, যদি এটা টেকসই হয়।’

এর আগে ২০১৫ সালের অক্টোবরে শেভরনের তরফে বলা হয়েছিল, তারা দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি তেলের মূল্য হ্র্যাসের কারণে তার মালিকানাধীন ১০ বিলিয়ন মূল্যের সম্পদ ২০১৭ সালের মধ্যে বিক্রি করতে চায়। এর মধ্যে ছিল ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপিনসের জিওথারমাল প্রকল্প এবং বাংলাদেশের গ্যাস ক্ষেত্রগুলো।

উল্লেখ্য, গ্যাস উত্তোলনে বাংলাদেশে সর্ববৃহৎ প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক শেভরন। শুধু শেভরনের মাধ্যমেই সরবরাহ হয় দেশের গ্যাসের চাহিদার ৫০ শতাংশের বেশি। বাংলাদেশে মোট তিনটি ব্লকে গ্যাস উত্তোলনের কাজে নিয়োজিত রয়েছে কোম্পানিটি। এগুলো হলো বিবিয়ানা, জালালাবাদ ও মৌলভীবাজার গ্যাসক্ষেত্র। সম্মিলিতভাবে এ তিনটি ব্লকে এক বছরের ব্যবধানে শেভরনের বিনিয়োগ (মূলধনি ও পরিচালন) কমেছে ১৯ শতাংশ। এ তিন ব্লকে ২০১৪ সালে শেভরনের মোট মূলধনি ও পরিচালন ব্যয় ছিল ৪১ কোটি ২৯ লাখ ডলার। ২০১৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৩৩ কোটি ৫৬ লাখ ডলারে। আর ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৪৮ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। এ হিসেবে দুই বছরে বাংলাদেশে শেভরনের বিনিয়োগ কমেছে ২২ কোটি ৮৯ লাখ ডলার। এসব কারণে শেভরন তার তিনটি গ্যাসক্ষেত্রের সব সম্পদ বিক্রি করছে।

চীনের কর্মকর্তার সূত্রে বলা হয়, গত তিন বছরে তেলের দাম কমে যাওয়ায় চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি প্রতিষ্ঠানগুলো চাপের মুখে রয়েছে। ব্রেন্ট-ক্রুড এলসিও-সি-১’র মূল্য এখন ব্যারেলপ্রতি গড়ে ৫৫ ডলার। এ সময় ঝেনহুয়া অয়েল রাষ্ট্রায়ত্ত অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান চায়না রিফর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাচ্ছে। উল্লেখ্য, চীনের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও ঝেনহুয়া অয়েলকে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি পেট্রো-চায়না ও সিনোপেকের চেয়ে ছোট আকারের কোম্পানি বলা যায়।

চীনের জ্বালানি তেল ও গ্যাস আহরণকারী প্রতিষ্ঠান জিওজেড পেট্রোলিয়াম করপ ছিল প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী, যার সম্পদের পরিমাণ ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। কর্মকর্তারা বলেন, সম্ভবত যেহেতু ঝেনহুয়া রাষ্ট্রমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এবং চায়না রিফর্মের সহায়তা পাচ্ছে। তাই শেভরন এটাকে বাছাই করেছে। ইরাক, সিরিয়া, মিয়ানমার ও মিসরে কোম্পানিটির জ্বালানি তেল ও গ্যাসের ব্যবসা রয়েছে। যদি বাংলাদেশে শেভরনের সঙ্গে চুক্তিটি বাস্তবায়ন হয়, তাহলে বছরে ১৬ মিলিয়ন টন জ্বালানি চীনা প্রতিষ্ঠানের হস্তগত হবে। প্রাকৃতিক গ্যাসসহ অন্যান্য জ্বালানি মিলিয়ে যার মাধ্যমে চতুর্থ বৃহৎ জ্বালানি সরবরাহকারী দেশে পরিণত হবে চীন।