চীনে গেল জিপিএইচ ইস্পাতের আরও একটি চালান

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেড পঞ্চমবারের মতো ১৭৮ কোটি ৫০ লাখ টাকার ২৯ হাজার ৬৫৮ টন বিলেট চীনে রপ্তানি করেছে। চালানটি নিয়ে গত ৫ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্দর ছেড়ে কার্গো জাহাজ চীনের পথে রওনা দেয়। এর আগে চার ধাপে মোট ৯০ হাজার টন বিলেট রপ্তানি করে জিপিএইচ, যার বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৪২৫ কোটি টাকা। একইভাবে চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে ৫৯০ থেকে ৬৮০ কোটি টাকার বিলেট রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

জিপিএইচ ইস্পাত সূত্রে জানা যায়, পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত জিপিএইচ ইস্পাত প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে উন্নত প্রযুক্তিসমৃদ্ধ কোয়ান্টাম ইলেট্রিক আর্ক ফার্নেসের স্টিল মিল স্থাপন করে। এশিয়া মহাদেশে এ ধরনের প্রযুক্তির প্রথম ইস্পাত কারখানা এটি। এ কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে দেশের ইস্পাত খাতে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। কারখানায় কোয়ান্টাম ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস দিয়ে তৈরি হচ্ছে পিওর ও ক্লিন স্টিল। এছাড়া দেশেই এখন ৯০০ গ্রেডের ইস্পাত পণ্য উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। এ কারণে জিপিএইচ ইস্পাতের পণ্য অভ্যন্তরীণ বাজার ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও জনপ্রিয় হচ্ছে। গত বছরের অক্টোবর মাসে চীনা কোম্পানি ম্যাক স্টিল ইন্টারন্যাশনাল বিলেট কেনার চুক্তি করে। এজন্য গত বছরের ২৩ নভেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে কার্গো ২৫ হাজার টন বিলেট রপ্তানি করা হয়। একইভাবে একই কোম্পানির কাছে চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি ২০ হাজার টন বিলেট রপ্তানি করা হয়। এরপর আরেকটি চীনা কোম্পানি চিনোট্রাস্ট্রের সঙ্গে চুক্তি অনুসারে গত ১২ এপ্রিল ও ১২ মে মোট ৪৫ হাজার টন বিলেট রপ্তানি করা হয়। সবমিলে গত অর্থবছর জিপিএইচ ইস্পাত চীনে পাঁচ কোটি ডলারের বিলেট রপ্তানি করে। এর ধারাবাহিকতায় চলতি অর্থবছরের ৫ অক্টোবর জিপিএইচ ইস্পাতের উৎপাদিত ২৯ হাজার ৬৫৮ টন বিলেটবোঝাই কার্গো জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দর ছেড়ে চীনের পথে রওনা হয়েছে। পঞ্চম চালানে রপ্তানি করা ইস্পাত পণ্যের বাজারমূল্য ১৭৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যা এখন পর্যন্ত ইস্পাত খাতের সর্বোচ্চ রপ্তানি।

জানা যায়, বাংলাদেশে বিভিন্ন অপ্রচলিত পণ্য বিশেষ করে স্টিল, শিপ বিল্ডিং, কেমিকেল ও রিফাইনারির উন্নতমানের পণ্য রপ্তানি প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে প্রস্তুত। যদিও ২০০৭ সালে শিপ বিল্ডিং খাতের মাধ্যমে বাংলাদেশের ভারী শিল্পপণ্যের রপ্তানি শুরু হয়। গত ১৩ বছরে এ খাতে মাত্র ১২ কোটি ডলার পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে ইস্পাতশিল্পে গত ছয় মাসে প্রায় সাত কোটি ডলারের (৬০৩ কোটি টাকা) রপ্তানি হয়। জিপিএইচ ইস্পাত এ এক্সপোর্ট বাস্কেটে নতুন মাত্রা যোগ করে। আর বিলেট রপ্তানি দেশের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড। বাংলাদেশ থেকে একসঙ্গে এত বড় চালান এর আগে কখনও রপ্তানি হয়নি। অন্যদিকে ইস্পাত খাতের আরেক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস লিমিটেড ২০২০ সালের ৫৯ কোটি ৫৯ লাখ টাকার ইস্পাত পণ্য বিদেশে রপ্তানি করে। 

প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক (অর্থ ও ব্যবসা উন্নয়ন) কামরুল ইসলাম বলেন, দেশে বিলেট উৎপাদনে স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত স্ক্র্যাপ চাহিদার তুলনায় আমদানির ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়। ফলে স্ক্র্যাপ আমদানির সময়ে এক দফা ভ্যাট ও কর দিতে হয় এবং উৎপাদিত পণ্য রপ্তানিকালে আরেক দফা ভ্যাট ও কর দিতে হয়। ফলে দুবার ভ্যাট ও কর দিতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের ওপর একবারই ভ্যাট ও কর আরোপ করতে হবে। এছাড়া বন্দরে জেটিস্বল্পতার কারণে আমদানিকৃত কাঁচামাল নিয়ে গভীর সমুদ্রে জাহাজকে অনেক দিন অপেক্ষা করতে হয়। ফলে জাহাজের বাড়তি সময়কাল অবস্থানের জন্য কোম্পানিকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এজন্য ইস্পাতশিল্পের জন্য আলাদা জেটি বরাদ্দ দিতে হবে।

এ বিষয়ে জিপিএইচ ইস্পাতের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমাস শিমুল বলেন, বিশ্বের প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে সবচেয়ে উন্নত দেশ চীন। চীন থেকে কয়েক বছর আগেও আমাদের ইস্পাত কারখানাগুলো বিলেট আমদানি করত। সেই চীনে আমরা বিলেট রপ্তানি করছি, যা একমাত্র সম্ভব হয়েছে উন্নত প্রযুক্তিসমৃদ্ধ কোয়ান্টাম ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেসে উৎপাদিত পণ্যের গুণগত মানের কারণে।

উল্লেখ্য, জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেড ২০১২ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির পরিশোধিত মূলধন ৩৯৭ কোটি টাকা। মোট শেয়ারের মধ্যে উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে ৪৯ দশমিক ৬১ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ১৫ দশমিক ৯৭ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ৩৪ দশমিক ৪২ শতাংশ।


সর্বশেষ..