দিনের খবর শেষ পাতা

চীনে দুই লাখ কোটি টাকার পণ্য রপ্তানির সুযোগ রয়েছে

ইআরএফের সেমিনারে বক্তারা

নিজস্ব প্রতিবেদক: চীনের বাজারে বাংলাদেশি পণ্য ও সেবার রপ্তানি সহজেই আরও ৩০ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব। দেশটিতে বার্ষিক দুই লাখ কোটি টাকার ওপর রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। এছাড়া চীনা পণ্য তৈরি ও রপ্তানির বিশাল বাজারের হাব হতে পারে বাংলাদেশ। এজন্য প্রয়োজন শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়ন ও কূটনৈতিক তৎপরতা বলে মন্তব্য করেছেন দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা।

ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) ও বাংলাদেশ-চায়না ব্যবসায়ী সমিতির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত গতকাল এক সেমিনারে এমন মন্তব্য করেন তারা। অনলাইনে অনুষ্ঠিত সেমিনারটির মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘বাংলাদেশ-চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ট্রেড রিলেশনস ইন দ্য আফটারম্যাথ অব দ্য কভিড-১৯ গ্লোবাল প্যান্ডামিক’। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন চীনের রাষ্ট্রদূত লি ঝিমিং ও চীনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. মাহবুবুজ্জামান।

মূল প্রবন্ধে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) গবেষক ড. এমএ রাজ্জাক উল্লেখ করেন, করোনা মহামারির কারণে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির সম্ভাব্য লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। বর্তমান মহামারি বিবেচনায় ২০৪১ সালের পরিকল্পনায় উল্লেখ থাকা জিডিপির হারে যেতে পারছে না। বাংলাদেশ যদি রপ্তানি চিত্র উন্নত করতে চায়, তাহলে শক্তিশালী রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিতে হবে। এক্ষেত্রে চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র হতে পারে আমাদের জন্য।

কারণ হচ্ছে করোনা মহামারিতে চীনের অর্থনীতির পুনরুদ্ধার সবচেয়ে দ্রুত গতিতে হয়েছে। চীন এখন আন্তঃবিশ্ব যোগাযোগে মনোযোগী হচ্ছে। মাত্র ৩০ বছরের ব্যবধানে সাংহাই ও সিলিকন ভ্যালিকে পুরো ভিন্ন কাঠামোতে সাজিয়েছে। চোখ-ধাঁধানো উন্নয়নের চিত্র দেখা মেলে সেখানে।

গত শতকের নব্বইয়ের দশকে চীনের অর্থনৈতিক অবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও অনেক নিচে ছিল। ২০২১ সালে এসে এখন তা যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে। ২০৪১ সালে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করবে চীন। বর্তমানে দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় পণ্য রপ্তানিকারক দেশ। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ আমাদানিকারক দেশও। এটিই বাংলাদেশের জন্য সুযোগ তৈরি করবে।

বর্তমানে চীনে মাত্র এক বিলিয়ন ডলারের নিচে রপ্তানি করে বাংলাদেশ, কিন্তু আমদানি করে কয়েকগুণ বেশি। চীনে রপ্তানির সুযোগের মাত্র ৩০ শতাংশ আমরা ব্যবহার করছি। চীনের আমদানি বাণিজ্যের এক শতাংশ দখল করতে পারলে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়াবে ২৫ বিলিয়ন ডলার, যা ২০৩০ সালের মধ্যে সম্ভব। শুধু চীনেই বাংলাদেশ ২৫ বিলিয়ন ডলার পণ্য রপ্তানি করতে পারবে, স্থানীয় মুদ্রায় যা দুই লাখ ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

প্রসঙ্গত, গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে মোট চার লাখ ৭১ হাজার কোটি টাকার পণ্য ও সেবা রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। এ হিসেবে মোট রপ্তানি বাজারের ৪৫ শতাংশের বাজার হতে পারে চীন। গত বছর বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য হয়েছে ১২ বিলিয়ন ডলার। এ সময় দেশটিতে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে শূন্য দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলার ও আমদানি করেছে ১১ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য।

আলোচকরা বলেন, তৈরি পোশাক খাতের বড় একটি বাজার হতে পারে চীন। বর্তমানে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) রয়েছে। বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের পর, অর্থাৎ ২০২৬ সালের পরও বর্তমান বাণিজ্য সুবিধা নিতে বাংলাদেশের কূটনীতি করা দরকার।

অপরদিকে চীনের বিনিয়োগ আনার বড় সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশের। সম্ভাবনার যুক্তি তুলে ধরে আলোচকরা বলেন, চীন এখন টেক জায়ান্ট হিসেবে নেতৃত্বে রয়েছে। প্রযুক্তি খাতে তারা বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। ইলেকট্রনিক, অটোমোবাইল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বিকল্প জ্বালানিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, চীন ৯৭ ভাগ পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশকে ডিউটি ও কোটা ফ্রি বাণিজ্য সুবিধা দিচ্ছে। বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সহযোগী রাষ্ট্র চীন। বাংলাদেশের বৃহৎ উন্নয়ন সহযোগীও চীন। পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প, ঢাকায় মেট্রো রেল প্রকল্প, বঙ্গবন্ধু কর্ণফুলী টানেল প্রকল্প, ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্পসহ অনেক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করে যাচ্ছে চীন।

চীনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. মাহবুবুজ্জামান বলেন, আট হাজারের বেশি পণ্যে বর্তমানে ডিউটি ফ্রি সুবিধা পাচ্ছে বাংলাদেশ চীনের বাজারে। চীন থেকে আমরা মূলধনি যন্ত্রপাতি, কেমিক্যাল ও আইটি পণ্য আমদানি করে থাকি। এটি আমাদের প্রয়োজনও।

ঢাকাস্থ চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং বলেন, চীনের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির বিশাল সুযোগ রয়েছে। নতুন এফটিএ করতে ও বাণিজ্য বৃদ্ধিতে দুই দেশের সরকার কাজ করতে পারে। মহামারি শুরুর দিকে গত বছর বাংলাদেশ মেডিকেল পণ্য দিয়েছে চীনে। বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে চীনও সেই স্মৃতি মনে রেখে সামর্থ্য অনুযায়ী উপহার দিয়ে চলেছে বাংলাদেশকে। সব ধরনের সমস্যা সম্ভাবনা নিয়েও আসে। চীন-বাংলাদেশ যৌথভাবে টিকা উৎপাদন করবে বলে চিন্তা করা হচ্ছে, যা দুই দেশের বন্ধুত্বকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। সিল্করুট বাস্তবায়ন হলে এ সুবিধা আরও বাড়বে। আমাদের মধ্যে যোগাযোগের আরও ক্ষেত্র তৈরি হবে।

বাংলাদেশ-চায়না ব্যবসায়ী সমিতির প্রেসিডেন্ট গাজী গোলাম মর্তুজা বলেন, বাংলাদেশ-চীনের মধ্যে বাণিজ্য ভারসাম্য একটি জায়গায় নিয়ে আসার সুযোগ রয়েছে। সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগানোর জন্য আমাদের সংগঠন কাজ করে যাবে।

ইআরএফের সভাপতি শারমিন রিনভীর সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক এসএম রাশেদুল ইসলামের সঞ্চালনায় সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সিরাজুল ইসলাম, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) শাহ মো. সুলতান উদ্দীন আহমেদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আল মামুন মৃধা প্রমুখ।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ ➧

সর্বশেষ..