আজকের পত্রিকা

চুয়াডাঙ্গায় অসময়ে মুখিকচু আবাদ করে সফল কৃষকরা

মফিজ জোয়ার্দ্দার, চুয়াডাঙ্গা : খাদ্যশস্য ও অর্থকরী ফসলের পাশাপাশি চুয়াডাঙ্গায় কৃষকরা নানা ধরনের সবজির আবাদ করে থাকেন। ভুট্টা ও ধানের পরেই জেলায় সবজির অবস্থান। ভুট্টা ও আমন ধানের মাঝামাঝি জেলার প্রান্তিক কৃষকরা অধিক মুনাফার আশায় মুখিকচু আবাদ করে থাকেন।

সরেজমিনে বিভিন্ন স্থানে গিয়ে জানা গেছে, তিন মাস বা সাড়ে তিন মাসের ব্যবধানে মুখিকচু আবাদ করে অল্প পরিশ্রমে লাভবান হচ্ছেন জেলার প্রান্তিক কৃষকরা। সাধারণত উঁচু জমিতে এ ফসলের ফলন ভালো হয়। অসময়ে বাজার ভালো পেয়ে লাভবান হওয়ায় জেলার প্রান্তিক কৃষক ঝুঁকছেন এ ফসলে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত বছর জেলার কৃষকরা এক হাজার ১৯৮ হেক্টর জমিতে মুখিকচু আবাদ করেছিলেন। ভালো মুনাফা পাওয়ায় চলতি বছর ২৭৬ হেক্টর বেশি জমিতে মুখিকচু আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে মৌসুমে সদর উপজেলায় ৮৮৮ হেক্টর জমিতে, আলমডাঙ্গায় ৩৫৬ হেক্টর, জীবননগরে ১৩০ হেক্টর জমিতে ও দামুড়হুদা উপজেলায় ১০০ হেক্টরসহ মোট এক হাজার ৪৭৪ হেক্টর জমিতে মুখিকচু আবাদ হয়েছে। চলতি মৌসুমে এ আবাদে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩০ হাজার ৯৬০ টন।

কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, আলমডাঙ্গার ভাংবাড়িয়া, হারদি, চিৎলা, জেহলা, বলিয়ারপুর, চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার সুবদিয়া, খেজুরতলা, গাইদঘাট, দিননাথপুর, সরোজগঞ্জ, দামুড়হুদার বিঞ্চপুর, কার্পাসডাঙ্গা, বাঘাডাঙ্গা, হোগলডাঙ্গা ও জীবননগরের বাঁকা এলাকায় এ ফসলের আবাদ হয়ে থাকে।

দামুড়হুদা উপজেলার বাঘাডাঙ্গা গ্রামের হাবিবুর রহমান বলেন, আমি চলতি মৌসুমে এক বিঘা জমিতে মুখিকচু আবাদ করেছি। ফাল্গুন মাসে সাধারণত এ ক্ষেত রোপণ করা করা হয়। আষাঢ় মাসে ওঠানো হয়। এক বিঘায় তিন থেকে চার মণ বীজ লাগে। নিজের স্যালো মেশিন না থাকলে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ হয়, থাকলে খরচ একটু কম হয়। বিঘাপ্রতি ৪০ থেকে ৪৫ হাজার  টাকা লাভ হয়।

একই গ্রামের আসাদুল হক বলেন, আমি ভুট্টা কাটার পর চৈত্র মাসে ১০ কাঠা জমিতে কচুর আবাদ করেছিলাম। ভালো হলে কাঠা প্রতি চার মণ পর্যন্ত হয়ে থাকে। বর্তমান ৪০ থেকে ৫০ টাকা দরে খুচরা বাজারে কেজিপ্রতি কচু বিক্রি হচ্ছে। কচুতে লোকসান নেই লাভই হয়। আবার ওই জমিতে আমন ধানের আবাদ হয়।

আলমডাঙ্গা উপজেলা গৌড়িহ্রদ গ্রামের কৃষক এখলাছুর রহমান জানান, এক বিঘা জমিতে আমি কচুর আবাদ করেছি। এখন এক হাজার ১০০ থেকে ২০০ টাকা দামে মণপ্রতি কচু বিক্রি হচ্ছে। এমন বাজার থাকলে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা কচু বিক্রি করে মুনাফা থাকবে।

জানা গেছে, স্থানীয় ব্যবসায়ীরা গাংনী, ভাংবাড়িয়া, হারদি, মোমিনপুর, ডিঙ্গেদাহ, বেগমপুর, কার্পাসডাঙ্গা থেকে কচু ক্রয় করে ট্রাকযোগে খুলনা, ঢাকা, চট্টগ্রাম, ফরিদপুর ও মাগুরায় পাঠান। সেখানে কচুর পাইকারি বাজার গড়ে উঠেছে। তবে করোনার কারণে অনেক ব্যবসায়ী এবার কচুর বাজার নিয়ে শঙ্কাও প্রকাশ করেছেন।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, ক্লান্তি হ্রাস করার পাশাপাশি মুখিকচু শক্তি ধরে রাখতে ও ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করে। ওজন কমানোর জন্য বেশ কার্যকর। কারণ এর ক্যালরির পরিমাণ খুবই কম। হজম সহায়ক এ সবজিতে প্রচুর ফাইবার থাকে বলে পরিপাক প্রক্রিয়ার জন্য খুবই উপকারী। এটি দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। পাকস্থলির বর্জ্য পদার্থ নিষ্কাশনেও সাহায্য করে মুখিকচু।

চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক সুফি রফিকুজ্জামান জানান, সাধারণত কৃষকরা ফাল্গুন বা ভুট্টা কেটে চৈত্র মাসে অধিক মুনাফার আশায়  মুখিকচু আবাদ করে থাকে। এ ফসল সাধারণত উঁচু জমিতে ভালো হয়। তিন বা সাড়ে তিন মাসে অল্প খরচে কৃষকরা ভালো ফলন পেয়ে থাকে। বর্তমানে মণপ্রতি এক হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে।

তিনি জানান, জেলায় এবার এক হাজার ৪৭৪ হেক্টর বা ১১ হাজার ১০ বিঘা জমিতে মুখিকচু আবাদ করেছে কৃষকরা। যদি গড়ে বিঘা প্রতি ৭৫ মণ করে কচু উৎপন্ন হয়, তবে ৮২ লাখ পাঁচ হাজার ৮০৮৮ মণ কচু উৎপন্ন হবে। প্রায় ৯০ কোটি ৮৩ লাখ ৮৯ হাজার ৩৫০ টাকায় কচু বিক্রি করে জেলার অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারবে বলে তিনি জানান।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..