সারা বাংলা

চুয়াডাঙ্গায় দূষিত হচ্ছে মাথাভাঙ্গা নদীর পানি

বড়বাজারে অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

মফিজ জোয়ার্দ্দার, চুয়াডাঙ্গা: চুয়াডাঙ্গা বড়বাজার গোশত পট্টিতে পশুসহ মুরগির রক্ত ও বর্জ্য পচে মাথাভাঙ্গা নদীর পানি দূষিত হচ্ছে। পাশাপাশি উৎকট গন্ধে ব্যবসায়ী, ক্রেতাসহ নদীপারের বাসিন্দাদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। পৌরসভা ও সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত অভিযোগ করেও প্রতিকার পাননি তারা।
চুয়াডাঙ্গায় মাথাভাঙ্গা নদীর তীরে বড়বাজারে ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় গোশত, মাছ, সবজি ও মুদিবাজার। প্রবেশমুখেই সপ্তাহের প্রতি শনিবার ও মঙ্গলবার বসে পানের হাট। প্রধান সড়কের পাশে বসে মৌসুমি ও বিদেশি ফলের বাজার। এ বাজারে বিশেষ করে গোশত পট্টিতে রয়েছে অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা। একটিমাত্র ড্রেন দিয়ে শহর ও বাজারের ময়লা পানি, রক্ত ও বর্জ্য গিয়ে মাথাভাঙ্গা নদীর পানি দূষিত করছে। এছাড়া অপরিকল্পিতভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে উৎকট গন্ধে ব্যবসায়ী, ক্রেতাসহ নদীপাড়ের বাসিন্দাদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
চুয়াডাঙ্গা শহরতলি দৌলাতদিয়াড় নদীপাড়ে বসবাসকারী শ্রমিকনেতা মশিউর রহমান জানান, বড়বাজারে জবাই করা পশুর রক্ত ও বর্জ্য নদীর পানি দূষিত করছে। ওপারের দুর্গন্ধের কারণে নদীপারে বসবাস করা দুরূহ হয়ে পড়েছে।
নদীপারের বাসিন্দা শুকুর আলী জানান, নদীর পানি একসময় স্বচ্ছ ছিল, এখন বাজারে জবাই করা পশু ও মুরগির রক্ত-বর্জ্য পানিতে পড়ে পানি নোংরা হয়ে গেছে। নদীর পানিতে এখন গোসল করা যাচ্ছে না।
একই এলাকার ফারুক হোসেন জানান, বাজারের উৎকট দুর্গন্ধের কারণে এলাকা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে যাওয়ার বিষয়টি চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার মেয়র ও সিভিল সার্জনকে জানানো হয়েছে, কিন্তু কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি। অপর বাসিন্দা মজিবুল জানান, দুর্গন্ধের কারণে এখানকার মসজিদে মুছল্লিরা আসতে চান না।
পান ব্যবসায়ী মুক্তার আলী জানান, বাজারে এত দুর্গন্ধ যে, টেকা মুশকিল হয়ে গেছে। খুব কষ্ট করে এখানে পান বেচাকেনা করতে হচ্ছে। ক্রেতা রবিউল মালিতা জানান, উৎকট গন্ধের কারণে বাজার করা সম্ভব হয় না।
গোশত ব্যবসায়ী মাসুদ রানা জানান, বাজারে কসাইখানায় পর্যাপ্ত পানি ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা নেই। বাজারে এত দুর্গন্ধ যে ক্রমেই ক্রেতা কমে যাচ্ছে। এছাড়া বাজারের আশপাশের বাড়িতে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় বাড়ির মহিলারা প্রতিদিনই অভিযোগ করেন।
গোশত ব্যবসায়ী হাসান জানান, বর্জ্যগুলো ফেলার নির্দিষ্ট জায়গা না থাকায় সেগুলো নদীর পাশেই ফেলতে হয়। বাজারের পাশে মেথরপট্টির একপাল শূকর সব সময় বর্জ্য স্তূপ ঘাঁটাঘাঁটির করে দুর্গন্ধের মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে। যে খদ্দেররা আসে, তারা গোশত কিনতে অস্বস্তিবোধ করে।
মুরগির গোশত ব্যবসায়ী বাবু শেখ জানান, মুরগি জবাইয়ের পর পালক ও নাড়িভুঁড়ি রাখার একটি নির্দিষ্ট জায়গা করে দিলে দুর্গন্ধের মাত্রা অনেক কমে আসবে। এ ব্যাপারে কেউ কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এ কারণে বাজারে দুর্গন্ধ বেড়েই চলেছে।
গোশত শ্রমিক লুৎফর রহমান জানান, বাজারে একটিমাত্র জবাইখানা আছে। এখানে নেই পর্যাপ্ত পানি ও বর্জ্য ফেলার ব্যবস্থা। তাছাড়া বেশ কিছুদিন হলো বাজারের টয়লেটের সø্যাব ভেঙে যাওয়ায় সেখান দিয়ে মলমূত্র বের হয়ে আরও পরিবেশদূষণ করছে।
চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার সেনেটারি ইন্সপেক্টর নার্গিস জাহান জানান, বাজারে নির্দিষ্ট নিয়মেই পশু জবাই করা হয়। বাজারে সার্বক্ষণিকভাবে কসাইখানা পরিদর্শক তার দায়িত্ব পালন করেন। পশু জবাইয়ের পর গোশতে সিল মারার জন্যও একজন রয়েছেন। এখানে পানির ব্যবস্থা অপ্রতুল রয়েছে। একটা টিউবওয়েল নষ্ট হলে তা সারাতে বেশ কিছু দিন লেগে যায়। বাজারে পৌরসভার শ্রমিক দিয়ে নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ করা হয়। কিন্তু হরিজন সম্প্রদায়ের পোষা শূকর ময়লার স্তূপগুলো নাড়াচাড়া করে পরিবেশ নষ্ট করে। এ ব্যাপারে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বাজারে আরও কীভাবে সেনিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়, তার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
সেনেটারি ইন্সপেক্টর নর্গিস জাহানের কথার সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করে গোশত ব্যবসায়ীরা জানান, সকাল থেকে পৌরসভার কোনো কর্মচারী বাজারে উপস্থিত থাকে না। পৌরসভার কসাইখানা পরিদর্শক রহিদুল ইসলাম কোনোদিনই তার দায়িত্ব পালন করেন না। কসাইরাই পশু জবাই করা গোশতে পৌরসভার সিল মেরে তা বিক্রি করে। বর্জ্য অপসারণকারীকে মাঝেমধ্যে দেখা গেলেও দায়িত্ব পালন করেন না। সেনেটারি ইন্সপেক্টর ও কসাইখানা পরিদর্শকের বিরুদ্ধে কসাইদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগও রয়েছে।
সিভিল সার্জন খায়রুল আলম জানান, বাজারে গরু, ছাগল ও মুরগি জবাই করা রক্ত-পানি সব মাথাভাঙ্গা নদীর পানিতে মিশছে। বর্জ্য অপসারণের ভালো ব্যবস্থা না থাকায় রক্ত পচে যে দুর্গন্ধের সৃষ্টি হয়, এতে জনস্বাস্থ্যে বিরাট ক্ষতি হচ্ছে। এখানে বায়ু ও পানি দূষিত হচ্ছে। বায়ুদূষণের কারণে শ্বাসকষ্ট ও শরীরের ভেতরে ইনফেকশন দেখা দেয়, আর পানিদূষণের কারণে পেটের পীড়া ও চর্মরোগ হয়। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এখান থেকে বর্জ্য অপসারণ না করতে পারলে এ এলাকায় ব্যাপক স্বাস্থ্যহানি ঘটবে।
চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার মেয়র ওবায়দুর রহমান চৌধুরী জানান, সমস্যা সমাধানে বাজারে একটি আধুনিক মানের কসাইখানার প্রয়োজন। এজন্য এরই মধ্যে ইউজিপ-৩-এর দ্বিতীয় ফেজে একটি প্রকল্পের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। আশা করি এ প্রস্তাব পাস হয়ে আসবে। তখন আধুনিক মানের একটি কসাইখানা নির্মাণ করলে এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..