প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

চূড়ান্ত রায়ের পরই মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তকে রাখা হোক কনডেমড সেলে

ইসমাইল জাবিউল্লাহ: যখন একজন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগ পর্যন্ত যে সেলে রাখা হয় সেটিকে কনডেমড সেল বলা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে বলছেন জেলের ভেতর জেল তার নাম কনডেমড সেল। সাধারণ সেল আর কনডেমড সেলের মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। সাধারণ সেল কনডেমড সেলের তুলনায় আকারে বড় হয়। সাধারণ সেলে সাধারণত দশজন বা তার অধিক আসামি রাখা হয় কিন্তু কনডেমড সেলে একজন অথবা তিনজনকে রাখা হয়।

সাধারণত মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামিদের কারাগারের অন্যান্য অপরাধীদের চেয়ে আলাদা ধরনের কক্ষে রাখা হলেও বাংলাদেশের জেল কোড বা কারাবিধি মোতাবেক সেরকম কোনো আইন নেই।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে একজন আসামিকে বিচারিক আদালত মৃত্যুদণ্ড রায় দিলেই কি কনডেমড সেলে রাখতে হবে। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে কিন্তু কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

বাংলাদেশেকে বলা হয়, কমন ল কান্ট্রি। অর্থাৎ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্গত কলোনিগুলো, যা পরবর্তীতে স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, সেসব দেশগুলোয় ইংরেজদের প্রণীত আইনের প্রভাব দেখা যায়। আইনের এই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রভাবই মূলত কমন ল। যেসব দেশ কমন ল সিস্টেম বিচারব্যবস্থা অনুসরণ করে সেখানে একটা মামলা নিষ্পত্তি হতো কমপক্ষে দশ থেকে বারো বছর লেগে যায়। ফলে একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত কনডেমড সেলে থেকে মৃত্যুর প্রহর গুনতে হয়। নি¤œ আদালত আসামিকে ফাঁসির রায় দিলে সেটা কার্যকর করতে হাইকোর্ট থেকে ডেথ সার্টিফিকেট প্রয়োজন। তখন উচ্চ আদালতে ওই মামলার শুনানি হয়।  যদি  উচ্চ আদালত আসামি কে খালাস বা শাস্তি মওকুফ না করে তাহলে ফাঁসি কার্যকর করা  পর্যন্ত কনডেমড সেলেই থাকতে হয়।

এখান থেকেই আসামিকে কোটে আনা নেয়া করা হয়। বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ৫০০র মতো আসামি কনডেমড সেল মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার অপেক্ষা আছে।  এর মধ্যে অনেক নারী আসামিও রয়েছে। এ পর্যন্ত অনেক নারীকে মৃত্যুদণ্ড দিলে কার্যকর করা হয়নি বাংলাদেশে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, নি¤œ আদালত ফাঁসির রায় দিলে উচ্চ আদালতে সেই রায় স্থগিত করে খালাস প্রদান করে।

সে রকম একটি ঘটনা উল্লেখ নিচে উল্লেখ করা হলো বাগেরহাটের আদালত ২০০০ সালের ২৫ জুন এক রায়ে একমাত্র আসামি খুলনার জাহিদ শেখকে মৃত্যুদণ্ড দেন। রায় ঘোষণার আগে জাহিদ আদালতে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। নিন্ম আদালতের রায় অনুমোদনের জন্য উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্স পাঠানো হয়। চার বছর পর হাইকোর্টে শুনানি হয়। এরপর ২০০৪ সালের ৩১ জুলাই সেখানেও মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়। পরে ওই রায়ের বিরুদ্ধে কারাগার থেকে ২০০৭ সালে আপিল বিভাগে জেল আপিল করেন জাহিদ। এতদিন মামলাটি ওই বিভাগেই পড়ে ছিল। মামলাটি নজরে পড়ে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চের। মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেন সর্বোচ্চ আদালত। নিযুক্ত করা হয় জাহিদের আইনজীবী। কিন্তু মামলার শুনানি করতে গিয়ে আপিল বিভাগ লক্ষ করেন নানা অসঙ্গতি। বিষয়টি আদালতের সামনে তুলে ধরলে দীর্ঘ শুনানি শেষে গত বছরের ২৫ আগস্ট আপিল বিভাগ জাহিদকে খালাস দেন। বিনা দোষে ২০ বছর কারাভোগ করে অবশেষে মুক্তি পান জাহিদ শেখ।

প্রায় ২০ বছর পর্যন্ত কনডেমড সেলে থাকতে হয় ওই আসামিকে, যাকে প্রতিটি মুহূর্ত মৃত্যুর প্রহর গুনতে হয়েছে। তার ওই সময়ের মানসিক অবস্থা তিনি ব্যতীত কারও উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। ছাড়া পেয়ে তার আপন বলতে তো আর কেউ থাকল না, বাস্তব জীবন থেকে সম্পূর্ণ একাকী হয়ে গেছেন। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে তাহলে তাদের কোথায় রাখা যেতে পারে?

সেক্ষেত্রে কনডেমড সেলে না রেখে অন্য আসামিদের সঙ্গে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়ে তাদের রাখা যেতে পারে যেমন ভারতসহ অনেক দেশে প্রচলিত আছে। সম্প্রতি হাইকোর্ট তিনজন আসামি এই নিয়ে একটি রিট করা হয়েছে সব আইনি ও প্রশাসনিক কার্যক্রম শেষ হওয়ার আগে কনডেমড সেলে রাখার প্রসঙ্গে। যদিও হাইকোর্ট থেকে এখনও রায় আসেনি।

আমরা জানি, নিন্ম আদালতের রায়ে কেউ যদি সন্তুষ্ট না হন তা নিয়ে হাইকোর্টে আপিল করতে পারেন। হাইকোর্টে একটা মামলা নিষ্পত্তি হতে প্রায় ছয় থেকে সাত বছর লেগে যায়। আবার হাইকোর্ট রায়ে সন্তুষ্ট না হলে আপিল বিভাগে আপিল করা যায় সেখানেও সব প্রক্রিয়া শেষে হতে সাত থেকে আট বছর লেগে যায়। আপিল বিভাগে খালাস না পেলে সর্বশেষ রাষ্ট্রপতির নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করার সুযোগ আছে। রাষ্ট্রপতি যদি ক্ষমা করে দেন তাহলে সাজা থেকে খালাস পেতে পারেন।

তাই প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক দীর্ঘদিন কনডেমড সেলে মৃত্যুর প্রহর গণনা কোনো সুখময় অভিজ্ঞতা নয়। তাই আপিল বিভাগ ও রাষ্ট্রপতির থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়ার পরই কনডেমড সেলে একজন মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত আসামিকে রাখা উচিত বলে মনে করি।

শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়