এসএমই

চৌগাছায় পান চাষ স্বাবলম্বী অনেক পরিবার

যশোরের চৌগাছা উপজেলার চারটি ইউনিয়নে বাণিজ্যিকভাবে চলছে পান চাষ। এরই মধ্যে উপজেলার ধুলিয়ানী, স্বরূপদাহ, নারায়ণপুর ও সুখপুকুরিয়া ইউনিয়নে পান চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছে অনেক পরিবার। এসব ইউনিয়নের অধিকাংশ কৃষকের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শিক্ষকসহ নানা পেশার মানুষও কমবেশি ঝুঁকে পড়েছেন পান চাষে। পান দীর্ঘমেয়াদি ও লাভজনক অর্থকরী ফসল হওয়ায় এসব ইউনিয়নের মানুষ পান চাষে ঝুঁকে পড়ছেন বলে অনেকের অভিমত। এ অঞ্চলের উৎপাদিত পান স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।

সম্প্রতি ধুলিয়ানী ইউনিয়নের ফতেপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, পানচাষিরা বরজ থেকে পান সংগ্রহ করে বাজারজাত করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ সময় কথা হয় পানচাষি ফতেপুর গ্রামের জয়নুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘প্রথমে স্বল্প পরিসরে একটি পানের বরজ তৈরি করেছিলাম। বছর শেষে ওই বরজ থেকে লাভের মুখ দেখায় মাত্র দেড় বছরের মধ্যে তিন বিঘা জমিতে পানের বরজ করেছি।’ সপ্তাহে দুই দিন তিনি বরজ থেকে পান সংগ্রহ করে চৌগাছাসহ, ঝিকরগাছা ও সদর উপজেলায় বিক্রি করেন। জয়নুর রহমান আরও বলেন, পান একটি লাভজনক ফসল। একবার একটি বরজ তৈরি করে সঠিক পরিচর্যা করলে আট থেকে ১০ বছর পর্যন্ত পান বিক্রি করা যায়।

পানচাষিদের তথ্যমতে, এক বিঘা জমিতে একটি বরজ তৈরি করতে বাঁশ, সুতা, তার, ঝাটি, পাটকাঠি, পানের লতা ও শ্রমিক খরচসহ প্রায় দুই লাখ টাকা ব্যয় হয়। বরজে পানের লতা বপন করার তিন মাস পর থেকে প্রতিটি লতা পান দিতে শুরু করে। আষাঢ়ে বরজে পানের লতা বপন করলে তা তুলনামূলকভাবে বেশি ভালো হয় বলে তারা জানান।

৮০টি পানে এক পোন হয়। এক পোন পান বাজারে প্রকারভেদে ৫০ থেকে ২৫০ টাকা দরে বিক্রি করেন তারা। কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা মড়ক দেখা না দিলে এক বিঘা জমিতে সব খরচ বাদ দিয়ে বছর শেষে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকার পান বিক্রি করা সম্ভব।

কৃষক জয়নুর রহমানের মতো ওই গ্রামের আবদুল আজিজের ১২ কাঠা, মতলেব হোসেনের চার কাঠা ও মিজানুর রহমানের এক বিঘা পাঁচ কাঠায় পান চাষ হচ্ছে। একই গ্রামের শরিফুল ইসলাম দেড় বিঘা, ইয়াকুব আলী এক বিঘা, মহর আলী দুই বিঘা, রেজাউল ইসলাম এক বিঘা, মাসুদ রানা ১৫ কাঠা, মুস্তাক আলী দেড় বিঘা, কুব্বত আলী ১৫ কাঠা ও খোরশেদ আলী দেড় বিঘা জমিতে পানের বরজ করে এখন স্বাবলম্বী।

পানচাষিরা বলেন, যে কোনো মাটিতে পান চাষ করা যায়। তবে দোয়াঁশ বা এঁটেল-দোয়াঁশ মাটি পান চাষের উপযুক্ত। এছাড়া সেচের সুব্যবস্থা রয়েছে এমন বেলে দোয়াঁশ মাটিতেও পান চাষ করা যেতে পারে। ছায়াযুক্ত আর্দ্র স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া ও রসযুক্ত মাটি পান চাষের জন্য বেশি উপযুক্ত। এ অঞ্চলে মূলত ভাবনা ও ঝাল জাতের পান চাষ করা হয়। এছাড়া মিঠা, সাচি, গ্যাচ, নাতিয়াবাসুত, উজানী, মাঘি, বরিশাল প্রভৃতি জাতের পানের ফলনও চোখে পড়ে।

পানচাষি রেজাউল ইসলাম বলেন, একটি পানের বরজ তৈরির সময় কৃষককে এককালীন মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করতে হয়। এরপর পান ওঠা শুরু করে। পান বিক্রি করেই বরজের খরচ বহন করা যায়। এ কারণে কৃষককে খুব বেশি সমস্যায় পড়তে হয় না। অন্য ফসলের মতোই পানের বরজে নিয়মিত সার দিতে হয়। তবে পানের উপযুক্ত খাদ্য হচ্ছে খোল। এ কারণে রাসায়নিক সারের চেয়ে পান ক্ষেতে বেশি খোল দেওয়া হয় বলে তিনি জানান।

পানের বরজে কর্মরত শ্রমিক বিদ্যুৎ হালদার, গোবিন্দ কুমার পাল ও আক্তারুল ইসলাম বলেন, বছরের পুরোটা সময় আমরা পানের বরজে কাজ করে জীবিকানির্বাহ করি। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৩০০ টাকা হাজিরা পাই। এরপর প্রতি ঘণ্টা ৬০ টাকা হিসাবে তারা পানের বরজে কাজ করেন।

স্কুলশিক্ষক আমিনুর রহমান বলেন, ‘পাঁচ বছর আগে বাড়ির পাশের পতিত ১০ কাঠা জমিতে পানের বরজ করি। এজন্য দিনচুক্তিতে একজন শ্রমিক নিয়োগ দিয়েছি।’ স্কুলে যাওয়ার আগে ও ছুটির পরে তিনি ওই শ্রমিকের সঙ্গে পানের বরজে কাজ করেন। বর্তমানে তার দেড় বিঘা জমিতে পানবরজ রয়েছে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গিয়েছে, উপজেলার সব এলাকার জমি সব ধরনের ফসল উৎপাদনের জন্য উপযোগী। এ অঞ্চলের কৃষকরা সব ধরনের ফসলের পাশাপাশি বর্তামানে পান চাষে বেশ ঝুঁকে পড়েছেন। বর্তমানে উপজেলায় ৯২ হেক্টর জমিতে পান চাষ হয়েছে। গত বছরের তুলনায় সাত হেক্টরের বেশি জমিতে পান উৎপন্ন হয়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রইচ উদ্দিন বলেন, পান একটি লাভজনক অর্থকরী ফসল। তাই দিন দিন পান চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে। পানচাষিরা যাতে কোনো সমস্যার সম্মুখীন না হন, সে লক্ষ্যে কৃষি অফিস তাদের সহযোগিতা করছে।

  মীর কামরুজ্জামান মনি

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..