দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

ছয়গুণ ব্যয়ে আখাউড়া-সিলেট রেলপথ ডুয়েলগেজে রূপান্তর

ইসমাইল আলী: আখাউড়া-সিলেট মিটারগেজ রেলপথটি ডুয়েলগেজে রূপান্তর করা হবে। তবে সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ হওয়ায় বিদ্যমান রেলপথের পাশে অস্থায়ী আরেকটি লাইন স্থাপন করতে হবে। আর বিদ্যমান রেলপথ ডুয়েলগেজে রূপান্তরের পর অস্থায়ী লাইনটি তুলে ফেলা হবে। এভাবেই অর্থের অপচয় করা হবে প্রকল্পটিতে। এতে আখাউড়া-সিলেট রেলপথ ডুয়েলগেজে রূপান্তরে ব্যয় পড়ছে একই ধরনের আরেকটি প্রকল্পের প্রায় ছয়গুণ।

বাংলাদেশ রেলওয়ের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, আখাউড়া থেকে সিলেট পর্যন্ত ২৩৯ দশমিক ১৪ কিলোমিটার মিটারগেজ রেলপথ ডুয়েলগেজে রূপান্তরে ব্যয় হবে ১৬ হাজার ১০৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। গত বছর এপ্রিলে প্রকল্পটি অনুমোদন করা হয়। জিটুজি ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন কোম্পানি। দরপত্র ছাড়াই দরকষাকষির মাধ্যমে এ ঠিকাদার চূড়ান্ত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিমূল্য ধরা হয়েছে ১৪ হাজার ৪৯০ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় পড়ছে ৬০ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।

এদিকে কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেলপথ ডুয়েলগেজে রূপান্তরে ২০১৭ সালের ১৫ নভেম্বরে চুক্তি করে রেলওয়ে। ভারতের ঋণে (এলওসি) এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে দেশটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কালিন্দী রেল। ৫২ দশমিক ৫৪ কিলোমিটার এ রেলপথ ডুয়েলগেজে রূপান্তরের চুক্তিমূল্য ৫৪৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। এতে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় পড়ছে ১০ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ এ প্রকল্পের তুলনায় পাঁচ দশমিক ৮৪ গুণ ব্যয়ে ডুয়েলগেজ করা হবে আখাউড়া-সিলেট রেলপথ।

এ বিষয়ে রেলওয়ের তৎকালীন মহাপরিচালক আমজাদ হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, আখাউড়া-সিলেট রেলপথটি পাহাড়ি ও ঢালু। এতে মাটির কাজও বেশ জটিল। আবার বিদ্যমান রেলপথের পাশে অস্থায়ী লাইন (বাইপাস) করে ট্রেন চলাচল চালু রাখতে হবে। এজন্য নতুন করে সব সেতু-কালভার্ট নির্মাণ করতে হবে। পরে ডুয়েলগেজ নতুন রেলপথ নির্মাণ করতে হবে। এরপর অস্থায়ী অংশ তুলে ফেলতে হবে। এসব কারণে ব্যয় অনেক বেশি হবে।

যদিও এ বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করেন রেলওয়ের একাধিক সাবেক মহাপরিচালক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলছেন, আখাউড়া-সিলেট রেলপথ সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ হওয়ায় অর্থের অপচয় করা হবে। কারণ অস্থায়ী রেলপথ নির্মাণ করে পরে তুলে ফেলা কখনও যৌক্তিক নয়। বরং আখাউড়া-লাকসাম প্রকল্পের মতো আখাউড়া-সিলেট রুটেও প্রথমে নতুন ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ করে পরে বিদ্যমান মিটারগেজ রেলপথটি ডুয়েলগেজে রূপান্তর করা যেত। এতে ডাবল লাইন নির্মাণে পরবর্তীকালে পৃথক প্রকল্প দরকার হতো না। আবার ব্যয়ও সাশ্রয় হতো।

রেলের তথ্যমতে, আখাউড়া থেকে লাকসাম পর্যন্ত বিদ্যমান মিটারগেজ রেলপথটি ডুয়েলগেজ নির্মাণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ডাবল লাইনও করা হচ্ছে রেলপথটি। এতে সব মিলিয়ে ১৮৪ দশমিক ৬০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এ প্রকল্পের চুক্তিমূল্য তিন হাজার ৪৯৭ কোটি ৩২ লাখ টাকা। অর্থাৎ ডাবল লাইন নির্মাণ ও ডুয়েলগেজে রূপান্তর মিলিয়ে এ প্রকল্পে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় পড়ছে ১৮ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।

এর বাইরে জয়দেবপুর থেকে ময়মনসিংহ হয়ে জামালপুর পর্যন্ত রেলপথেও ডুয়েলগেজ ও ডাবল লাইন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চীনের ঋণে জিটুজি ভিত্তিতে ১৬৬ কিলোমিটার এ প্রকল্পের চুক্তিমূল্য ধরা হয়েছে চার হাজার ৫৮৩ কোটি ২২ লাখ টাকা। অর্থাৎ কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় পড়বে ২৭ কোটি ৬১ লাখ টাকা। ঠিকাদারের সঙ্গে দরকষাকষি চূড়ান্ত হলেও এখনও প্রকল্পটি অনুমোদন হয়নি। এ প্রকল্পেও আখাউড়া-সিলেট ডুয়েলগেজের অর্ধেকের কম ব্যয় পড়বে।

এদিকে আখাউড়া-সিলেট রেলপথটি ডুয়েলগেজের পাশাপাশি ডাবল লাইনে উন্নীত করার দাবিতে আধাসরকারি পত্র (ডিও লেটার) দিয়েছেন চার মন্ত্রী। গত বছর রেলপথমন্ত্রী বরাবর সিলেট বিভাগের চারমন্ত্রী এসব ডিও লেটার দেন। এর মধ্যে সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন ২৫ আগস্ট; মৌলভীবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য ও পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন-বিষয়ক মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন ২৬ আগস্ট; সিলেট-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান-বিষয়ক মন্ত্রী ইমরান আহমদ ২৭ আগস্ট এবং সুনামগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান ২৪ অক্টোবর ডিও দেন, যদিও তাদের প্রস্তাব উপেক্ষিতই থেকে যায়। এক্ষেত্রে আপাতত ডাবল লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা নেই বলে জানায় রেলওয়ে। এজন্য পরবর্তীকালে ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে আরেকটি প্রকল্প গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের।

সর্বশেষ আখাউড়া-সিলেট সিঙ্গেল লাইনে ডুয়েলগেজ প্রকল্পের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। সম্প্রতি রেলপথ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে প্রকল্পটি প্রসঙ্গে ১১টি প্রশ্নের জবাব চাওয়া হয়েছে। এগুলো হলো বাইপাস (অস্থায়ী) লাইন স্থাপন করে লাইন মেরামত কতটা যৌক্তিক, বাইপাস স্থাপন করতে কত অর্থের প্রয়োজন হবে, বাইপাসে রেল চলাচল করলে যাত্রীসেবায় সমস্যা সৃষ্টি হবে কি না, বর্তমান মিটারগেজের পাশাপাশি আরেকটি ডুয়েলগেজ লাইন স্থাপনে সমস্যা কোথায়, জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ-জামালপুর ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন প্রকল্পের চেয়ে এই প্রকল্পের খরচ দ্বিগুণ হওয়ার কারণ কী, বিদ্যমান মিটারগেজ লাইনটি কবে স্থাপন হয়েছে এবং লাইফটাইম কত, ডুয়েলগেজ করতে কত সময় লাগবে এবং ডাবল লাইন করতে কত সময়ের প্রয়োজন, চীন, ভারত ও বাংলাদেশে প্রতি কিলোমিটার রেললাইন স্থাপনে গড় খরচ কত প্রভৃতি।

উল্লেখ্য, আখাউড়া-সিলেট সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ প্রকল্পটির জন্য চীনের ১০ হাজার ৬৫৪ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ঋণ দেওয়ার কথা রয়েছে। যদিও এখনও প্রকল্পটির ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন করেনি চীন। এজন্য গত মে মাসে চীন সরকারকে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..