দিনের খবর প্রচ্ছদ শেষ পাতা

ছাঁটাই আতঙ্কে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের কর্মকর্তারা

শেখ আবু তালেব: বেসরকারি খাতের ভালো অবস্থানে থাকা ব্যাংকগুলোর একটি হচ্ছে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেড (এমটিবি)। ব্যাংকটির এ অবস্থানে পৌঁছাতে যারা সহযাত্রী ছিলেন, এখন তারাই অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছেন। জ্যেষ্ঠ পর্যায়ের ৩০-এর অধিক কর্মকর্তাকে হঠাৎ করেই চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছেন ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ দুটি ছাড়া বাকি বিভাগীয় প্রধানরা। শীর্ষ পর্যায়ের পদে এমন ছাঁটাই হওয়ায় অধস্তন কর্মকর্তাদের মধ্যে ছাঁটাই আতঙ্ক বিরাজ করছে।

সম্প্রতি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পরিবর্তন হয়েছে। নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক পুরোনো কর্মীদের বাদ দিয়ে নতুনদের আনছেন। ফলে চাকরি হারানোর অস্থিরতা নিয়ে অফিসে যাতায়াত করছেন ব্যাংকাররা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও এমটিবির একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে এমন তথ্য।

চাকরি হারানোদের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, ‘আমাদের হাত ধরে ব্যাংকটির এই অবস্থানে এসেছে। এখন আমরাই ব্যাংকে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়লাম।’ অপরদিকে ব্যবস্থাপনার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, যোগ্যদের বাদ দেওয়া হয়নি।

জানা গেছে, এমটিবিতে সম্প্রতি চাকরি হারিয়েছেন ৩০-এর অধিক কর্মকর্তা। যার মধ্যে রয়েছেন কয়েকজন বিভাগীয় প্রধান। বাকিরা সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস-প্রেসিডেন্ট মর্যাদার ব্যক্তিরা। এ পদ থেকেই ব্যাংকটির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এক্সিকিউটিভ পদ উপব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে পদোন্নতি পেয়ে থাকেন।

এমটিবির কয়েকটি বিভাগের মধ্যে ক্রেডিট অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট (সিআরএম) প্রধান পদে নতুন ব্যক্তিকে আনা হয়েছে। এছাড়া আইটি, এসএমই ও কার্ড ডিভিশনের প্রধান পদেও নতুন ব্যক্তিকে আনা হয়েছে। এসব পদের দায়িত্বে থাকা পুরোনোদের বাদ দেওয়া হয়েছে হঠাৎ করেই।

এর মধ্যে শুধু সিআরএম পদে থাকা কর্মকর্তা অবসরে যাওয়ায় তার পরিবর্তে নতুন ব্যক্তিকে আনা হয়েছে। বাকিগুলোতে নতুন কর্মকর্তা আনা হয়েছে বেসরকারি ব্র্যাক, ঢাকা, ইবিএল ও সিটি ব্যাংক থেকে। সর্বোচ্চ সংখ্যক আনা হয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক থেকে। এরপরই রয়েছে ঢাকা ব্যাংক।

চাকরি হারানোর আগের দিনও এক বিভাগের প্রধান নিয়মমাফিক অফিস ও গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন অধীনস্ত কর্মকর্তাদের নিয়ে। পরের দিন সকালে ব্যাংকে গিয়ে জানতে পারেন তার চাকরি নেই। এভাবেই হঠাৎ করেই চাকরি নেই ৩০-এর অধিক কর্মকর্তার। তারা দাবি করেছেন, এমটিবি আজকের অবস্থানে আসার পেছনে তাদেরও অবদান রয়েছে। পূর্ববর্তী ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অধীনে টিম মেম্বার হিসেবে নিজেদের কর্মদক্ষতার প্রমাণ রেখেছেন তারা।

নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্যাংকে যোগদান করার পর শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে নিজের পছন্দের ব্যক্তিকে আনছেন তিনি। করোনা মহামারির সময়ে হঠাৎ করে চাকরি হারিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন তারা। এই সময়ে নতুন করে কোনো ব্যাংকেই চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন তারা। আবার অনেকেরই কর্মজীবনের শেষ পর্যায়ে চলে এসেছেন। এমন অভিজ্ঞতা ও পদ নিয়ে চাকরি পাওয়াও দুষ্কর। কারণ ব্যাংকের নিচের দিকে চাকরিতে সংখ্যা বেশি, যত পদোন্নতি পেয়ে ওপরের ধাপে ওঠা যায় ততই পদ সংখ্যা কমতে থাকে।

অপরদিকে বিভাগীয় শীর্ষ পদে এমন পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে অধস্তনের মধ্যে। তারা আশঙ্কা করছেন, নতুন আসা ব্যক্তিরা তাদের পছন্দের ব্যক্তিকে নিয়ে আসার চেষ্টা করবেন এমটিবিতে। তখন সব পর্যায়েই ছাঁটাই শুরু হতে পারে। এ নিয়ে অজানা শঙ্কা বিরাজ করছে ব্যাংকটির কর্মকর্তাদের মধ্যে।

জানা গেছে, অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, কোনো তদবির ছাড়াই মেধাবী তরুণদের নিয়োগ, কর্মকর্তাদের বেতন কাঠামো, কর্মপরিবেশ ও চাকরি স্থায়িত্ব বিবেচনায় ব্যাংকপাড়ায় সুনাম রয়েছে এমটিরি। তরুণদের অনেকেরই পছন্দের চাকরি স্থলে পরিণত হয়েছে ব্যাংকটি। বর্তমানে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মধ্যে অন্যতম শক্ত অবস্থানে উঠে এসেছে এমটিবি। এজন্য বিদেশি বিনিয়োগও পেয়েছে ব্যাংকটি। বর্তমানে পরিচালনা পর্ষদে একজন বিদেশি সদস্যও রয়েছেন। সেই ব্যাংকেই করোনাকালে চলছে চাকরি হারানোর আতঙ্ক।

এ বিষয়ে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান শেয়ার বিজকে বলে, ‘কর্মকর্তা বাদ দেওয়া ব্যাংকের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ। কর্মদক্ষতা যাচাই করেই কিছু কর্মকর্তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এসব পদে যোগ্য ও অধিকতর দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের আনা হয়েছে। কোনো যোগ্য ব্যক্তিকে বাদ দেওয়া হয়নি। ব্যাংকে যারা পারফরম্যান্স দেখাতে পারছেন, তাদের চাকরি হারানোর কোনো ভয় নেই। আগামী বছর থেকে আমরা ভালো কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ কর্মকর্তাদের উৎসাহ দিতে প্রণোদনা হিসেবে পুরস্কার দিতে যাচ্ছি।’

ব্যাংকটির সাবেক একাধিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করলেও এ বিষয়ে নাম প্রকাশ করতে চাননি। তারা জানিয়েছেন, ব্যাংকটির ভালো অবস্থানে আসতে একটি টিম কাজ করেছে। এ কৃতিত্ব কারও একার নয়। পরিচালনা পর্ষদও কাজের সুযোগ দিয়েছেন। অযথা হস্তক্ষেপ করেননি। সবাইকে নিয়েই কাজ করা সম্ভব।

জানা গেছে, ব্যাংকটি গত কয়েক বছর ধরেই এমটিবির নিট মুনাফা দেড়শ’ কোটি টাকার ওপরে। সর্বশেষ ২০১৯ সালে ব্যাংকটি ১৩৩ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে। এর পূর্ববর্তী ২০১৮ সালে ১৭৩ কোটি ৪৫ লাখ, ২০১৭ সালে ১৯৮ কোটি ও ২০১৬ সালে ১৪৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকার মুনাফা করে ব্যাংকটি।

তথ্য অনুযায়ী, গত জুন শেষে ব্যাংকটির আমানতের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। আর ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার কোটি টাকা।

ব্যাংকটি দেশের পুঁজিবাজারেও তালিকাভুক্ত। গত জুলাই শেষে ব্যাংকটির মোট শেয়ারের মধ্যে উদ্যোক্তা পরিচালকদের কাছে ৪৩ দশমিক ৯০ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে ২১ দশমিক ১৫ শতাংশ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ৩৪ দশমিক ৯৫ শতাংশ রয়েছে।

২০১৯ সালে শেয়ারহোল্ডারদের পাঁচ শতাংশ নগদ ও পাঁচ শতাংশ বোনাস ডিভিডেন্ড দিয়েছে। সর্বশেষ ব্যাংকটির শেয়ার ২৪ টাকা ১০ পয়সায় হাত বদল হয় পুঁজিবাজারে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..