হাসান শিরাজি : গবেষণা আর উদ্ভাবনের ডেস্কে বসে যখন দিনভর দেশ-বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নানা উপাত্ত, জার্নাল আর নতুন আবিষ্কারের খবর ঘাঁটাঘাঁটি করি, তখন মনের অজান্তেই ফিরে যাই ফেলে আসা দিনগুলোয়। তথ্যপ্রযুক্তি খাতের টানা ছয় বছরের করপোরেট জীবন ছেড়ে যেদিন প্রথম চক-ডাস্টার হাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে পা রেখেছিলাম, আমার চোখের সামনে ছিল একদল স্বপ্নবাজ তরুণ। দীর্ঘ চব্বিশটা বছর আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি এই তরুণদের। দেখেছি কীভাবে তাদের চোখে নতুন কিছু করার তৃষ্ণা চিকচিক করে। কিন্তু সেই একই চোখে আমি ভয়ও জমতে দেখেছি। দেখেছি কীভাবে মেধার তীর্থস্থানগুলো ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে ক্ষমতার আখড়ায়, আর সেই আখড়ার বলি হয়েছে আমারই মতো কোনো না কোনো সাধারণ বাবার বুকভরা স্বপ্ন।
আজ যখন আমাদের উচ্চশিক্ষার মান, কারিকুলাম উন্নয়ন আর গবেষণার বাজেট নিয়ে কথা হয়, তখন একটা বিষয় সযত্নে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেইÑআমাদের লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি। এই রাজনীতি কি আমাদের আদৌ কিছু দিচ্ছে, নাকি কেড়ে নিচ্ছে সব? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে গত দুই দশকের ভয়াল পরিসংখান আর আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিজ্ঞতার দিকে।
আবরার ফাহাদের ঘটনা : গল্পটা শুরু করা যাক ২০১৯ সালের ৭ অক্টোবর রাতের ঘটনা দিয়ে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-যেখানে পড়ার সুযোগ পাওয়াটা এদেশের লাখো শিক্ষার্থীর কাছে রীতিমতো তপস্যার মতো। সেই ক্যাম্পাসের শেরেবাংলা হলের একটি রুমে ঘটে গেল এমন এক ঘটনা, যা পুরো বাংলাদেশের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
আবরার ফাহাদ। অত্যন্ত মেধাবী, চুপচাপ আর বিনয়ী একটি ছেলে। তার অপরাধ কী ছিল? সে কোনো অস্ত্র হাতে তুলে নেয়নি, কারও মিছিলে বাধা দেয়নি, কোনো টেন্ডারের ভাগ বসায়নি। সে কেবল তার নিজের মনে হওয়া কিছু কথা, কিছু বিশ্লেষণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছিল। একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে, একজন সচেতন ছাত্র হিসেবে তার সেই অধিকার ছিল। কিন্তু আমাদের ক্যাম্পাসের তথাকথিত ‘বড় ভাইদের’ তা সহ্য হলো না। রাতভর ক্রিকেট স্টাম্প আর লাঠি দিয়ে পিটিয়ে একটি তরতাজা প্রাণকে নিভিয়ে দেওয়া হলো।
আবরারের সেই নিষ্প্রাণ দেহ যখন সিঁড়িতে পড়ে ছিল, তখন আসলে সেখানে শুধু একটি ছেলের লাশ পড়ে ছিল না, পড়ে ছিল আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থার কঙ্কালটা।
আবরার কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। একটু পেছনের দিকে তাকালে আপনি শিউরে উঠবেন। গত দুই দশকে আমাদের দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতির নামে, আধিপত্য বিস্তার আর অন্তর্কোন্দলের জেরে খুন হয়েছেন প্রায় দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী। ভাবুন তো একবার, দেড় শতাধিক তরতাজা প্রাণ! এই সংখ্যাগুলো শুধু কাগজের এক-একটি পরিসংখ্যান নয়। এর পেছনে জড়িয়ে আছে দেড় শতাধিক মায়ের আজীবন কান্নার গল্প। একজন বাবা যখন তার সন্তানকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠান, তিনি স্বপ্ন দেখেন ছেলে একদিন বড় ইঞ্জিনিয়ার হবে, বড় গবেষক হবে, দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে। সেই সন্তান যখন কফিনে মোড়ানো লাশ হয়ে ফেরে, তখন সেই পরিবারের কাছে ‘উন্নয়ন’ বা ‘গবেষণা’ শব্দগুলো কতটা অর্থহীন মনে হয়!
ফয়সালের গল্প : ধরুন, ফয়সালের কথা। মফস্বল থেকে অনেক কষ্ট করে চান্স পেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলে উঠেছে। তার বাবা একজন স্কুলশিক্ষক। ফয়সালের স্বপ্ন সে পড়াশোনা শেষ করে ভালো একটা চাকরি করবে, পরিবারের হাল ধরবে। কিন্তু হলে ওঠার প্রথম সপ্তাহেই তার পরিচয় হলো ‘গেস্টরুম’ নামের এক ভয়ংকর সংস্কৃতির সঙ্গে।
সারাদিন ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট আর ল্যাবের কাজ শেষ করে রাতে যখন সে একটু ঘুমাতে চায়, তখনই ডাক পড়ে পলিটিক্যাল ব্লকের বড় ভাইদের। রাত এগারোটা থেকে শুরু হয়ে সেই ‘আদালত’ চলে রাত দুটোর পর পর্যন্ত। কখনও সেøাগান মুখস্থ করানো, কখনও বিরোধী মতের কাউকে গালাগাল করা, আবার কখনও শুধু শুধু জুনিয়রদের ওপর ক্ষমতার দাপট দেখানো। ফয়সালের মতো শত শত ছেলে বাধ্য হয়ে মিছিলে যায়। তাদের ক্লাস মিস হয়, পরীক্ষার আগের রাতেও তারা পড়ার টেবিলে বসতে পারে না। কেউ যদি একটু প্রতিবাদ করার সাহস দেখায়, তবে পরদিন তার বিছানাপত্র হলের বাইরে ছুড়ে ফেলা হয়, অথবা জুটতে পারে আবরারের মতো পরিণতি।
যে বয়সে একজন শিক্ষার্থীর লাইব্রেরিতে বসে নতুন কোনো অ্যালগরিদম নিয়ে ভাবার কথা, যে বয়সে তার রোবোটিক্স ল্যাবে রাত জাগার কথা, সেই বয়সে সে রাত জাগছে ভয় আর আতঙ্কে। এই ভীতিকর পরিবেশে আর যাই হোক, বিশ্বমানের গবেষণা সম্ভব নয়। এ কারণেই হয়তো আমাদের অনেক মেধাবী মুখ স্নাতক শেষ করেই পাড়ি জমাচ্ছে ইউরোপ বা আমেরিকায়। তারা শুধু উন্নত জীবনের খোঁজেই যাচ্ছে না, তারা পালাচ্ছে এই দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে।
এই যখন আমাদের ক্যাম্পাসের চিত্র, তখন স্বভাবতই মনে প্রশ্ন জাগেÑতবে কি শিক্ষাঙ্গনে ছাত্ররাজনীতি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে দেওয়াই একমাত্র পথ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের একটু প্রতিবেশী দেশ নেপালের দিকে তাকাতে হবে।
নেপালেও একসময় ছাত্ররাজনীতির কারণে শিক্ষাঙ্গনে চরম অস্থিরতা ছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গসংগঠনগুলো ক্যাম্পাসে মারামারি, ধর্মঘট আর সহিংসতা চালিয়ে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করছিল। এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে নেপালের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং জাতীয় পর্যায়ে ছাত্ররাজনীতিকে নিষিদ্ধ বা চরমভাবে সংকুচিত করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছিল, এবার হয়তো ক্যাম্পাসে শান্তি ফিরে আসবে। কিন্তু মুদ্রার উল্টোপিঠটা ছিল আরও ভয়াবহ।
রাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়ার পর নেপালের শিক্ষাঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি হলো, তার ফল ভোগ করতে শুরু করল সাধারণ শিক্ষার্থীরাই। ছাত্ররাজনীতির একটি বড় গুণ হলো, এটি সাধারণ শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করতে শেখায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে শেখায়। যখন এই প্ল্যাটফর্মটি ভেঙে দেওয়া হলো, তখন নেপালের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনগুলো অনেক ক্ষেত্রেই চরম স্বৈরাচারী রূপ ধারণ করল।
কাঠমান্ডুর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদাহরণ টানা যেতে পারে। সেখানে প্রশাসন হঠাৎ করেই শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি প্রায় ত্রিশ শতাংশ বাড়িয়ে দিল। সাধারণ শিক্ষার্থীরা এই সিদ্ধান্তের কারণে দিশেহারা হয়ে পড়ল। কিন্তু তাদের পক্ষে কথা বলার মতো, প্রশাসনকে চাপ দেওয়ার মতো কোনো সংগঠিত ছাত্রনেতৃত্ব ছিল না। বিক্ষিপ্ত কিছু প্রতিবাদ হলেও তা সহজেই দমিয়ে দিল প্রশাসন। হলের খাবারের মান কমে গেল, লাইব্রেরিতে নতুন বই আসা বন্ধ হয়ে গেল, এমনকি শিক্ষকদের জবাবদিহিতার জায়গাও দুর্বল হয়ে পড়ল। কারণ প্রশাসন জানত, তাদের চ্যালেঞ্জ করার মতো কেউ আর ক্যাম্পাসে নেই।
নেপালের এই অভিজ্ঞতা আমাদের একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। রাজনীতি নিষিদ্ধ করার মানে হলো শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের একমাত্র ঢালটি কেড়ে নেওয়া। দলীয় রাজনীতি বা পেশিশক্তির রাজনীতি ক্ষতিকর ঠিকই, কিন্তু একদম নেতৃত্বশূন্য একটি ক্যাম্পাস আরও বেশি বিপজ্জনক হতে পারে। সেখানে প্রশাসন স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা আরও বেশি অসহায় হয়ে পড়ে।
নেতৃত্ব বনাম লেজুড়বৃত্তি : সমস্যাটা আসলে ‘রাজনীতি’ শব্দটায় নয়, সমস্যা হলো ‘লেজুড়বৃত্তি’ এবং ‘পেশিশক্তি’ নির্ভরতায়। আমাদের বুঝতে হবে, একজন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছাত্র বা ছাত্রী দেশের সচেতন নাগরিক। দেশের অর্থনীতি কীভাবে চলছে, রাষ্ট্রের পলিসি কী, শিক্ষার বাজেট কেন কমছে, এসব নিয়ে তাদের নিজস্ব মতামত থাকবে, এটাই তো স্বাভাবিক। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর (যেমন অক্সফোর্ড বা হার্ভার্ড) দিকে তাকালে দেখবেন, সেখানেও ছাত্র সংসদ আছে। তারা ডিবেট করে, পলিসি নিয়ে তর্ক করে, এমনকি জাতীয় ইস্যুতেও সোচ্চার হয়। কিন্তু তারা কারও মাথা ফাটায় না, কিংবা বিরোধী মতের কাউকে স্টাম্প দিয়ে পিটিয়ে মারে না।
আমাদের দেশে যেটা হয়, সেটা হলো রাজনৈতিক দলগুলো ছাত্রদের ব্যবহার করে তাদের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে। যখন একটি রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠন ক্যাম্পাসে রাজত্ব করে, তখন তাদের মূল লক্ষ্য ছাত্রদের কল্যাণ থাকে না, তাদের লক্ষ্য থাকে মাতৃ-দলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা আর টেন্ডারবাজির ভাগ বাটোয়ারা করা।
আমাদের প্রয়োজন একটি সুস্থ ধারার ‘ছাত্র সংসদ’ বা স্টুডেন্ট ইউনিয়ন। যেখানে কোনো জাতীয় রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি থাকবে না। শিক্ষার্থীরা তাদের নিজেদের মধ্য থেকে প্রতিনিধি নির্বাচন করবে। সেই প্রতিনিধিদের কাজ হবে। হলের ডাইনিংয়ে কেন পচা মাছ দেওয়া হচ্ছে তা নিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহি চাওয়া, লাইব্রেরিতে কেন নতুন জার্নালের সাবস্ক্রিপশন নেইÑতা নিয়ে আন্দোলন করা, আর গবেষণায় কেন বরাদ্দ বাড়ছে নাÑতা নিয়ে সোচ্চার হওয়া।
যদি কোনো ছাত্রনেতাকে সাধারণ ছাত্রদের ভোটে নির্বাচিত হতে হয়, তবে তাকে অবশ্যই সাধারণ ছাত্রদের সুখ-দুঃখের কথা ভাবতে হবে। তাকে গেস্টরুমে অত্যাচার করে নয়, বরং শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা দিয়ে নেতা হতে হবে। এই ধরনের সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চা একজন শিক্ষার্থীকে ভবিষ্যতে জাতীয় পর্যায়ের সৎ ও যোগ্য নেতা হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করবে।
চব্বিশ বছরের শিক্ষকতা আর বর্তমানের গবেষণাধর্মী কাজের অভিজ্ঞতা থেকে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের তরুণদের মেধা বিশ্বের যেকোনো দেশের তরুণদের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো। আমাদের শুধু দরকার একটা সঠিক পরিবেশ।
আমরা চাই না আমাদের ক্যাম্পাসে আর কোনো আবরার ফাহাদের রক্ত ঝরুক। আমরা চাই না গত দুই দশকের সেই দেড়শো লাশের মিছিলে আর একটি নামও যুক্ত হোক। একই সঙ্গে নেপালের মতো আমরা আমাদের ছাত্রদের বোবা আর অধিকারহীনও করে দিতে চাই না।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে হতে হবে মুক্তচিন্তার এক অভয়ারণ্য। সেখানে রাত তিনটার সময় যদি হলের করিডোরে কোনো জটলা থাকে, তবে সেটা যেন কোনো পলিটিক্যাল ভাইয়ের ডাকা ‘গেস্টরুম’ না হয়। সেটা যেন হয় আগামী দিনের কোনো নতুন প্রজেক্ট, নতুন কোনো উদ্ভাবন বা দর্শনের কোনো জটিল তত্ত্ব নিয়ে একদল তরুণের প্রাণবন্ত আড্ডা। যে ছেলেটি গ্রামে বসে স্বপ্ন দেখছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে পা রাখার, তার সেই স্বপ্ন যেন কোনোভাবেই লাশের কফিনে পরিণত না হয়।
ছাত্ররাজনীতির নামে চলা এই গুণ্ডামি বন্ধ হোক, কিন্তু বেঁচে থাকুক ছাত্রদের অধিকার আদায়ের সুস্থ নেতৃত্ব। কারণ আজ যারা ক্যাম্পাসে নিজেদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে শিখবে, কাল তারাই তো এই দেশের হাল ধরবে। এই তরুণদের কাঁধেই তো আমাদের আগামীর বাংলাদেশ।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post