ইমতিয়াজ আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ: পূর্বাচলের বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টারে (বিসিএফসি) চলছে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার ৩০তম আসর। মাসব্যাপী এ বাণিজ্য মেলা আয়োজনের দ্বিতীয় শুক্রবার ছিল গতকাল। ছুটির দিন হওয়ায় বেশ জমজমাট ছিল মেলা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেলা জমে ওঠে। মেলায় বৈদ্যুতিক চুলা ও রাইস কুকার বিক্রেতাদের দোকানে ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো।
তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সরবরাহ সংকটের কারণে মানুষ ঝুঁকছে বৈদ্যুতিক চুলা ও রাইস কুকারের দিকে। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বৈদ্যুতিক চুলা খুটিয়ে খুটিয়ে দেখেন ক্রেতারা। মেলায় একদিকে রয়েছে মূল্যছাড়ের সুযোগ, অন্যদিকে রয়েছে এলপিজি সংকটে গ্যাসের চুলা বন্ধ থাকায় তা থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায়।
রাজধানীর যানজট এড়াতে অনেকেই অনেকের নজর ছিল ইলেকট্রিক বাইকের দিকে। জ্বালানির বিকল্প হিসেবেও এই বাইকগুলোকে বেশি সহজলভ্য। তাই ইলেকট্রিক বাইকের দোকানগুলোয়ও লক্ষণীয় ভিড় দেখা গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, গতকাল সকাল থেকেই মেলায় দর্শনার্থীর ভিড় ছিল। পরিবার-পরিজন ও বন্ধুবান্ধব নিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে আসেন অনেকে। সঙ্গে ছিল পরিবারের ছোট সদস্যরাও।
এবারের বাণিজ্য মেলায় দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে কাশ্মীরি শাল, জামা, কার্পেট, তুর্কি মোজাইক, ল্যাম্প আর রঙিন ঘর সাজানোর জিনিস। ঘুরতে আসা নারীদের বেশি টানে অ্যালুমিনিয়ামের দোকানগুলো। আয়োজকরা জানান, মেলায় প্রতিদিন ক্রেতা ও দর্শনার্থীর সংখ্যা থাকে ৪০ থেকে ৫০ হাজার মতো। তবে গতকাল শুক্রবার রেকর্ডসংখ্যক দর্শনার্থী ছিল। ক্রেতা-দর্শনার্থীর উপস্থিতি দুই লাখের বেশি ছিল বলে অনেকের মত।
অন্যবারের মতো এবারও মেলায় বিভিন্ন মানের ও দামের পণ্য নিয়ে হাজির হয়েছে নানা প্রতিষ্ঠান। দেশি-বিদেশি ক্রেতারা মেলা প্রাঙ্গণ থেকে যেমন পছন্দের পণ্য কিনছেন, তেমনে বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে আসছে ক্রয়াদেশও। দেশি ব্র্যান্ডের পণ্য এবং ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা। রয়েছে কোটি টাকার পালঙ্কও। এসব পণ্য বিক্রিতে বিক্রেতারা দিচ্ছেন নানারকম ছাড় ও উপহার।
কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কয়েদিদের তৈরি হস্তশিল্প ও ঘর সাজানোর সরঞ্জাম ক্রেতাদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। গুণগত মান ও সাশ্রয়ী মূল্যের কারণে অন্য সব স্টলের ভিড় ছাড়িয়ে যায় কারা স্টল।
২০১৮ সাল থেকে মেলায় অংশ নিচ্ছে কারাপণ্যের একটি স্টল। জেলখানার কয়েদিরা দীর্ঘদিন ধরে পণ্য তৈরি করেন। এসব পণ্য কয়েকটি কারাগারের বিক্রয়কেন্দ্রে বছরজুড়েই পাওয়া যায়। কারা কর্তৃপক্ষ এবারই প্রথমবারের মতো কয়েদিদের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে এসেছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায়। আলাদা একটি প্যাভিলিয়নে জেলখানার পণ্য বিক্রি হচ্ছে। সেখানে পুঁতি, তাঁত, পাট, বাঁশ ও কাঠের তৈরি পণ্যের পাশাপাশি রয়েছে সচিত্র খাদ্যসামগ্রী।
কারাগারের কয়েদিদের প্রশিক্ষণ দিয়ে পণ্য উৎপাদনে যুক্ত করা হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য, কয়েদিরা কারাগার থেকে মুক্ত হলেও যেন কাজের মধ্যে যুক্ত থাকতে পারে। এর ফলে তাদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা কমে আসবে। কারাগারে তৈরি পণ্যের প্রচার ও প্রসারের জন্য বাণিজ্য মেলায় প্রদর্শন করা হয়েছে। এক দরে মানসম্মত পণ্য পেয়ে মেলায় আসা ক্রেতারাও আগ্রহের সঙ্গে কিনছেন।
মেলায় ভিড় বেশি হওয়ায় ব্যবসা ভালো হবে বলে আশা করছেন স্টল প্রতিনিধিরা। নানা রকমের অফার দিয়ে ক্রেতাদের আকর্ষণের জন্য চেষ্টা করছেন তারা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, মাসব্যাপী এ আয়োজনে ছুটির দিনে মেলা জমে উঠেছে। দিন ও সময় যত যাবে বিক্রিও ততই বাড়বে।
সাইনবোর্ড থেকে মেলায় ঘুরতে যাওয়া ব্যাংকার ফখরুল হোসাইন বলেন, মেলার সরকারি ছুটির দিন থাকায় লোকজন বেশি। ভিড় ঠেলে কেনাকাটা করতে হয়েছে। তবে সবকিছু একসঙ্গে পেয়ে ভালো লাগছে। মিরপুরের ইসিবি চত্বরের বাসিন্দা জাহানারা আক্তার বলেন, যানজটের কারণে মেলায় আসতে অসুবিধা হয়েছে। তবে মেলায় আসার পর পণ্য দেখে এবং কম দামে কিনতে পেরে খুব ভালো লাগছে।
প্রতিবারের মতো এবারের মেলায় শিশুদের বিনোদনের অংশ হিসেবে রয়েছে প্যাডেল বোট, সিøপার, হেলিকপ্টার, নাগরদোলা, নৌকা, ট্রেনসহ বিভিন্ন রাইড; রয়েছে বিরিয়ানি, মিঠাই, ঝটপট, টেস্টি ট্রিট, ব্যাকেটসহ বিভিন্ন আইসক্রিমের স্টল। খাবারের মধ্যে এবারের মেলার বিশেষ আকর্ষণ তুর্কি রেস্টুরেন্ট। নতুন স্বাদ পেতে নতুন এই লেভেলে ভিড় করছেন ভোজনপ্রেমী দর্শনার্থীরা।
এছাড়া আরএফএল, দুরন্ত বাইসাইকেল, প্রাণ কোম্পানি, ডাচ-বাংলা স্যুট, সাফারি, থ্রি-পিস, ঢাকাই জামদানি, শীতের চাদর, জুতা, গৃহস্থালির নানা ধরনের পণ্যসামগ্রী, ফার্নিচার, ইলেকট্রনিক সামগ্রী, মোটরসাইকেল, স্কুটি, নিত্যপ্রয়োজনীয় অ্যালুমিনিয়াম জিনিসপত্রসহ বিভিন্ন প্যাভিলিয়ন ও স্টলে সাজানো নানা ধরনের পণ্য ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে দৈনন্দিন কাজে ব্যবহƒত তৈজসপত্র, গৃহসজ্জা, কসমেটিকস কিংবা পোশাক কিনতে বাণিজ্য মেলায় ছুটে এসেছেন অনেকে। নানা ধরনের ছাড়ের টোপে ক্রেতাদের সামলাতে দম ফেলার ফুরসত নেই বিক্রয় প্রতিনিধিদেরও।
রূপগঞ্জের সাওঘাট এলাকা থেকে আসা দর্শনার্থী বিউটি আক্তার বলেন, ‘ছুটির দিনে সময় পাওয়ায় বাণিজ্য মেলায় এসেছি। ছেলেমেয়ে ও স্বামীসহ পরিবারের জন্য টুকটাক কেনাকাটা করেছি। মাশাআল্লাহ, বাণিজ্য মেলায় অনেক রকমের পণ্য উঠেছে।’
নরসিংদী থেকে আসা দর্শনার্থী জামাল মিয়া বলেন, ‘রাস্তাঘাটে উন্নয়ন কাজ চলায় মেলায় আসতে গিয়ে ধুলাবালি ও ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে। তারপরও মেলায় আসতে পেরেছি, এটাই আনন্দের। প্রতি বছরই মেলায় এসে কেনাকাটা করি।’
প্রতিবারের মতো এবারের মেলায়ও উদ্যোক্তাদের হাতের তৈরি জামদানি শাড়ি, গামছা, কাপড়-চোপড়, নকশিকাঁথা, জুয়েলারি সামগ্রী, মধু, আচার, পাপোশ, কার্পেট, ঘর সাজসজ্জার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, বিভিন্ন ব্যাগ ও নারীদের থ্রি-পিস রয়েছে। এসব পণ্যে ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে।
পূর্বাচলের বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টারে আয়োজিত এই বাণিজ্য মেলা চলবে আগামী ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত।
প্রিন্ট করুন







Discussion about this post