প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

ছয় বছরে ক্যাপাসিটি চার্জ সাড়ে ৩৫ হাজার কোটি টাকা

বেসরকারি খাত থেকে বিদ্যুৎ কেনা

ইসমাইল আলী: কয়েক বছর ধরে বেসরকারি খাতে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদন দিয়ে যাচ্ছে সরকার। পাশাপাশি কয়েকটি মেয়াদোত্তীর্ণ রেন্টাল-কুইক রেন্টাল কেন্দ্রগুলোর চুক্তি নবায়ন করা হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে। আর এ বিদ্যুৎ কেনায় প্রতি বছর মোটা অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি)।
সংস্থাটির হিসাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ছয় বছরে পিডিবিকে ক্যাপাসিটি চার্জ গুনতে হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা। এ ব্যয় বেসরকারি খাত থেকে বিদ্যুৎ কেনার প্রায় ৩৭ দশমিক ২২ শতাংশ। যদিও সরকারি খাতে এ ধরনের কোনো ব্যয় নেই।
পিডিবির তথ্যমতে, ২০১৩-১৪ থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছর পর্যন্ত ছয় বছরে দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় ৩১ হাজার ৮১৩ কোটি কিলোওয়াট ঘণ্টা। এর মধ্যে বেসরকারি খাত থেকে কেনা হয় ১৩ হাজার ৯১৩ কোটি ৩৫ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ। এজন্য পিডিবিকে বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোকে পরিশোধ করতে হয় ৯৫ হাজার ৩৪৬ কোটি ২৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে ক্যাপাসিটি চার্জ ছিল ৩৫ হাজার ৪৮৩ কোটি ৯২ লাখ টাকা।
গত অর্থবছর জুন শেষে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়ায় ১৮ হাজার ৪৫৮ মেগাওয়াট। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে স্থাপন করা হয়েছে পাঁচ হাজার ৭৪১ মেগাওয়াট। বেসরকারি এসব কেন্দ্র থেকে কেনা হয় দুই হাজার ৭১৩ কোটি ৩০ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ। এতে ব্যয় হয় ২০ হাজার ৭৮১ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে ক্যাপাসিটি চার্জই পরিশোধ করা হয় আট হাজার ৭২২ কোটি ২৭ লাখ টাকা, যা উৎপাদন ব্যয়ের প্রায় ৪২ শতাংশ।
এর আগে ২০১৭-১৮ অর্থবছর দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ১৪ হাজার ১১৩ মেগাওয়াট। এর মধ্যে বেসরকারি খাতের সক্ষমতা ছিল পাঁচ হাজার ২১৩ মেগাওয়াট। বেসরকারি এসব কেন্দ্র থেকে কেনা হয় দুই হাজার ৫২৩ কোটি ৩৪ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ। এতে ব্যয় হয় ১৬ হাজার ৬৯২ কোটি ৩২ লাখ টাকা। এর মধ্যে ক্যাপাসিটি চার্জই পরিশোধ করা হয় ছয় হাজার ২৪১ কোটি ২৫ লাখ টাকা, যা উৎপাদন ব্যয়ের ৩৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
এদিকে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ১৪ হাজার ৯৪ মেগাওয়াট। এর মধ্যে বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ছিল পাঁচ হাজার ৪৫৯ মেগাওয়াট। এ খাত থেকে সে সময় কেনা হয়েছিল দুই হাজার ৪৪৫ কোটি ২৮ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ। এতে ব্যয় হয় ১৪ হাজার ৭৩৫ কোটি ২৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করা হয় পাঁচ হাজার ৭৬৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকা, যা উৎপাদন ব্যয়ের ৩৯ দশমিক ১২ শতাংশ।
এর আগে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে স্থাপিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ছিল পাঁচ হাজার ১৯৪ মেগাওয়াট। আর সরকারি-বেসরকারি ও আমদানি মিলিয়ে সে সময় দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ১২ হাজার ৩৩৩ মেগাওয়াট। সে অর্থবছর বেসরকারি খাত থেকে দুই হাজার ৪১৩ কোটি ৬৪ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ কেনা হয়। এতে ব্যয় হয়েছিল ১৪ হাজার ১৭ কোটি ১৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করা হয় পাঁচ হাজার ৩৭৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। মোট ব্যয়ের মধ্যে এর হার ছিল ৩৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ।
২০১৪-১৫ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে স্থাপিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ছিল চার হাজার ৪৪৮ মেগাওয়াট। আর সামগ্রিকভাবে এ সক্ষমতা ছিল ১০ হাজার ৭৬৯ মেগাওয়াট। সে অর্থবছর বেসরকারি খাত থেকে বিদ্যুৎ কেনা হয় এক হাজার ৯৫৪ কোটি ৫২ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা। এতে ব্যয় হয় ১৪ হাজার ৯০৬ কোটি ১১ লাখ টাকা। আর ক্যাপাসিটি চার্জ চার হাজার ৬৬৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের ৩১ দশমিক ২৯ শতাংশ।
আর ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে স্থাপিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ছিল চার হাজার ৯৬ মেগাওয়াট। আর সামগ্রিকভাবে এ সক্ষমতা ছিল ১০ হাজার ৫১৬ মেগাওয়াট। সে অর্থবছর বেসরকারি খাত থেকে বিদ্যুৎ কেনা হয় এক হাজার ৮৬৩ কোটি ২৫ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা। এতে ব্যয় হয় ১৪ হাজার ২১৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা। আর ক্যাপাসিটি চার্জ চার হাজার ৭১৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের ৩৩ দশমিক ১৭ শতাংশ।
জানতে চাইলে পিডিবির চেয়ারম্যান খালেদ মাহমুদ শেয়ার বিজকে বলেন, বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎ কেনা হয়। এক্ষেত্রে চুক্তির ভিত্তিতেই ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করা হয়। আর প্রতিটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের লাইসেন্স প্রদানের আগে এ নিয়ে দ্বিপক্ষীয় দরকষাকষি করা হয়। মূলত বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে মূলধন ব্যয়ের হিসাব করেই এ ক্যাপাসিটি চার্জ নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। এছাড়া কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা, অবস্থান, জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থা প্রভৃতিও বিবেচনা করা হয়।
যদিও এ বক্তব্য সঠিক নয় বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. এম শামসুল আলম। তিনি বলেন, বেশিরভাগ বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের লাইসেন্স দেওয়ার সময় ঠিকমতো দরকষাকষি করা হয়নি। এছাড়া চুক্তিতেও সমস্যা আছে। ফলে কেন্দ্র বসিয়ে রেখেও ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করা হয়। এজন্য বেসরকারি খাতের কেন্দ্রগুলোর বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় এত বেশি। এগুলো বন্ধ না হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কমানো সম্ভব নয়।

ট্যাগ »

সর্বশেষ..