প্রচ্ছদ শেষ পাতা

ছয় বছরে দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে ৮০ লাখ মানুষ

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশ দারিদ্র্য বিমোচন ও মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে, যার বেশিরভাগই সম্ভব হয়েছে শ্রম আয় বৃদ্ধির কারণে। ২০১০-১৬ সময়ে ৮০ লাখ বাংলাদেশি দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে। ২০১০ সাল থেকে পূর্ব ও পশ্চিমের বিভাগগুলোর মধ্যে দারিদ্র্য পরিস্থিতির ঐতিহাসিক পার্থক্য আবার ফিরে এসেছে। পশ্চিমে রংপুর বিভাগে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে এবং রাজশাহী ও খুলনায় একই জায়গায় রয়েছে। অন্যদিকে চট্টগ্রামে দারিদ্র্য কমেছে পরিমিতভাবে। আর বরিশাল, ঢাকা ও সিলেটে দ্রুত কমেছে।
‘বাংলাদেশ পোভার্টি অ্যাসেসমেন্ট’ নামে বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল প্রতিবেদনটি উম্মোচন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব বিকাশ কিশোর দাস এবং বিশ্বব্যাংকের দারিদ্র্য ও সমতার বৈশ্বিকচর্চা বিভাগের পরিচালক ক্যারেনিনা সানসেজ প্রমো। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেকটর মার্স মিয়াং টেম্বন। প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ মারিয়া ইউজেনিয়া জেনননি।
প্রতিবেদন উপস্থাপনের সময় জেনননি বলেন, জোরালো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশে দারিদ্র্য কমাচ্ছে। তবে দারিদ্র্য কমছে তুলনামূলক কম গতিতে। ২০১০ থেকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি বাড়লেও দারিদ্র্য বিমোচনের গতি কমেছে। এছাড়া দারিদ্র্য কমেছে অসমভাবে। ২০১০ থেকে পূর্ব ও পশ্চিমের বিভাগগুলোর মধ্যে দারিদ্র্য পরিস্থিতির ঐতিহাসিক পার্থক্য আবার ফিরে এসেছে। পশ্চিমে রংপুর বিভাগে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে এবং রাজশাহী ও খুলনায় একই জায়গায় রয়েছে। অন্যদিকে চট্টগ্রামে কমেছে পরিমিতভাবে এবং বরিশাল, ঢাকা ও সিলেটে দ্রুত কমেছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। আমরা সেভাবেই কাজ করে যাচ্ছি। দারিদ্র্য নিরসনের এ তথ্য তিন বছর আগের। তবে বর্তমান তথ্য আরও অনেক বেশি উৎসাহমূলক। প্রবৃদ্ধি হচ্ছে এদেশের দারিদ্র্য নিরসনের মূল চাবিকাঠি। দেশে টেকসই ও মানসম্পন্ন প্রবৃদ্ধি অর্জিত হচ্ছে। প্রবৃদ্ধির এ অর্জন প্রত্যেক মানুষকে স্পর্শ করছে। প্রত্যেক মানুষ অর্থনীতির মূল স্রোতের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি দারিদ্র্য কমাচ্ছে। আশা করছি ২০৩০ সালের মধ্যে এদেশে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য থাকবে না। দারিদ্র্য নিরসনে আমরা সঠিক পথেই আছি। গত ১০ বছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় ভালো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা আগে উন্নত ছিল না। এখন প্রয়োজন ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে নানা কর্মসূচি বাস্তবায়ন হচ্ছে। দক্ষতা বাড়াতে পারলে কর্মহীন মানুষ কমে যাবে। এছাড়া ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করা হচ্ছে। এগুলোয় এক কোটি মানুষের কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তিনি বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি প্রসারিত হচ্ছে। এখান থেকেও কিছু অর্জন হবে। সব মিলিয়ে বর্তমান যে ৩০ মিলিয়ন মানুষ নিচে রয়েছে, তাদের এ অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব হবে। অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেন, বর্তমান স্বাভাবিক নিয়মে আট শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। ২০২৪ সালের মধ্যে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে অনেকগুলো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। ব্যাপক অবকাঠামোর উন্নয়ন করা হয়েছে। মানবসম্পদ আমাদের মূল পুঁজি। তরুণ প্রজন্মকে কাজে লাগানো হচ্ছে। আশা করছি এতে দুই শতাংশ অর্জন সম্ভব হবে। আমাদের স্বপ্ন হচ্ছে, বিশ্বের ২০তম অর্থনীতির দেশ হবে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ ও ভুটানে নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর মার্সি টেম্বন বলেন, বিগত দশকে দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশ প্রশংসনীয় অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু এখনও প্রতি চারজনের একজন দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছে। বাংলাদেশকে আরও অনেক কিছু করতে হবে, বিশেষ করে দারিদ্র্যের নতুন ক্ষেত্রগুলোর দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। যেমন, শহর এলাকায় দারিদ্র্য মোকাবিলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে দরিদ্র মানুষের অর্ধেক শহরে বাস করবে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। এ সময়ে দারিদ্র্য বিমোচনের ৯০ শতাংশই গ্রামে হয়েছে। শহরে দারিদ্র্য কমছে সীমিত হারে এবং অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে শহরের লোকের অংশ একই রয়ে গেছে। ফলে জাতীয় দারিদ্র্য বিমোচনের গতি ধীর হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, দারিদ্র্য নিরসনে সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। ২০০০ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশ। সেটি কমে ২০০৫ সালে ৪০ শতাংশ, ২০১০ সালে ৩১ দশমিক পাঁচ শতাংশ এবং ২০১৬ সালে ২৪ দশমিক পাঁচ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে অতিদারিদ্র্য ২০০০ সালে ৩৪ দশমিক তিন শতাংশ, ২০০৫ সালে ২৫ দশমিক এক শতাংশ, ২০১০ সালে ১৭ দশমিক ছয় শতাংশ এবং ২০১৬ সালে ১৩ শতাংশ।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কৃষি নয়, গ্রামাঞ্চলে দারিদ্র্য কমাতে শিল্প ও সেবা খাত বেশি অবদান রেখেছে। এ সময়ে কৃষি প্রবৃদ্ধি ধীর ছিল এবং আগের চেয়ে দারিদ্র্য বিমোচনে কম অবদান রেখেছে। শহরাঞ্চলে ম্যানুফ্যাকচারিং বা উৎপাদন খাত, বিশেষত তৈরি পোশাক খাত দারিদ্র্য কমাতে নেত্বস্থানীয় ভূমিকা রেখেছে।
এদিকে উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থানে ধীরগতির কারণে সুবিধা পেতে পারত এমন পরিবারের অংশ সীমিত হয়েছে। অন্যদিকে সেবা খাতে আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিতদের মধ্যে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে, যা নগর দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করেছে।
বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ও রিপোর্টের সহ-লেখক মারিয়া ইউজেনিয়া জেননি বলেন, এ রিপোর্টে তুলে ধরা হয়েছে প্রথাগত বিভিন্ন চালিকাশক্তি দারিদ্র্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখছে কিন্তু অগ্রগতি আনার ক্ষেত্রে কিছু চালকের ক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়েছে। আগামী দশকের মধ্যে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্য অর্জনে অর্থনীতিতে দারিদ্র্য মোকাবিলা করতে পারে।
সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম বলেন, সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে দারিদ্র্য নিরসন সম্ভব হচ্ছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি এক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। তবে চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, দারিদ্র্য নিরসনের গতি কমেছে। এক্ষেত্রে ২০০৫ সাল পর্যন্ত দারিদ্র্য কমেছে বার্ষিক এক দশমিক সাত শতাংশ হারে। ২০০৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত বার্ষিক এক দশমিক পাঁচ শতাংশ হারে এবং ২০১০ থেকে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দারিদ্র্য কমেছে এক দশমিক দুই শতাংশ হারে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে তৈরি হতে যাওয়া দ্বিতীয় পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা ও অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া জলবায়ুর পরিবর্তন মোকাবিলায় শতবছরের ডেল্টা প্ল্যানের বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক বিষয়গুলোর সমাধান ঘটবে।

 

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..