আরাফাত চৌধুরী, জবি : উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। এতে কেন্দ্রীয় সংসদে ভোটার উপস্থিতির হার প্রায় ৬৬ শতাংশ এবং হল সংসদ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৭৭ শতাংশ। গতকাল রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত জকসু নির্বাচনের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষে ভোট গণনা চলছিল। ভোট গণনা এলইডি স্ক্রিনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
এর আগে গতকাল সকাল ৯টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে বিকাল ৩টা পর্যন্ত প্রধান ফটক খোলা রাখা হয়। এরপর লাইনে দাঁড়ানো শিক্ষার্থীদের ভোটগ্রহণ শেষ হওয়া পর্যন্ত চলে ভোটগ্রহণ।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার প্রায় ৬৬ শতাংশ। এ ছাড়া হল সংসদ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৭৭ শতাংশ।
সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হলে প্রথম দিকে ভোটার উপস্থিতি কিছুটা কম থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে ভোটারসংখ্যা বাড়তে থাকে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মাঝে উচ্ছ্বাস লক্ষ করা গেছে। অনেককেই ভোট দিয়ে ছবি তুলে আনন্দ প্রকাশ করতে দেখা যায়।
নির্বাচন কমিশনের সূত্রমতে, জকসু নির্বাচনে ৩৯টি ভোটকেন্দ্রে মোট ১৬ হাজার ৬৪৫ ভোটারের ভোট প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি হল সংসদ নির্বাচনে ১টি ভোটকেন্দ্রে ১ হাজার ২৪২ জন ভোটারের ভোট প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়।
নির্বাচন উপলক্ষে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তা জোরদার করে প্রশাসন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছাড়াও গোয়েন্দা সদস্যদের উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। র্যাব-পুলিশসহ তিন
স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে মোতায়েন করা হয় ডগ স্কোয়াড। বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের বাহাদুর শাহ পার্কে পুলিশের অস্থায়ী কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রার্থী তালিকা অনুযায়ী, ভিপি পদে ১২ জন, জিএস পদে ৯ জন, এজিএস পদে আটজন, মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্র পদে চারজন, শিক্ষা ও গবেষণা পদে ৯ জন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক পদে পাঁচজন, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক পদে পাঁচজন, আইন ও মানবাধিকার সম্পাদক পদে চারজন, আন্তর্জাতিক সম্পাদক পদে আটজন, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক পদে সাতজন, ক্রীড়া সম্পাদক পদে সাতজন, পরিবহন সম্পাদক পদে চারজন, সমাজসেবা ও শিক্ষার্থী কল্যাণ সম্পাদক পদে ১০ জন, পাঠাগার ও সেমিনার সম্পাদক পদে সাতজন এবং সদস্য পদে সাতজনের বিপরীতে ৫৭ প্রার্থী লড়াই করছেন।
এদিকে নির্বাচনকে ঘিরে একে অপরের প্রতি পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছে শিবির-ছাত্রদল-ছাত্রশক্তি। নির্বাচনে অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা ও সহিংস আচরণের অভিযোগ তুলে শিবির-সমর্থিত ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য প্যানেল’-এর ভিপি পদপ্রার্থী রিয়াজুল ইসলাম। এদিকে ব্যালট নম্বরের টোকেন নিয়ে ভোটকেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশের অভিযোগ তোলেন ছাত্রদল-সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান’ প্যানেলের ভিপি পদপ্রার্থী একেএম রাকিব। অন্যদিকে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে পেশিশক্তি প্রদর্শন, আচরণবিধি লঙ্ঘন এবং প্রশাসনিক পক্ষপাতের অভিযোগ তোলেন ছাত্রশক্তি-সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ জবিয়ান’ প্যানেলের প্রার্থীরা। পৃথক পৃথক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ উত্থাপন করেন তারা।
শিবির-সমর্থিত প্যানেলের ভিপি পদপ্রার্থী রিয়াজুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, ভোটগ্রহণ শুরুর সময় পরিবেশ শান্ত থাকলেও পরে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা ক্যাম্পাসের প্রধান গেটে ধাক্কাধাক্কি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন। বিষয়টি পুলিশ প্রশাসনকে জানানো হলেও তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।
অন্যদিকে ছাত্রদল-সমর্থিত প্যানেলের ভিপি পদপ্রার্থী একেএম রাকিব ছাত্রশিবিরের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, একটি নির্দিষ্ট প্যানেলের কয়েকজন ব্যালট নম্বরের টোকেন নিয়ে ভোটকেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করেছে। বিষয়টি আমাদের কাছে সন্দেহজনক মনে হলে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। তবে শুরুতে কমিশনের পক্ষ থেকে বিষয়টি অস্বীকার করা হয় এবং বলা হয়, এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত জকসু নির্বাচনে উৎসবমুখর পরিবেশে শিক্ষার্থীরা ভোট দেন। সকালে ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার পর ভোটার উপস্থিতি কম থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোটার উপস্থিতি বাড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাস্কর্য চত্বর, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, বিজ্ঞান অনুষদের মাঠসহ বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। এ সময় ভোটাররা সুশৃঙ্খলভাবে সারি মেনে ভোটদান সম্পন্ন করেন। অনেক শিক্ষার্থীকে ভোট দেওয়ার পর দল বেঁধে ছবি তুলতে এবং বিজয়চিহ্ন দেখাতে দেখা যায়। অনেকে ভোটার সিøপ ও কালোকালি অঙ্কিত আঙুল প্রদর্শন করে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপলোড করেন।
ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত অদম্য জবিয়ান ঐক্য পরিষদের ভিপি প্রার্থী রিয়াজুল ইসলামের স্ত্রী মাহিমা আক্তারকে হেনস্তা এবং পরে পুলিশের কাছে তুলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছে ছাত্রদল।? গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে এ ঘটনা ঘটে। কিছুক্ষণ পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ?মাহিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ২০১৮-১৯ সেশনের শিক্ষার্থী ও রিয়াজুলের সহপাঠী।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী মাহিমা আক্তার বলেন, ‘আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে অবস্থান করছিলাম। তখন ছাত্রদলের ভাইয়েরা এসে আমাকে হেনস্তা করে। আমার সঙ্গে একজন আত্মীয়ও ছিলেন। আমরা গেটের বাইরেই অবস্থান করছিলাম। এ সময় আমি হিজাব পরিহিত থাকায় আমাকে হিজাব ও মাস্ক খুলতে বলা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সদস্যসচিব শামসুল আরেফিন এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনজন মহিলা নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে চায়, এসময় তারা কোনো পরিচয়পত্র দেখাতে পারেনি। এরপর তারা অ্যাডভোকেট পরিচয় দিলেও কোনো পরিচয়পত্র দেখাতে পারেনি। এসময় পুলিশ তাদের আটক করে এবং শিবিরের ভিপিপ্রার্থীর স্ত্রী তাদের বাঁচাতে এলে তাকেও পুলিশ আটক করে।
প্রিন্ট করুন


Discussion about this post