সুশিক্ষা

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা তিন বিতার্কিকের গল্প

যুক্তিবিহীন সমাজ বা রাষ্ট্রব্যবস্থা আমাদের ভুল পথে পরিচালিত করতে পারে। এক্ষেত্রে আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করে বিতর্ক চর্চা। এ চর্চা পরমতসহিষ্ণু হতে শেখায়। তরুণদের নেতৃত্ব বিকাশে ভূমিকা রাখে বিতর্ক চর্চা। তাদের জীবনে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। বিতর্ক চর্চায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা তিন বিতার্কিকের গল্প তুলে ধরেছেন আমজাদ হোসেন ফাহীম

বিতর্ক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনে
সবুজ রায়হান
সভাপতি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটি (জেএনইউডিএস)
যুক্তিতেই মুক্তি মিলে। আর এ মুক্তি আসে বিতর্ক চর্চার মাধ্যমে। যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার বাঁকড়া ইউনিয়নের ‘মাটশিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’-এ পড়ালেখা শুরু হয় আমার। ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হই। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক উভয় স্তরে বোর্ডবৃত্তি পেয়েছি। বিদ্যালয়ে পড়াকালে বিটিভিতে বিতর্ক দেখতাম। তখন থেকেই বিতর্কের প্রতি ভালো লাগা শুরু হয়। কলেজে পড়াকালে কয়েকটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ হলেও বিতর্ক অধরা থেকে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরে বিতর্ক চর্চাকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়। চর্চার সুযোগ পাই।
বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে বিতর্ক করে ও স্কুল-কলেজ বিতর্কের বিচারকার্য পরিচালনা করে মনে হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে জানার পরিধিটা বেশি। আমার বিতর্কের পথচলা শুরু হয় ‘জগন্নাথ ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটিতে (জেএনইউডিএস)। জেএনইউডিএসের গাজী আবু হুরায়রা আর অনিক দাদার কাছেই আমার হাতেখড়ি। এরপর জেএনইউডিএসের হয়ে প্রথম বিতর্কেই সেমিফাইনালে উঠি। এ থেকেই প্রতিযোগিতামূলক বিতর্কের যাত্রা শুরু আমার। জাতীয় পর্যায়ের অনেক প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্ব করেছি।
‘ন্যাশনাল ডিবেট পার্লামেন্ট’ আয়োজিত আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় বিতর্ক প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। এতে দলনেতার দায়িত্ব পালন করি। টুর্নামেন্টে সেরা বিতার্কিক হই।
জাতীয় বিজ্ঞান বিতর্ক প্রতিযোগিতায় দলকে ফাইনালে নিয়ে যেতে সক্ষম হই, রানার-আপ হই। বাংলাদেশ টেলিভিশন বিতর্ক, বিডিএফ ও চ্যানেল নিউজ টোয়েন্টি ফোর আয়োজিত আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় বিতর্ক প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্ব করি।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বিভাগীয় বিতর্ক সংগঠন ‘সক্রেটিস তার্কিক পরিষদের (সতাপ)’ সভাপতির দায়িত্ব পালন করি। ২০১৪-১৫ সেশনে জেএনইউডিএসে সহ-দফতর সম্পাদক ছিলাম। ২০১৭-১৮ সেশনে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হই। ২০১৮-১৯ সেশনে সভাপতি নির্বাচিত হই। বর্তমানে এ দায়িত্ব পালন করছি।
নতুনদের উদ্দেশে বলতে চাই, আগে যাচাই করতে হবে নিজেকেÑবিতর্ক ভালো লাগে কি না, তা বুঝতে হবে। নিয়মিত অনুশীলন করতে হবে। আমি বিশ্বাস করি, বিতর্ক মানুষকে সহনশীল হতে শেখায়, যৌক্তিক হতে শেখায় এবং বোধসম্পন্ন করে তোলে।

বিতর্ক পরমতসহিষ্ণু হতে শেখায়
মাহিদুল ইসলাম
সাধারণ সম্পাদক, জগন্নাথ ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটি (জেএনইউডিএস)
২০০১ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত রাজধানীর বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুলে মাধ্যমিক স্তরের পড়ালেখা শেষ করে ভর্তি হই নটরডেম কলেজে। বিতর্ক বা যুক্তিবাদী মননের পেছনে আমরা ভিত গড়ে দিয়েছে বই পড়ার অভ্যাস। কিছুই বাদ যেত না ক্লাসিক উপন্যাস, গোয়েন্দা কাহিনি প্রভৃতি বই পড়তাম। একটা ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারও গড়ে তুলেছিলাম। বিদ্যালয়ে ক্লাব না থাকায় বিতর্ক করা হয়ে ওঠেনি। তবে আবৃত্তি করতাম। কলেজে ভর্তি হয়ে ডিবেটিং ক্লাব, নাট্যদল ও রোভার স্কাউটের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু অভিজ্ঞতা না থাকায় কলেজের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করা হয়নি।
বিতর্কে হাতেখড়ি হয় বিশ্ববিদ্যালয় এসে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটির (জেএনইউডিএস) সিনিয়রদের ভালোবাসা, সহযোগিতা ও বিভিন্ন বিতর্ক টুর্নামেন্ট দেখে বিতার্কিক হওয়ার প্রেরণা পাই। যুক্তিবাদী চিন্তাভাবনার শক্তি পরস্পরকে যেন ছাড়তেই চায় না। বিতর্ক আমাকে শিখিয়েছে সব বিষয় ভিন্ন ও কোনো ঘটনা বিশ্লেষণ না করে ফলাফলে না যাওয়া। আরও শিখিয়েছে কীভাবে কঠিনতম পরিস্থিতিতেও ধীরস্থির থাকা যায়।
সনাতনী বিতর্ক থেকে এখন সংসদীয় ধারার বিতর্কের প্রচলন তুলনামূলকভাবে বেশি। বিতর্ক মানুষকে পরমতসহিষ্ণু হতে শেখায়। তবে বিতর্কের উদ্দেশ্য যদি বিজয়ী হওয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে বিতার্কিক হতে পারলেও অন্যান্য মানবিক গুণ অর্জন করা যাবে না। তাই শেখার জন্যও বিতর্ক করতে হবে।

যুক্তিভিত্তিক সমাজগঠনে ভূমিকা রাখে
সাবিক তাহমিদ
দফতর সম্পাদক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটি (জেএনইউডিএস)
বিতর্ক যুক্তিভিত্তিক সমাজগঠনে ভূমিকা রাখে
সবার সামনে কথা বলার মূল লক্ষ্যই হলো, সবার মনোযোগ আকর্ষণ করা। বিতর্ক একজন মানুষকে বিস্তর জটিল বিষয়াদি নিয়ে কথা বলতে শেখায়। ছোটবেলা থেকেই টেলিভিশনে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের বিতর্ক দেখা ছিল আমার অন্যতম শখ। তখন থেকেই বিতর্কের প্রতি ভালালাগা জন্মে। তবে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বিতর্ক চর্চার ক্লাব না থাকায় স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে বিতর্ক করা হয়নি। ২০১১ সালে বগুড়া জিলা স্কুল থেকে এসএসসি ও ২০১৩ সালে বগুড়া সরকারি আযিযুল হক কলেজ থেকে এইসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে ভর্তি হই।
বিতর্কের পথচলা শুরু ২০১৫ সালে। তখন আমি প্রথম বর্ষের ছাত্র। জেএনইউডিএস’তে পথচলার শুরুতেই গুরুদায়িত্ব নিতে হয়। নিজের বিভাগে কোনো বিতর্ক সংগঠন ছিল না। শিক্ষকদের সহায়তায় ইসলামিক স্টাডিজ ডিবেটিং ক্লাবের যাত্রা শুরু হয়। এর প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি ছিলাম আমি। এরপর সাংগঠনিক দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। দফতর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করি। বাংলাদেশ টেলিভিশন ও এটিএন বাংলাসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নিই।
ন্যাশনাল ডিবেট পার্লামেন্টের দ্বিতীয় আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয় আমার দল। দশম জাতীয় বিজ্ঞান বিতর্ক প্রতিযোগিতায় রানার-আপ হই।
নতুনদের বলতে চাই, যুক্তি ও পাল্টাযুক্তির খেলায় নিজের জানার পরিধিকে বিস্তৃত করার কোনো বিকল্প নেই। এজন্য দৈনিক পত্রিকা পড়া ও টেলিভিশনের সংবাদ দেখা খুবই জরুরি।
বিতর্ক থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা দিয়ে যুক্তিভিত্তিক সমাজগঠনে ভূমিকা রাখতে চাই। বিতর্ক যুক্তিভিত্তিক সমাজগঠনে ভূমিকা রাখে।

সর্বশেষ..