মত-বিশ্লেষণ

জগৎমল্লপাড়া ও চারঘাট গণহত্যা

কাজী সালমা সুলতানা: বাঙালির স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা বিনাশ করতে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নজিরবিহীন গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ সংগঠিত করে। পরবর্তী ৯ মাসে দেশজুড়ে তাদের নিষ্ঠুর গণহত্যা অব্যাহত ছিল। এসব গণহত্যায় ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছেন বলা হলেও বাস্তবে এই সংখ্যা ৩০ লাখেরও বেশি। এখন পর্যন্ত পাঁচ হাজারের অধিক বধ্যভূমির সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে এক হাজার বধ্যভূমি চিহ্নিত হয়েছে। দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য বধ্যভূমি ও গণকবর। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসেই তারা এদেশে ১১টির বেশি গণহত্যা সংগঠিত করে। তার মধ্যে ১৩ এপ্রিল একই দিনে সংগঠিত হয় চট্টগ্রামের রাউজান জগৎমল্লপাড়া গণহত্যা ও রাজশাহী চারঘাট গণহত্যা।

জগৎমল্লপাড়া গণহত্যা

মধ্যযুগের কবি দৌলত কাজী, গুলে বকাওলি-খ্যাত মোহাম্মদ মকিম, কিংবা একুশের প্রথম কবিতা ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’র লেখক মাহবুব উল আলম চৌধুরীর স্মৃতিবিজড়িত রাউজান। মাস্টারদা সূর্য সেনসহ অসংখ্য বিপ্লবী ও বিদ্রোহীর জš§স্থান চট্টগ্রামের রাউজান। ১৯৭১ সালে রাউজান সাক্ষী হয়েছে রক্তাক্ত এক নির্মমতার। ১৩ এপ্রিল এক দিনেই রাউজানের বিভিন্ন গ্রামে প্রায় ২০০ জনকে গুলিতে হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। সেদিনের জগৎমল্লপাড়া গণহত্যা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মাত্র আধা ঘণ্টায় সেখানে ৩৯ জনকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয়। একই সঙ্গে হত্যা করা হয় জগৎমল্লপাড়া-সন্নিহিত কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা নূতন চন্দ্র সিংহকে।

জগৎমল্লপাড়া গণহত্যা সম্পর্কে মাঠপর্যায়ে গবেষণা করেছেন ড. চৌধুরী শহীদ কাদের। তার ‘জগৎমল্লপাড়া গণহত্যা’ শীর্ষক গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ১৯৭১ সালের রাউজানে পাকিস্তানি বাহিনীর আগমনের পর জগৎমল্লপাড়ার লোকজন সতর্ক হয়ে যান। সংখ্যালঘুদের অনেকেই জগৎমল্লপাড়া ছেড়ে চলে যান। দেশের এমন অবস্থাতেও নূতন চন্দ্র ভারতে যেতে রাজি হননি। তিনি বলতেন, ‘আমি তো কারও ক্ষতি করিনি, জীবনে অনেক কষ্ট করেছি। এই শেষ বয়সে নিজের দেশ, মাটি আর আরাধ্য দেবী কুণ্ডেশ্বরীকে ছেড়ে কোথাও যাব না। যদি মরতে হয় এখানেই মরব। এখানে যদি মৃত্যু হয় তাহলে জনাব এই আমার নিয়তি।’ অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘আমি বেদ, উপনিষদ, কোরআন ও বাইবেলের উদ্ধৃতি দিয়ে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি দেশ থেকে কিছুদিনের জন্য হলেও তাকে সীমান্তের ওপারে চলে যেতে। কিন্তু নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও তিনি দেশ ত্যাগে রাজি হননি। বরং পাকিস্তানি আর্মিরা যে কোনো সময় আসতে পারে, এই অনুমানে তিনি আগেভাগেই বাড়ির উঠানে চেয়ার-টেবিল সাজিয়ে রেখেছিলেন।’

জগৎমল্লপাড়ার হিন্দু পরিবারগুলো একাত্তরের ১১ এপ্রিল জানতে পারে, রাউজান কলেজে পাকিস্তানিরা ক্যাম্প করেছে। ১৩ এপ্রিল সকালে গোলাগুলির শব্দ শুনে অনেকে জগৎমল্লপাড়া ছেড়ে চলে যান। সেদিনের প্রত্যক্ষদর্শী দ্বিজয়চন্দ্র কৃষ্ণ ঘটনা বর্ণনা করে বলেন, ১৩ এপ্রিল সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার দিকে আমার বাবা-মা, ভাই ও বৌদিসহ আমরা ডাবুয়ায় আমার মাসির বাড়ির উদ্দেশে রওনা হই। কিন্তু অধিকাংশ লোক নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারেননি। তারা ভেবেছিলেন নিরীহ এই গ্রামবাসীর ওপর কেনই-বা পাকিস্তানি বাহিনী হামলা চালাবে। অন্যদিকে স্থানীয় রাজাকার মাবুদ, গোলাম আলী, নওয়াব মিয়া, মোহাম্মদ বখশসহ অন্যরা গ্রামবাসীকে অভয় দেন যে, তাদের কোনো ক্ষতি করা হবে না। কিন্তু কুণ্ডেশ্বরীতে নূতন চন্দ্র সিংহকে হত্যার পর ঘাতকের দল আসে জগৎমল্লপাড়ায়। সেদিনের ঘটনা সম্পর্কে একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ১৩ এপ্রিল সকাল সাড়ে ১০টা থেকে সাড়ে ১১টার মাঝে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী স্থানীয় সহযোগীসহ পাকিস্তানি দখলদার সেনাবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে হিন্দু অধ্যুষিত জগৎমল্লপাড়ায় সশস্ত্র অভিযান চালায়। এ সময় সাকা চৌধুরীর দুজন সহযোগী আব্দুল মাবুদ ও অপর একজন জগৎমল্লপাড়ায় হিন্দু নর-নারীদের সবাইকে কথিত এক মিটিংয়ে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান। তাদের কথা বিশ্বাস করে এলাকাবাসী কিরণ বিকাশ চৌধুরীর বাড়ির আঙিনায় অনেকেই জড়ো হয়। তাদের একত্র করে বসানো হয়। অতঃপর সাকা চৌধুরীর উপস্থিতিতে তাদের ওপর গুলিবর্ষণ করা হয়। এখানে গুলিতে মারা যান ৩৬ জন।

জগৎমল্লপাড়া গণহত্যায় শহীদ হন ৪০ জন। ১৩ তারিখ সকাল ১০টায় কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা নূতন চন্দ্র সিংহকে হত্যার মাধ্যমে এই গণহত্যার সুচনা হয়। এরপর পাকিস্তানি বাহিনী জগৎমল্লপাড়ায় এসে ৩৬ জনকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে। এরপর মে মাসে আবার পাকিস্তানি বাহিনী জগৎমল্লপাড়ায় আসে। এদিন হত্যা করা হয় আরও তিনজনকে। দুই দফায় শহীদ হন ৪০ জন।

চারঘাট গণহত্যা

রাজশাহী জেলার ২৭ কিলোমিটার দক্ষিণে পদ্মা-বড়ালবিধৌত চারঘাট উপজেলা। ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী এই উপজেলায় গণহত্যার ঘটনা ঘটায়। এদিন সকালে পাকিস্তানি সৈন্যরা দুটি প্রধান দলে বিভক্ত হয় এবং একটি দল পুলিশ একাডেমির মধ্যে প্রবেশ করে; অন্যটি আরও অগ্রসর হয়ে চানমারি পার হয়ে পদ্মার পাড়ে যায়। সেদিন পাকিস্তানি সৈন্যরা পুলিশ একাডেমি, চারঘাট উপজেলার থানাপাড়া, কুঠিপাড়া, গৌরশহরপুর, বাবুপাড়াসহ পদ্মা নদীর তীরে ব্যাপক গণহত্যা সংঘটিত করে, যার সাক্ষ্য বহন করছে দুটি গণকবর ও একটি বধ্যভূমি।

চারঘাট পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ছিল চারঘাট উপজেলার মুক্তিযোদ্ধাদের মূল ক্যাম্প। এদিন বেলা ১০টার পর খবর আসে পাকবাহিনী নাটোর থেকে রাজশাহীর দিকে আসছে। তখনও জানা যায়নি তারা পুলিশ একাডেমি সারদাতে আসবে। দুদিন আগে সারদা পুলিশ একাডেমির যত অস্ত্র ছিল সবগুলো ক্যাপ্টেন রশিদের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে তুলে দেয়া হয়। সারদা আসতে গিয়ে পথেই পাকবাহিনী মোক্তারপুর ট্রাফিক মোড় ও সারদা বাজারে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে বাধাগ্রস্ত হয় এবং আধা ঘণ্টা গুলিবিনিময় হয়। পাক সেনাদের ভারী অস্ত্রের মুখে মুক্তিযোদ্ধারা সেদিন প্রাণপণে যুদ্ধ করেও টিকতে পারেননি। শহীদ হন ইউসুফ, দিদারসহ বেশ অনেকজন। পুলিশ একাডেমির দখল নেয়ার পর শুরু হয় গণহত্যা।

পাকবাহিনী পুলিশ একাডেমির ভেতর ঢুকে পদ্মা নদীর চরে কয়েক হাজার নারী, পুরুষ ও শিশু দেখতে পায়। ভীত ও নিরস্ত্র সাধারণ মানুষ আত্মরক্ষার্থে গ্রাম ছেড়ে সীমান্তবর্তী পদ্মা নদীর তীরে অবস্থান নেন। কিছুক্ষণের মধ্যে পরে পাক হানাদার বাহিনী পদ্মার চারপাশে ঘেরাও করে। তারা নারী ও শিশুদের এক দলে ভাগ করে এবং সব পুরুষকে আরেকটি দলে ভাগ করে। পুরুষদের অপেক্ষা করতে বলে নারী ও শিশুদের বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য নির্দেশ দেয়। এর পরই তারা ব্রাশফায়ারের মাধ্যমে গণহত্যা শুরু করে। শুধু গুলি করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি। এরপর অনেক লাশ এক জায়গায় জড়ো করে এক ধরনের গানপাউডার দিয়ে পুড়িয়ে দেয় তারা। চাটখিল গণতহ্যায় প্রায় ২০০ মানুষ নিহত এবং আরও শতাধিক মানুষ আহত হন।

এই গণহত্যায় প্রতিটি পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বাবা, ভাই অথবা স্বামী কেউ না কেউ নিহত হন। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বিশেষ করে থানাপাড়া গ্রাম বিধবা গ্রাম হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ২০১১ সালে চারঘাট গণহত্যা স্বীকৃতি লাভ করে এবং গণহত্যার স্মৃতিস্বরূপ চারঘাট পল্লী বিদ্যুৎ মোড়ে তৈরি হয় ১৭৪ শহীদের নাম-সংবলিত স্মৃতিস্তম্ভ।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তার দোসররা যে গণহত্যা চালিয়েছিল, তা ইতিহাসে বিরল। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেসব নারকীয় হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকেও হার মানায়। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বাঙালির জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ বিনির্মাণে আমরা যাদের হারিয়েছি, তাদের আত্মত্যাগকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। তারাই গৌরব ও অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পথ দেখাবে।

গণমাধ্যমকর্মী

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..