প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

জনগণের স্বার্থে মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি করুন

পাঠকের চিঠি

ন্যায় বিচার পাওয়া মানুষের মৌলিক অধিকার। প্রতিটি রাষ্ট্রের নিজস্ব বিচারব্যবস্থা আছে এবং বাদী-বিবাদীকে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় মাধ্যমে বিচার প্রার্থনা করতে হয়। আমাদেরও নির্দিষ্ট বিচার প্রক্রিয়া আছে। আমাদের দেশের বিচার প্রক্রিয়া মূলত মধ্যযুগ থেকে ব্রিটিশদের হাত ধরে এসেছে। এখনও আমাদের অধিকাংশ বিচারব্যবস্থা ব্রিটিশদের আইন প্রক্রিয়ায় হয়ে থাকে। আমাদের দেশের বিচারব্যবস্থার ধীরগতি নিয়ে প্রশ্নগুলো বারবার ঘুরেফিরে আমাদের সামনে চলে আসে। যদিও আগের তুলনায় কিছুটা হলেও উন্নতি হচ্ছে, কিন্তু সেটা আশানুরূপ নয়। বর্তমান জটিল সমাজব্যবস্থায় নিত্যনতুন অপরাধ বেড়েই চলছে এবং অপরাধের ধরনও বিভিন্ন রকমের। কিছু অপরাধ আছে যেগুলোর নজির নেই, যার দরুন বিচার প্রক্রিয়াও প্রায়ই বিলম্বিত হচ্ছে। দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করাকে আইনের স্তম্ভ বলা যেতে পারে। বিচার বিভাগ মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে। ২০০২ সালের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইনের ১০ ধারা অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনালে মামলা আসার দিন থেকে সর্বোচ্চ ১৩৫ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করার কথা থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মামলার রায় হতে লেগে যাচ্ছে বছরের পর বছর, যার ফলে বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা লক্ষ করা যায়। দীর্ঘদিন একটি মামলা চলমান থাকলে বাদী-বিবাদী উভয় পক্ষে অনেক অর্থ ও সময় ব্যয় করতে হয়, যার দরুন অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে যায়। সেইসঙ্গে অপরাধ প্রবণতাও বৃদ্ধি পেতে থাকে। একজন অপরাধী অপরাধ করার দীর্ঘদিন পরও যখন বিচার না হয়, তখন আবার অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পরে। ফলে অপরাধের প্রবণতা হ্রাস না পেয়ে ক্রমাগতভাবে বাড়তে থাকে। ফলে সমাজের স্বাভাবিক শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হয়। বাংলাদেশ স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পার করলেও বিচার বিভাগের অনেক সীমাবদ্ধতা আমাদের সামনে পরিলক্ষিত হয়। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আদালত ভবনের স্বল্পতা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহারের অনুপযোগিতা, বিচারকের অপর্যাপ্ততা, নিয়োগের ক্ষেত্রে ধীরগতি, মামলার তুলনায় বিচারকস্বল্পতা এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে অনেক বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া। এসব কারণে অনেক আলোচিত মামালাও বছরের পর বছর ঝুলে আছে। বর্তমান মামলার জট নিরসনে ট্রাইব্যুনালগুলো দুই দিনে একটি করে মামলা নিষ্পত্তি করলেও আদালতগুলোর ২০ বছর সময় লাগবে তা শেষ করতে। আমাদের ১৬ কোটি মানুষের জন্য মাত্র এক হাজার ৭০০ থেকে এক হাজার ৮০০ বিচারক কাজ করছেন। এছাড়া আপিল বিভাগে বিচারকের স্বল্পতা রয়েছে। ১৯৭২ সালে প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগে বিচারক ছিলেন তিনজন। পর্যায়ক্রমে সেই সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ২০০৯ সালে গিয়ে দাঁড়ায় ১১ জনে। পরে এই সংখ্যা কমে গিয়ে ২০২০ সালে দাঁড়ায় ৯ জনে। গত এক বছরে আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতি অবসরে গেছেন। এই অবসরজনিত কারণে বিচারকসংখ্যা কমে গিয়ে চারজনে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি চার বিচারপতিকে আপিল বিভাগে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এখন আপিল বিভাগের বিচারপতি মোট আটজন। আমাদের বিচারকরা অনেক পরিশ্রম করছেন। আমাদের দেশের অনেক সীমাবদ্ধতা আছে, এটা মেনে নিতে হবে। তারপরও আমাদের রাষ্ট্রকে এসব সীমাবদ্ধতা দূর করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। যেখানে আদালত ভবনের স্বল্পতা, সেখানে নতুন ভবন নির্মাণ করতে হবে। আমাদের দেশের মামলা নিষ্পত্তি করার জন্য পর্যাপ্ত বিচারক নেই। জরুরি ভিত্তিতে বিচারক নিয়োগ এবং বিচারকের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। বিচারকাজ যেন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ব্যতীত করা যায়, তার নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে। বিচারকদের পর্যাপ্ত সম্মানী প্রদান করতে হবে, যেন বিচারকরা দুর্নীতিতে জড়িয়ে না পড়েন। এছাড়া আদালত প্রাঙ্গণে দালালদের রুখতে হবে। এ ব্যপারে ২ জানুয়ারি নতুন প্রধান বিচারপতি ব্যবস্থা নেয়ার হুশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি আরও বলছেন, মামলাজট থেকে মুক্তি পেতে যুদ্ধ ঘোষণা করা হবে। দেশের সাধারণ লোকের এত দিন করে একটা কেস চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা থাকে না। বিশেষ করে যেসব লোক দরিদ্র এবং নি¤œশ্রেণিভুক্ত, তারা বছরের পর বছর একটা কেস চালিয়ে নিয়ে যেতে পারে না। এতে অনেকে হীনম্মন্যতায় ভোগে। শুধু তাই নয়, অনেকে আত্মহত্যাও করে থাকে। এভাবে কেস বছরের পর বছর ঝুলে থাকলে সাধারণ মানুষ আইনের ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলবে। তাই দেশের স্বার্থে, জাতির স্বার্থে ও উন্নয়নের স্বার্থে মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করুন। মনে রাখতে হবে, দেশের মানুষ সুস্থ-স্বাভাবিকভাবে চলতে পারলেই দেশ চলবে, দেশ এগিয়ে যাবে। হয়তো যাদের কেস নিষ্পত্তিতে এত সময় লাগছে, তারাও একদিন বড় কোনো কূটনীতিক হবেন।

সর্বোপরি দেশের বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা আরও বৃদ্ধি করতে মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে হবে।

ইসমাইল জাবিউল্লাহ

শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়