প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

জনবল সংকটেও মানসম্মত সেবা পান রোগীরা

শামসুল আলম, ঠাকুরগাঁও: ঠাকুরগাঁওয়ে চিনিশিল্প ছাড়া ভারী কোনো কলকারখানা নেই। নেই কোনো মেডিকেল কলেজ বা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। রয়েছে আধুনিক সদর হাসপাতাল। এ হাসপাতালকে মেডিকেল কলেজে হাসপাতালে রূপান্তর করার দাবি জানিয়েছেন ঠাকুরগাঁওবাসী। কেননা শিল্পক্ষেত্রে উন্নত জেলার তুলনায় পিছিয়ে থাকলেও চিকিৎসা ক্ষেত্রে সুনাম কুড়িয়েছে এ আধুনিক সদর হাসপাতাল।

১৯৮৭ সালে ৫০ শয্যা নিয়ে যাত্রা করে ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতাল। ১৯৯৭ সালের জুলাইয়ে ১৮ শয্যার শিশু শয্যাসহ ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। ২০১৮ সালের মার্চে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাত তলা ভবন উদ্বোধন করে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করেন এবং ১৮ শয্যার শিশু ওয়ার্ডটিকে উন্নীত করা হয় ৪৫ শয্যায়। কিন্তু সে অনুপাতে এখনও জনবল নিয়োগ দেয়া হয়নি। এতে চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম পোহাচ্ছেন ডাক্তার  ও নার্সরা।

জানা গেছে, হাসপাতালে প্রথম শ্রেণির চিকিৎসকের পদ খালি রয়েছে মোট ১৮টি। অন্যান্য শ্রেণির খালি রয়েছে মোট ৫৭টি। হাসপাতালে নেই আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন, ইকো মেশিন, সিটিস্ক্যান মেশিন, আইসিইউ

ও সিসিইউ।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ রোগী ভর্তি থাকেন। তাদের শিশু ওয়ার্ডেই ভর্তি থাকে  ১৫০ থেকে ২০০ শিশু রোগী। দিনে গরম ও রাতে ঠাণ্ডা এমন আবহাওয়ায় বেড়েছে শিশু রোগীর সংখ্যা। শয্যা সংকটে পড়ে অভিভাবকরা বেশিরভাগ শিশু রোগী নিয়ে অবস্থান করছেন ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের বারান্দা কিংবা মেঝেতে। ৪৫ শয্যার শিশু ওয়ার্ডে অতিরিক্ত রোগীর চাপে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে রোগীর স্বজনরা ছুটছেন সেবা নিতে। এ হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মান ভালো থাকায় জেলার পাঁচ উপজেলাসহ আশেপাশের জেলা পঞ্চগড়, নিলফামারী ও দিনাজপুরের কিছু অংশের রোগীরা সেবা নিতে আসায় এ পরিস্থিতি হয়েছে। ফলে কাক্সিক্ষত সেবা দিতে হিমশিম পোহাচ্ছেন চিকিৎসকরা।

পঞ্চগড়, নিলফামারী ও দিনাজপুর থেকে আসা রোগীর স্বজনরা জানান, রংপুর বা দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তুলনায় ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতাল কাছে হওয়ায় তারা এখানে আসেন। চিকিৎসার মান ভালো হলেও শয্যা সংকটের কারণে মেঝে কিংবা বারান্দায় চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। অতিরিক্ত রোগীর চাপে হাসপাতালে পা ফেলার জায়গা নেই। হাসপাতালটিতে শয্যা বাড়ানোর পাশাপাশি লোকবল বাড়ানোও জরুরি হয়ে পড়েছে। না হলে কাক্সিক্ষত সেবা থেকে বঞ্চিত হবেন রোগীরা।

হাসপাতালে মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি, কার্ডিওলোজি ও শিশু সেবার মান ভালো ও জনবান্ধব হওয়ায় রোগীরা এ হাসপাতালে ছুটে আসেন বলে জানান তারা।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ভেলাজান নদীপাড়া এলাকার এক শিশু রোগীর মা মোছা. মনুরা আক্তার জানান, আমাদের এ হাসপাতালের ডাক্তার ও নার্সরা চিকিৎসার ব্যাপারে বেশ আন্তরিক। হাসপাতালে লোকবল কম। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রূপান্তর হলে ভালো হতো।

আরেক রোগীর স্বজন মোছা. নাসিমা আক্তার জানান, আমাদের এ হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মান ভালো। ডাক্তার ও নার্সরা রোগীদের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করেন। আমার মনে হয়, এ হাসপাতালটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হলে ভালো হতো। তাহলে আমাদের জটিল রোগীদের নিয়ে রংপর বা দিনাজপুরে নিয়ে যেতে হতো না।

সরজমিন দেখা গেছে, অতিরিক্ত রোগীর চাপে হাসপাতালে পা ফেলার জায়গা নেই। হাসপাতালটিতে শয্যা বাড়ানোর পাশাপাশি লোকবল বাড়ানোও জরুরি হয়ে পড়েছে। না হলে কাক্সিক্ষত সেবা থেকে বঞ্চিত হবেন রোগীরা। হাসপাতালে মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি, কার্ডিওলোজি ও শিশু সেবার মান ভালো ও জনবান্ধব হওয়ায় রোগীরা এখানে সেবা নিতে আসেন।

এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. মো. শাহজাহান নেওয়াজ রোগীর চাপের কথা স্বীকার করে বলেন, হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নতি হলেও জনবল নিয়োগ দেয়া হয়নি। ফলে সেবা দিতে হিমশিম পোহাতে হচ্ছে। সেবার মান বাড়ানোর জন্য জনবল প্রয়োজন। তারপরও সাধ্যমত সেবা দেয়ার চেষ্টা করছি।

তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। শিশুদের বাইরে কম বের হতে দিতে হবে। শিশুদের কোনোমতে ঠাণ্ডা লাগানো যাবে না। প্রসাব বা পায়খানার পর পরনের কাপড় পরিবর্তন করে দিতে হবে। পুষ্টিকর খাবার খাওয়াতে হবে।’

হাসপাতালের ত্বত্তাবধায়ক ডা. মোহা. ফিরোজ জামান জানান, শীত ও গরমের শুরুতে আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে আমাদের এখানে রোগীর সংখ্যা বেড়ে যায়। তাছাড়া হাসপাতালে রোগীর সেবা মানসম্মত হওয়ায় আশেপাশের জেলার অনেক এলাকার অভিভাবক তাদের নিয়ে এখানে আসছেন। এ কারণে হাসপাতালে সব সময়  রোগীর চাপ থেকেই যায়।

এখানে প্রতিদিনই অভিজ্ঞ ডাক্তাররা রোগীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ করেন এবং প্রতিটি ওয়ার্ডের প্রতি শিফটে তিনজন করে নার্স প্রতিনিয়ত অসুস্থ রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। আবার কোনো কোনো ওয়ার্ডে শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। এতে অতিরিক্ত রোগীদের বারান্দা বা মেঝেতে রেখে চিকিৎসাসেবা দিতে হচ্ছে।