Print Date & Time : 9 March 2021 Tuesday 7:26 am

জনবল সংকটে ধুঁকছে নিমিউ

প্রকাশ: October 18, 2020 সময়- 12:39 am

আয়নাল হোসেন: বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশে প্রতিনিয়ত নতুন রোগের আবির্ভাব হচ্ছে। আর এসব রোগ নির্ণয়ের জন্য কেনা হয় কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি। কিন্তু এসব যন্ত্রপাতি অপারেট কিংবা মেরামত করার মতো প্রশিক্ষিত জনবল নেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ইলেকট্রো মেডিকেল ইকুপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ ও প্রশিক্ষণ সেন্টার (নিমিউ অ্যান্ড টিসি)।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গাইডলাইন অনুযায়ী, ৫০০ শয্যার একটি হাসপাতাল পরিচালনার জন্য বায়োমেডিকেল, ইলেকট্রো-মেডিকেল, ক্লিনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ও টেকনিশিয়ান দরকার ১৫-১৬ জন। কিন্তু দেশের কোনো পর্যায়ের হাসপাতালেই এসব প্রশিক্ষিত জনবল নেই। ফলে শত শত কোটি টাকার যন্ত্রপাতি মেরামতের অভাবে অকেজো হয়ে পড়েছে। এতে রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় ছাড়াও রোগীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিত্যনতুন রোগের প্রাদুর্ভাব হচ্ছে। এছাড়া অসংক্রামণ ব্যাধি বিশেষ করে ক্যানসার, হƒদরোগ, ডায়াবেটিক, কিডনি, মস্তিষ্কজনিত সমস্যা, আইসিইউ, উচ্চ রক্তচাপসহ নানা রোগে আক্রান্তদের রোগ নির্ণয় এবং অস্ত্রোপচার কাজে ব্যবহার হচ্ছে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি। এসব যন্ত্রপাতি পরিচালনা কিংবা সঠিক পরিচর্যার অভাবে বেশিরভাগ সময়ই অকেজো থাকছে। এসব যন্ত্রপাতি পরিচালনা, ক্যালিব্রেশন কিংবা মেরামতের জন্য প্রয়োজন বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ার, ইলেকট্রো-মেডিকেল ইঞ্জিনিয়ার ও ক্লিনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। অথচ দেশের বিশেষায়িত হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেলা ও উপজেলা কোথাও এসব জনবল নেই। এজন্য দরকার এসব পদ সৃষ্টি করা। যাতে মানুষের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয় অনেকটা কমে আসে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, জটিল জটিল রোগ নির্ণয়ের জন্য সরকার প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কিনছে। অথচ এসব যন্ত্র চালানো ও মেরামত করার জন্য দক্ষ জনবল নিয়োগের ব্যবস্থা করছে না। অথচ বছরের পর বছর চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবল নিয়োগ দিয়ে আসছে সরকার। অথচ এসব মেডিকেল যন্ত্রপাতি সঠিকভাবে পরিচালনা, ক্যালিব্রেশন ও মেরামতের জন্য দক্ষ জনবল দেশের কোনো হাসপাতালে নেই। সামান্য সমস্যার জন্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর ধরনা দিতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। অন্যদিকে নিমিউতে দক্ষ জনবল না থাকায় তারাও মেশিন মেরামত করতে পারছে না। এভাবে মাসের পর মাস অকেজো পড়ে থাকায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ছাড়াও রোগী ও স্বজনদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. কাজী রশিদ-উন-নবী শেয়ার বিজকে বলেন, মিটফোর্ড হাসপাতালটি ৯০০ শয্যার। এ হাসপাতালের অনেক চিকিৎসা যন্ত্রপাতি রয়েছে। এসব দেখভাল করার জন্য মাত্র একজন টেকনিশিয়ান রয়েছে। এগুলো  মেরামত করতে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে চিঠি লিখতে হয়। অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মেরামত করতে হলে যন্ত্রাংশ খোঁজে পাওয়া যায় না। ফলে বেশি সময় ব্যয় হয়। তবে নিমিউর সহায়তা যন্ত্রগুলো মেরামত করা হচ্ছে।  

রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত ঢাকা ডেন্টাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রায় ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি সিটি স্ক্যান মেশিন স্থাপন করা হয়। গত এক বছরের বেশি সময় ধরে  মেশিনটি অকেজো অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এই যন্ত্রটি এখন মেরামত করতে এক কোটি টাকার বেশি দরকার। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে একটি সিটি স্ক্যান মেশিন এক বছর ধরে অকেজো পড়ে রয়েছে। সেটি মেরামতের কাজ এগিয়ে চলছে। এছাড়া দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দেড় বছরের অধিক সময় ধরে অকেজো অবস্থায় পড়ে রয়েছে মূল্যবান ক্যাথল্যাব, এমআরআই ও সিটি স্ক্যান মেশিন। এসব যন্ত্র অকেজো থাকায় রোগীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। অনেকেই নিরুপায় হয়ে চড়া মূল্যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাচ্ছেন। শুধু ডেন্টাল, চক্ষু ইনস্টিটিউট, রংপুর, দিনাজপুরই নয়। রাজধানীসহ দেশের অসংখ্য সরকারি হাসপাতালে শত শত কোটি টাকা মূল্যের যন্ত্র পড়ে আছে সঠিক মেরামতের অভাবে।

নিমিউ বলছে, ১০০ জন বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ার (সহকারী প্রকৌশলী গ্রেড-৯) এবং ৭৩৫ জন ইলেকট্রো-মেডিকেল ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার (উপ-সহকারী প্রকৌশলী গ্রেড-১০) নিয়োগের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এসব লোকবল নিয়োগ দেওয়া হলে মহামারি রোধ সহজ হবে, সরবরাহকৃত যন্ত্রপাতির আয়ুষ্কাল নিশ্চিত করা, নিরাপদ ব্যবহার ও সেবা, প্রতিরোধমূলক রক্ষণাবেক্ষণ ও অকেজোর পরিমাণ কমবে, দক্ষ জনবল দিয়ে পরিচালনা করা গেলে তথ্য বিভ্রাট রোধ ও রোগীর তথ্য পর্যবেক্ষণ সম্ভব হবে, অস্ত্রোপচার চলাকালে অপ্রত্যাশিত যন্ত্র বন্ধ রোধ করা, অনাকাক্সিক্ষত সংক্রমণ রোধ করা, দ্রুত মেরামত করা, সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা বাড়বে এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় সাশ্রয় হবে, যন্ত্রের আয়ুষ্কাল বাড়বে, যন্ত্রপাতি ক্রয়ে এসব জনবল সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে নিমিউর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।

নিমিউ আরও জানায়, বর্তমানে সংস্থাটিতে তীব্র কারিগরি জনবল সংকটের কারণে চিকিৎসা যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত কার্যক্রম সুচারুভাবে সম্পাদন করা যাচ্ছে না। ফলে প্রত্যাশিত চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে। দক্ষ প্রকৌশলী নিয়োগের মাধ্যমে প্রতিটি হাসপাতালে যথাযথভাবে চিকিৎসা যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত কার্যক্রম সক্ষমতা গড়ে তোলা হবে। এসব প্রকৌশলীর নিয়োগ হলে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি স্বাস্থ্য বিভাগের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারবে। এজন্য দেশের ১৭টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ১৫টি বিশেষায়িত হাসপাতালে একজন সহকারী ও তিনজন উপ-সহকারী প্রকৌশলী, ৬১টি জেলা হাসপাতালে দুজন করে উপ-সহকারী ৫১৭টি উপজেলা হাসপাতালে একজন করে এবং নিমিউতে ৬৮ জন সহকারী প্রকৌশলী নিয়োগ দেওয়া খুবই জরুরি। এতে তাদের বেতন-ভাতাসহ বছরে আনুমানিক ৩২ কোটি টাকা ব্যয় হবে। 

জানতে চাইলে ন্যাশনাল ইলেকট্রো মেডিকেল ইকুপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ ও প্রশিক্ষণ সেন্টারের (নিমিউ অ্যান্ড টিসি) চিফ টেকনিক্যাল ম্যানেজার আমিনুর রহমান বলেন, ১০০ জন সহকারী প্রকৌশলী ও ৭৩৫ জন উপ-সহকারী প্রকৌশলী নিয়োগের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এসব জনবল পাওয়া গেলে অকেজো যন্ত্রপাতি দ্রুত মেরামত ছাড়াও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ) অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম শেয়ার বিজকে বলেন, মেডিকেল যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের জন্য দক্ষ জনবল নিয়োগের জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে। এ লক্ষ্যে গতকাল সন্ধ্যায় তারা একটি সভা করছেন বলে জানান।