প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

জনস্বাস্থ্য রক্ষায় সিগারেটের ওপর কর বাড়াতে হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক: জনস্বাস্থ্য রক্ষার্থে সিগারেটসহ তামাকপণ্যের ওপর কর বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। গবেষকরা জানান, বাংলাদেশে সিগারেটের দাম বৃদ্ধির ফলে স্বল্প আয়ের মানুষের মধ্যে সিগারেটের চাহিদা ধনীদের থেকে অধিক হারে কমে আসে। গবেষণায় দেখা গেছে, সিগারেটের দাম যদি ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, তাহলে স্বল্প আয়ের মানুষের মাঝে এর চাহিদা ৯ শতাংশ হ্রাস পায়। অন্যদিকে একই হারে দাম বৃদ্ধির ফলে ধনীদের মাঝে সিগারেটের চাহিদা মাত্র চার শতাংশ হারে হ্রাস পায়। সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে সমপরিমাণ দাম বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশে ধূমপায়ীর হার গড়ে সাত দশমিক এক শতাংশ কমে আসবে।

ঢাকার আর্ক ফাউন্ডেশন ও যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোর ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যোবাকোনোমিক্সের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে আসে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (গ্যাটস) ২০০৯ এবং ২০১৭ ব্যবহার করে বাংলাদেশে সিগারেটের চাহিদা পর্যালোচনা করার উদ্দেশ্যে এ গবেষণা পরিচালিত হয়।

আর্ক ফাউন্ডেশন আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালিত দুটি গবেষণা প্রবন্ধ গতকাল উপস্থাপন করেন আর্ক ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ড. রুমানা হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও আর্ক ফাউন্ডেশনের গবেষক এসএম আব্দুল্লাহ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ও আর্ক ফাউন্ডেশনের গবেষক মো. নাজমুল হোসেন।

রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞ আলোচক ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ড. নাসির উদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটির প্রকল্প পরিচালক ও যুগ্ম মহাসচিব অধ্যাপক ডা. গোলাম মহিউদ্দিন ফারুক,

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী, ক্যাম্পেইন ফর টোব্যাকো ফ্রি কিডসের (সিটিএফকে) লিড পলিসি অ্যাডভাইজার মোস্তাফিজুর রহমান এবং সেন্টার ফর ল অ্যান্ড পলিসি অ্যাফেয়ার্সের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম তাহিন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (গ্যাটস) ২০১৭-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার করছে প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ। শহরের তুলনায় গ্রামের মানুষের মধ্যে তামাক ব্যবহারের তীব্রতা বেশি। অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর ৪৮ শতাংশ তামাক ব্যবহার করে। তবে অতি উচ্চবিত্তের মধ্যে তামাক ব্যবহারের হার ২৪ দশমিক ৮ শতাংশ। অন্যদিকে ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত দ্রব্য সবচেয়ে বেশি গ্রহণ করেন নারীরা। যাদের ৫৮ দশমিক ৭০ শতাংশের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই।

প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে এসএম আব্দুল্লাহ বলেন, ‘তামাকজাত দ্রব্যের মূল্য বাড়ালে এর ব্যবহারের হারও কমে আসে, এটা বিশ্বজুড়ে পরীক্ষিত। তবে সুনির্দিষ্টভাবে সিগারেটের দাম বৃদ্ধিতে এর ব্যবহার কমলেও আনুপাতিক হারে তা বৃদ্ধির তুলনায় কম। ফলে কাক্সিক্ষত হারে সিগারেটের ব্যবহার কমাতে সিগারেটের ওপর উল্লেখ্যযোগ্য হারে কর বাড়ানো প্রয়োজন। এজন্য অতিদ্রুত সব ধরনের তামাকজাত দ্রব্যের ওপর সুনির্দিষ্ট করারোপ পদ্ধতি প্রবর্তন করতে হবে।’

অনুষ্ঠানে আরেকটি গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির সহকারী অধ্যাপক নাজমুল হোসেন বলেন, ‘দেশে তামাকের ওপর বহুস্তরভিত্তিক জটিল কর ব্যবস্থা থাকায় বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন মাত্রায় কর আরোপ করা হয়। আর প্রত্যেক স্তরের সিগারেটে তুলনামূলক ভিত্তিমূল্য কম হওয়ায় এই কর ব্যবস্থায় ধূমপান নিয়ন্ত্রণে খুব একটা সফলতা পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া দেশে নি¤œস্তরের সিগারেটের দাম এবং করের মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে কম হওয়ায় তামাক কোম্পানিগুলো নি¤œস্তরের সিগারেটের বাজার বিস্তৃত করছে। ফলে সরকার প্রচুর পরিমাণে রাজস্ব হারাচ্ছে।’

গবেষণায় উঠে এসেছে, সিগারেট কোম্পানিগুলো বাজারে নি¤œস্তরে নতুন সিগারেটের ব্র্যান্ড চালুর ফলে সরকার ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রায় ২৭৩ কোটি টাকার রাজস্ব আয় হারিয়েছে। গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, যদি সরকার নি¤œস্তরে ১০ শলাকা সিগারেটের ভিত্তিমূল্য ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩৭ টাকার পরিবর্তে ৪৫ টাকা করত এবং এই স্তরে সম্পূরক শুল্কের হার ৫৫ শতাংশের পরিবর্তে ৬৫ শতাংশ করা হতো, তাহলে সরকার এক হাজার ৯৫৮ কোটি টাকার অতিরিক্ত রাজস্ব আহরণ করতে পারত।

অধ্যাপক ড. রুমানা হক বলেন, ‘বাংলাদেশকে তামাকমুক্ত করতে হলে প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে সুনির্দিষ্ট করারোপ করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, সিগারেটের মূল্য বাড়িয়ে এর ক্রয়ক্ষমতা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে নিয়ে যেতে হবে। একই সঙ্গে সিগারেটের ‘লুজ সেলিং’ বন্ধে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানান। যদি ১০ শতাংশ মূল্য বাড়ালে স্বল্প আয়ের মানুষের মাঝে ৯ শতাংশ পর্যন্ত ব্যবহারকারী কমে আসে, তাহলে সে অনুযায়ী কর নির্ধারণ করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। ২০৪০ সালের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী বাংলাদেশকে তামাকমুক্ত করতে হলে দ্রুত একটি যুগোপযোগী জাতীয় তামাক কর নীতি প্রণয়ন ও কার্যকর করতে হবে।

ড. নাসির উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘তামাক কোম্পানিতে সরকারের শেয়ার থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক। এই মুহূর্তে আমাদের সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত দেশ গড়ে তুলতে কাজ করে যেতে হবে।’ তিনি মনে করেন, উপস্থাপিত দুটি গবেষণায় সিগারেটের চাহিদা কমানো এবং সিগারেট থেকে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে তামাক কর নীতিতে কী কী কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে, সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা উঠে এসেছে। কর নির্ধারণের সময় বিষয়গুলো অনুসরণ করলে উল্লেখযোগ্য হারে রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি তামাকের ব্যবহারকারীর সংখ্যাও কমে আসবে।

অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণে কর বৃদ্ধি সবচেয়ে কর্যকরী পদক্ষেপ। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে কর উল্লেযোগ্য হারে বৃদ্ধি না হওয়ার অন্যতম কারণ তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপ।’ তিনি মনে করেন, উপস্থাপিত দুটি গবেষণার ফল কার্যকরীভাবে সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন।

সিটিএফকের লিড অ্যাডভাইজার মোস্তাফিজুর রহমান গবেষণা দলকে গুরুত্বপূর্ণ দুটি গবেষণা পরিচালনার জন্য অভিনন্দন জানান এবং আশা করেন, গবেষণায় উঠে আসা ফলাফল বাংলাদেশে তামাক নিয়ন্ত্রণ আন্দোলনে কার্যকরী ভূমিকা রাখবে।

অনুষ্ঠানে অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম তাহিন বলেন, ‘তামাক কোম্পানিগুলো নিজেদের ব্যবসার প্রসারের জন্য ভ্রান্ত ধারণা প্রচার করছে এবং সরকারের নানা নীতিতে হস্তক্ষেপ করছে।’ তিনি বলেন, ‘এই সুযোগটা তারা কীভাবে পায় সেটা আমরা অনেকেই জানি।’ তিনি মনে করেন, বর্তমান সরকারের তামাক নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট আন্তরিকতা রয়েছে। আমরা চাই সরকার আইন করে তামাক কোম্পানিকে নিয়ন্ত্রণ করবে। একইসঙ্গে তামাক নিয়ন্ত্রণে আইনগুলোয় প্রাসঙ্গিক পরিবর্তন করে তা বাস্তবায়ন করবে।

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে তামাক নিয়ন্ত্রণে কর্মরত বিশেষজ্ঞ, জনস্বাস্থ্যবিদ, বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তা, উন্নয়ন কর্মী, শিক্ষার্থী, সাংবাদিক এবং গবেষকরা উপস্থিত ছিলেন।