প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

জন্মদিনে শ্রদ্ধা ও স্মরণে আবুল মাল আবদুল মুহিত

মো. নজিবুর রহমান: আবুল মাল আবদুল মুহিত বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী হিসেবে সমধিক পরিচিত। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘকালীন অর্থমন্ত্রী। সফলতার দিক দিয়েও তিনি অন্যতম। তার ব্যক্তিত্ব, পাণ্ডিত্য ও পেশাদারিত্ব, অকপট বক্তব্য এবং সামাজিক জীবনের নানা ধরনের বিষয়ে সম্পৃক্ত থাকায় তিনি ছিলেন সর্বজনশ্রদ্ধেয়। তিনি অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে আমি তার মন্ত্রণালয়ের ইআরডির (অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের) প্রতিনিধি হিসেবে ২০০৯-২০১২ মেয়াদে নিউইয়র্কে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে কাজ করি।

১৯৮২ সালের বিসিএস পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আমি প্রশাসন ক্যাডার এ যোগদান করি। আমার প্রথম পোস্টিং হয় কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে। সেখানে কর্মরত থাকাকালে সিনিয়র সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনায় ও সিএসপি অফিসারদের গ্রেডেশন তালিকা পর্যালোচনার সময় আমি অন্যান্য কৃতী কর্মকর্তাদের সঙ্গে মুহিত স্যার সম্পর্কে জানতে পারি। এ সময় তার ‘The Deputy Commissioner in East Pakistan’ নামক গ্রন্থটি আমার হাতে পড়ে। জেলা প্রশাসন বিষয়ে সম্যক ধারণা লাভের জন্য এই গ্রন্থটি আমাকে বিশেষভাবে সহায়তা করে। ঢাকায় গেলে বুক সিন্ডিকেট থেকে নিজের জন্য একটি কপি সংগ্রহ করি, যা এখনও আমার কাছে আছে। পরবর্তী বিভিন্ন সময় তার লেখা বেশ কয়েকটি গ্রন্থ সংগ্রহ করি। বইগুলো খুবই তথ্যবহুল ও সুখপাঠ্য।

The Deputy Commissioner in East Pakistan গ্রন্থটি ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত হয় এবং প্রকাশক ছিল National Institute of Public Administration (NIPA),যা জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনামলে বিলুপ্ত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্টাডিজ ফ্যাকাল্টির বর্তমান পরিসরেই আগে ঘওচঅ স্থাপিত হয়েছিল। অনার্সে পড়ার সময় নিয়মিতভাবে ঘওচঅ লাইব্রেরিতে গিয়ে পড়াশোনা করতাম। আমার অন্যতম প্রিয় লাইব্রেরি ছিল এটি।

আমি ১৯৮৪-৮৭ মেয়াদে সিলেটে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে ঢাকায় চলে আসি। প্রায় এক বছর রাজউকের ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কাজ করার পর ১৯৮৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মাননীয় মন্ত্রীর কার্যালয়ে বদলি হই। তখন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কূটনীতিবিদ হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তার সঙ্গে আমার আনুষ্ঠানিক পরিচয় ঘটে ১৯৮৫ সালে সিলেটে। তখন আমি তার প্রটোকলের দায়িত্ব পালন করি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য অনেকেই আসতেন। মুহিত স্যারের ব্যাচমেট ও প্রিয়বন্ধু সাবেক সচিব এবং রাষ্ট্রদূত হেদায়েত আহমদ আসতেন, আরও আসতেন রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল হারুন আহমদ চৌধুরী প্রমুখ। মুহিত স্যার সম্পর্কে মাঝে মাঝে আলোচনা শুনেছি। তবে তিনি কখনও ওই সময়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আসেননি। পরে জেনেছিলাম তিনি জেনারেল এরশাদের বিরাগভাজন হওয়ায় দেশেই আসতে পারতেন না। বিভিন্ন বিষয়ে মতান্তর হওয়ায় মুহিত স্যার জেনারেল এরশাদের মন্ত্রিসভা থেকে হঠাৎ পদত্যাগ করেছিলেন। দেশ ছেড়েও চলে যান তিনি। বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘে বিভিন্ন কনসালটেন্সি করেন।

তিনি দেশে ফিরে আসেন ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুথানে জেনারেল এরশাদ সরকারের পতনের পর। সম্ভবত ১৯৯১ সালে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন সমাবেশে দেখেছি। সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে একটি হলে ঢুকতে গেলে ছাত্ররা তাকে বাধা দেয়। ছাত্রদের অভিযোগ ছিল তিনি স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন। আমি ১৯৯৫-৯৬ ও ২০০১-২০০৩ সালে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) যথাক্রমে সিনিয়র সহকারী সচিব ও উপসচিব হিসেবে কর্মরত থাকাকালে মুহিত স্যারের কার্যক্রম ও কর্মদক্ষতা সম্পর্কে বিশেষভাবে অবহিত হই। মুহিত স্যার অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে ইআরডির সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। তার সময়ে ইআরডির কার্যাবলির ওপর বিভিন্ন নীতিমালা প্রণীত হয়।

তবে মুহিত স্যারের সঙ্গে আমার প্রথম প্রফেশনাল সাক্ষাতের সুযোগ হয় ১৯৯৬ সালে। আমি তখন সপ্তম জাতীয় সংসদের (১৯৯৬-২০০১) স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর একান্ত সচিব (পিএস)। সংসদ অধিবেশন চলাকালে স্পিকার একদিন বললেন, সাবেক অর্থমন্ত্রী মুহিত সাহেব সংসদের প্রসিডিং দেখার জন্য আসবেন। তার জন্য ভিআইপি গ্যালারি-১ (স্পিকারের ডান দিকের গ্যালারি) পাস দিও। এভাবে মুহিত স্যার দু-তিনবার এসেছেন। আমি সার্জেন্ট অ্যাট্ আর্মসের নিরাপত্তারক্ষীদের দিয়ে তাকে বিশেষভাবে অভ্যর্থনা জানিয়ে আনার ব্যবস্থা করতাম। তিনি সরাসরি আমার অফিস কক্ষে এসে ধন্যবাদ দিয়ে ভিআইপি পাস নিয়ে যেতেন।

২০০৫ থেকে ২০০৭ সালÑএই তিন বছর লিয়েনে আমি ঢাকাস্থ ইউএনডিপি কার্যালয়ে সহকারী আবাসিক প্রতিনিধি তথা সহকারী আবাসিক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠভাবে অনুষ্ঠানের ব্যাপারে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট বিশেষভাবে সন্দিহান ছিল। অন্যদিকে বিএনপি-জামায়াত জোটের সরকার নির্বাচন কমিশন গঠন, ভোটের তালিকা প্রণয়ন প্রভৃতি বিষয়ে একতরফা সিদ্ধান্ত নিলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠে। বিশেষ করে ২০০৬ সালে পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে। এ সময় জাতিসংঘের উদ্যোগে বিভিন্ন প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করে। সফরকালে এসব প্রতিনিধিদল সরকারি ও বিরোধী দলের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে এএমএ মুহিত সিলেট-১ থেকে নবম জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়। ওই সরকারে এএমএ মুহিত অর্থমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হন। পরে ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসের সাধারণ নির্বাচনেও তিনি একই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং অর্থমন্ত্রী পদে বহাল থাকেন। এই দু মেয়াদে তিনি মহান সংসদে ১০টি বাজেট পেশ করেন। এএমএ মুহিত অর্থমন্ত্রী থাকাকালে আমি ২০০৯ সালে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে ইকোনমিক মিনিস্টার হিসেবে নিয়োজিত হই।

আমি নিউইয়র্কে কর্মরত থাকাকালে মুহিত স্যার বেশ কয়েকবার নিউইয়র্ক সফর করেন। কয়েকবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনেচলাকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে তিনি নিউইয়র্কে এসেছেন। এছাড়া এসেছেন অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ঊঈঙঝঙঈ) বিভিন্ন সভায় যোগ দিতে। ওয়াশিংটন ডিসিতে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (ওগঋ) বার্ষিক অধিবেশনে যোগদানের আগে অথবা পরেও তিনি নিউইয়র্ক সফর করতেন।

২০১১ সালে আমরা জাতিসংঘের চতুর্থ এলডিসি সম্মেলনের প্রস্তুতি প্রক্রিয়ায় ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলাম। জাতি সংঘের উন্নত, মধ্য আয় ও এলডিসি (স্বল্পোন্নত) গ্রুপভুক্ত সদস্য রাষ্ট্রের মিশনগুলো প্রস্তুতিপ্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেছিল। ২০১১ সালের ৯-১১ মে তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরে অনুষ্ঠিতব্য এলডিসি সম্মেলনের ঘোষণাপত্র ও কর্মপরিকল্পনার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নেগোসিয়েশন চলছিল। প্রস্তুতি পর্যায়ের একটি সভা চলাকালে মুহিত স্যার নিউইয়র্কে এলে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর একটি উচ্চ পর্যায়ের সভায় তাকে আমরা প্যানালিস্ট হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করি। ২০১১ সালের মে মাসে ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত এলডিসি সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল সক্রিয় অংশগ্রহণ করে। ওই সম্মেলনের ঘোষণাপত্র ও পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং গ্রহণের ব্যাপারে বাংলাদেশের এই সক্রিয় ভূমিকা আয়োজক দেশ তুরস্ক ও জাতিসংঘ কর্তৃক বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। মুহিত স্যার সেসময় কয়েকটি উচ্চ পর্যায়ের আলোচনায় প্যানেলিস্ট হিসেবে যোগদান করেন।

২০১২ সালের অক্টোবর মাসে আমি নিউইয়র্ক স্থায়ী মিশন থেকে বদলি হয়ে ঢাকায় ফিরে আসি। জনপ্রশাসন সূত্র থেকে ধারণা দেয়া হয়েছিল, আমাকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব অথবা এনবিআরের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হতে পারে। ঢাকায় ফেরার পর স্যারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। তিনি আমাকে ‘ওয়েলকাম ব্যাক’ বলে স্বাগত জানান। কিন্তু পদায়নের ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেননি। এর মধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় আমাকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব হিসেবে নিয়োগ দিতে প্রজ্ঞাপন জারি করে। আমার শুভাকাক্সক্ষীরা চাচ্ছিলেন, আমি যেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডির) দায়িত্ব পাই। এসময় আমি একদিন অর্থ সচিব (পরে গভর্নর) ও আমার ব্যাচমেট ফজলে কবিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাই। সেখানে থাকাকালে অর্থমন্ত্রী মুহিত স্যার ফোন করেন। তিনি জিজ্ঞেস করেন, আমি বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব হিসাবে কাজ করতে আগ্রহী কিনা। আমি বিনীতভাবে জানাই, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের নিয়োগটি আমার কাছে অধিকতর উপযোগী মনে হয়েছে। জনপ্রশাসনের আদেশের ধারাবাহিকতায় আমি ২০১২ সালের ১২ ডিসেম্বর থেকে পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা সচিব হিসেবে কাজ শুরু করি।

পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা সচিব হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে জানতে পারি, অর্থমন্ত্রী মুহিত পরিসংখ্যান ব্যবস্থার একজন জোরালো সমর্থক। পরিসংখ্যান সচিবের দায়িত্ব নেয়ার পর আমার আমন্ত্রণে মুহিত স্যার অনেকগুলো অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন। পরিসংখ্যান বিভাগে এলেই অথবা পরিসংখ্যান-বিষয়ক আলোচনাকালে মুহিত স্যার তার ব্যাচমেট ও বন্ধু সিএসপি অফিসার ড. একেএম গোলাম রব্বানীর ব্যাপারে স্মৃতিচারণ করতেন।

পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে আমি ২০১৪ সালের আগস্ট মাসে বদলি হই পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে। এর আগে ২০০৯ সালে আমি পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকও ছিলাম। বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের পর আমি বদলি হয়ে যাই অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের (আইআরডি) সচিব ও এনবিআরের চেয়ারম্যান হিসেবে। সরাসরি মুহিত স্যারের তত্ত্বাবধানে দায়িত্ব পালন। আমি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি বলেন, পরিবেশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে রাজস্ব আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে আমি খুবই উৎসাহিত হই।

আইআরডি ও এনবিআরের দায়িত্ব গ্রহণের পর আমি রাজস্ব ব্যবস্থাকে করদাতা ও ব্যবসাবান্ধব করার উদ্যোগ গ্রহণ করি। রাজস্ব ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য আমি ঘোষণা করি Zero tolerance against corruption, harassment, indiscipline and misconduct.ব্যবসায়ীদের জন্য আমি গ্রহণ করি ‘দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন’ রীতি। মিডিয়া, জনপ্রতিনিধি ও সব সরকারি-বেসরকারি কার্যালয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পার্টনারশিপ প্রতিষ্ঠা করি। এর ফলে রাজস্ব আহরণে বিশেষ প্রবৃদ্ধি হয় এবং আমরা ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিনটি অর্থবছরে শুধু রাজস্ব আহরণই নয়, বরং রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করি। এ সময় মাননীয় অর্থমন্ত্রী মুহিত স্যারের সঙ্গে সরাসরি কাজের অভিজ্ঞতা ছিল খুবই বিচিত্র। সেটি এখানে নয়, ভিন্ন পরিসরে আলোচনা করব।

মুহিত স্যারের সঙ্গে সচিব হিসেবে সরাসরি তিন বছর কাজ করার সময় আমরা অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে পরপর তিনটি অর্থবছরের (২০১৫-১৬, ২০১৬-১৭, ২০১৭-১৮) বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করি। পরে মুখ্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনকালেও লক্ষ করেছি বাজেট উপস্থাপনের দিন মন্ত্রিসভায় যে বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে এবং অর্থমন্ত্রী কালো ব্রিফকেস নিয়ে যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চেম্বারে যান, তখন প্রধানমন্ত্রী তার (মুহিত স্যারের) প্রতি কী রকম যতœশীল আচরণ করেন। বাজেট অধিবেশনের শেষ দিন অর্থাৎ ৩০ জুন সংসদে বাজেট পাস হওয়ার পর সন্ধ্যায় অর্থমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সংসদ সদস্যদের সম্মানে একটি বাজেট-উত্তর নৈশভোজের আয়োজন করা হয়। নৈশভোজটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এতে প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার ও প্রধান বিচারপতিসহ রাষ্ট্রের সব পর্যায়ের প্রতিনিধিরাও অংশগ্রহণ করেন। নৈশভোজটি নিয়ে মুহিত স্যারের অনেক মুনশিয়ানা ছিল। আমন্ত্রিত অতিথিদের তালিকা তিনি নিজে চূড়ান্ত করতেন। এর মধ্যে তার নির্বাচনী এলাকা সিলেটের গণ্যমান্য ব্যক্তি ও কর্মিবাহিনীর প্রতিনিধিদের তালিকাও থাকত।

আইআরডি ও এনবিআরে তিন বছর দায়িত্ব পালনের পর ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে আমাকে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব হিসেবে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য এবং তার সর্বশেষ বাজেট প্রণয়নকালে বিভিন্ন পরামর্শমূলক সভায় আমি যোগদান করি। মন্ত্রিসভার যে বৈঠকে বাজেটটি অনুমোদিত হয়, সেখানেও আমি উপস্থিত ছিলাম। অত্যন্ত সফলভাবে একনাগাড়ে ১০টি বাজেট উপস্থাপন করেছিলেন মুহিত স্যার। তিনি বাজেটের পরিধি ও ব্যাপ্তি বহুগুণে বাড়িয়েছিলেন। দেশ ও জাতির জন্য এটি ছিল তার এক বিশাল অবদান।

২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে মুহিত স্যার আর অংশগ্রহণ করেননি। মুহিত স্যার লেখালেখির কাজে ব্যস্ত থাকার পাশাপাশি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জš§শতবার্ষিকীর (মুজিববর্ষ) বিভিন্ন কমিটিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

২০২০ ও ২০২১ সালে কভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে মুহিত স্যারের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ হয়নি। মিডিয়ার মাধ্যমে তার শারীরিক অবস্থা, সিলেট সফর প্রভৃতি জানতাম। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তার বঙ্গবন্ধু ওপর বক্তৃতা প্রদানকালে তাকে ভার্চুয়ালি দেখি। পরে বিশিষ্ট ব্যাংকার ও আমাদের বন্ধু আনিস এ খানের একটি অনুষ্ঠানে মুহিত স্যারের জীবনীভিত্তিক সরাসরি সাক্ষাৎ অনলাইনে দেখতে পাই। বেশ পরে পূর্বাচলে জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের একটি অনুষ্ঠানে তার আরও দুই সহোদর ড. মবিন ও সুজন ভাইয়ের কাছ থেকে স্যারের খবর জানতে পারি। সেখানে ড. ফরাস উদ্দিন স্যারের সঙ্গে আলোচনায়ও মুহিত স্যারের প্রসঙ্গ আসে। আরও পরে মুহিত স্যার অসুস্থ হয়ে গ্রিন লাইফ হাসপাতালে একসময় ভর্তি হয়েছিলেন বলে মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পারি। আমার ছোট ছেলে ফারাবী রহমান এসব খবর সংগ্রহ করে আমাকে নিয়মিত জানাত। ২০২২ সালের ৩০ এপ্রিল অপ্রত্যাশিত সংবাদটি পাই, স্যার রাত ১২টা ৫৬ মিনিটে ইউনাইটেড হাসপাতালে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। ওইদিন সকাল বেলা ফারাবীসহ গুলশান আজাদ মসজিদে অনুষ্ঠিত জানাজায় অংশগ্রহণ করি। কয়েক দিন পর একই মসজিদে অনুষ্ঠিত দোয়া মাহফিলেও ফারাবীসহ যোগদান করে স্যারের রুহের মাগফিরাত কামনা করি। স্যারের গুণগ্রাহী এবং তার সঙ্গে কর্মরত সাবেক সহকর্মী অনেকের সঙ্গে দুদিনই দেখা হয়। দোয়া মাহফিলের বিভিন্ন বক্তাদের স্মৃতিচারণমূলক বক্তব্যে আপ্লুত হই। মুহিত স্যার কর্মের মাধ্যমেই বেঁচে থাকবেন মানুষের হƒদয়ে। পরম করুণাময় আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতবাসী করুন। আমিন।

সাবেক মুখ্য সচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যান

বর্তমানে চেয়ারম্যান, সিএমএসএফ