মত-বিশ্লেষণ

জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনে অবহেলা নয়

জিনাত আরা আহমেদ: সেদিন গফুর মিয়া যখন বয়স্ক ভাতার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে, তখন একে একে সবার নাম ডাকা হলো। কিন্তু তার নাম ডাকা না হলে তিনি ইউপি চেয়ারম্যানের কাছে বিষয়টা জানতে চান। চেয়ারম্যান বলেন, আপনি কি জন্ম নিবন্ধন সার্টিফিকেট জমা দিয়েছেন? গফুর মিয়া বলেন, এটা তো কখনও শুনিনি। তখন চেয়ারম্যান বললেন, জন্ম নিবন্ধন সনদ হলো একজন মানুষের পরিচয়। এটা হলো ব্যক্তির প্রধান আইনি স্বীকৃতি। এটা একজন মানুষের জন্ম, বয়স, পরিচয় তথা নাগরিকত্বের প্রমাণ। এর বিপরীতে সে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আইনি অধিকার পায়। নাগরিকের মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে হলে কিছু ক্ষেত্রে জন্ম নিবন্ধন সনদ প্রদর্শন বাধ্যতামূলক। জন্মসনদের মাধ্যমে নাগরিক সনদ, পাসপোর্ট ইস্যু, বিবাহ রেজিস্ট্রেশনসহ যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আইনগত ভিত্তি পায়। একইসঙ্গে মৃত্যুসনদ মানুষের মৃত্যু-পরবর্তী বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণপত্র। এর মাধ্যমে সম্পত্তির উত্তরাধিকার, জনশুমারি, দেশের স্বাস্থ্যগত তথ্য প্রভৃতি বিষয়ে ধারণা পাওয়া যায়। তাছাড়া জালভোট প্রতিহত করতে অর্থাৎ ভোটারের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণে মৃত্যুনিবন্ধন হওয়া জরুরি।

১৮৭৩ সালে ব্রিটিশ সরকার অবিভক্ত বাংলায় জন্ম নিবন্ধন-সংক্রান্ত আইন জারি করে। তখন সচেতনতার অভাবে অনেকেই জন্ম নিবন্ধনের আওতায় আসেনি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর প্রয়োজনীয়তা বাড়তে থাকে। পরবর্তী সময়ে ২০০৪ সালে সরকার জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন প্রবর্তন করে, যা ২০০৬ সাল থেকে কার্যকর হয়। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন- ২০০৪-এর ৪-ধারা অনুযায়ী নিবন্ধকের কার্যালয়ের অধীনে জন্ম গ্রহণকারী বা মৃত্যুবরণকারী অথবা স্থায়ীভাবে বসবাসকারীদের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন করা যায়। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভা কিংবা সিটি করপোরেশনের মেয়র বা মেয়র কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো কাউন্সিলর বা কর্মকর্তা, ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের এক্সিকিউটিভ অফিসার এবং দূতাবাসগুলোর ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জন্ম  ও মৃত্যু নিবন্ধন করে থাকেন। শিশুর জন্ম  নিবন্ধনের জন্য যে হাসপাতাল বা ক্লিনিকে জন্ম গ্রহণ করেছে সেখানকার ছাড়পত্র বা সার্টিফিকেট প্রয়োজন হয়। তবে এসএসসি সনদের ফটোকপি কিংবা আইডি কার্ডের ফটোকপি অথবা পাসপোর্টের ফটোকপি থাকলে হয়।

জন্ম সনদ হলো নাগরিকের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রামাণিক। বর্তমানে অনেকগুলো ক্ষেত্রে জন্ম নিবন্ধন সনদ প্রদর্শন বাধ্যতামূলক। যেমন এক. পাসপোর্ট ইস্যু; দুই. বিবাহ নিবন্ধন; তিন. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি; চার. সরকারি, বেসরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় নিয়োগদান; পাঁচ. ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু; ছয়. ভোটার তালিকা প্রণয়ন; সাত. জমি রেজিস্ট্রেশন; আট. ব্যাংক হিসাব খোলা; নয়. আমদানি ও রপ্তানি লাইসেন্স খোলা; দশ. গ্যাস, পানি, টেলিফোন ও বিদ্যুৎ সংযোগ প্রাপ্তি; এগারো. ট্যাক্স পেয়ার’স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (টিআইএন) প্রাপ্তি; বারো. ঠিকাদারি লাইসেন্স প্রাপ্তি;  তেরো. বাড়ির নকশা অনুমোদন প্রাপ্তি; চোদ্দো. গাড়ির রেজিস্ট্রেশনপ্রাপ্তি; পনেরো. ট্রেড লাইসেন্স প্রাপ্তি; ষোলো. জাতীয় পরিচয়পত্রপ্রাপ্তি।

যে কোনো জন্ম নিবন্ধনের ক্ষেত্রে পিতা ও মাতার নাম লিখতে হবে, এতে স্বামীর নাম লেখার সুযোগ নেই। বিবাহিত নারীদের স্থায়ী ঠিকানা বিবাহের আগে যে ঠিকানা ছিল, তা লিখতে হবে। বাংলা ও ইংরেজি সনদ একসঙ্গে প্রদান করা যাবে। কাগজের একপিঠে বাংলা ও অন্যপিঠে ইংরেজিতে লিখে সনদ দেয়া যাবে। আদালতের আদেশ ছাড়া জন্ম তারিখ পরিবর্তন করা যাবে না; কারণ আবেদনপত্রে লিখিত জন্ম তারিখ যথাযথভাবে প্রত্যায়িত হওয়ার পরই নিবন্ধিত হয়।

একই ব্যক্তির অনুকূলে একাধিকবার জন্ম নিবন্ধন করা যাবে না, এটা আইনের ২১ ধারা অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। তবে জন্ম সনদ একাধিকবার ইস্যুর প্রয়োজন হলে যে তারিখে সনদ প্রিন্ট করা হয়েছিল সনদ স্বাক্ষরে সেই তারিখ থাকতে হবে। জন্ম বা মৃত্যুর ৪৫ দিন পর্যন্ত কোনো ব্যক্তির জন্ম বা মৃত্যু নিবন্ধনে কোনো ফি লাগবে না। তবে এরপর থেকে ৫ বছরের মধ্যে নিবন্ধন ফি ২৫ টাকা এবং ৫ বছরের পর থেকে ৫০ টাকা ফি দিতে হবে। জন্ম তারিখ সংশোধনের জন্য আবেদন ফি ১০০ টাকা। জন্ম তারিখ ছাড়া পিতা বা মাতার নাম ঠিকানা প্রভৃতি তথ্য সংশোধনের জন্য আবেদন ফি ৫০ টাকা।

দেশের সব নাগরিকের বিষয়ে তথ্য জানতে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের কোনো বিকল্প নেই। প্রকৃতপক্ষে তথ্য-উপাত্তের মাধ্যমেই সরকার দেশের সব মানুষকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ নাগরিক সুরক্ষায় বিভিন্ন ধরনের সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে। এক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন আইডি ব্যবস্থা সমন্বিত করে ইউনিক আইডি প্রবর্তন করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ২০১০ সালে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নেতৃত্বে সিআরভিএস কার্যক্রম শুরু করে। দেশের নাগরিকদের জন্ম, মৃত্যু, মৃত্যুর কারণ, বিয়ে, তালাক, দত্তকসহ গুরুত্বপূর্ণ জনতাত্ত্বিক ঘটনা নিবন্ধন করা এবং তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে পরিসংখ্যান প্রস্তুত করার সমন্বিত প্রক্রিয়াকে সিভিল রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড ভাইটাল স্ট্যাটিসটিক্স (সিআরভিএস) বলা হয়, যার বৈশ্বিক লক্ষ্যÑ ‘মেক এভরি লাইফ কাউন্ট’।

টেকসই উন্নয়নের মূলকথা হলো, প্রতিটি ব্যক্তির মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি জীবনমানের উন্নয়ন। জন্মের সঙ্গে সঙ্গে নিবন্ধন না হওয়ায় যারা এসএসসি পর্যন্ত আসতে পারে না তাদের কোনো সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। ফলে একজন মানুষ যেসব জন্ম গত অধিকার নিয়ে জন্মায় পরে সেটা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। শুধু তাই নয়, পদে পদে ভোগান্তির শিকার হতে হয়। সঠিক সময়ে জন্ম নিবন্ধন না হলে যত দেরি হবে ততই খরচ বাড়বে, বাড়বে জটিলতা আর তথ্য উপাত্তও সঠিক হবে না। রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়, বাংলাদেশ স্থানীয় সরকারের উদ্যোগে অনলাইনে ২০১০ সাল থেকে খুব সহজেই ডিজিটাল পদ্ধতিতে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন করা হয়। সুনাগরিক হিসেবে আমাদের কর্তব্য হচ্ছে শিশু জন্মের সঙ্গে সঙ্গে জন্ম নিবন্ধন করা।

জন্ম সনদ শিশুর অধিকার রক্ষাকবচ। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের অনুচ্ছেদ ‘৭ অনুযায়ী ‘শিশুরজন্ম গ্রহণের পর জন্ম নিবন্ধীকরণ করতে হবে। শিশুর জাতীয়তা অর্জন, নামকরণ এবং পিতামাতার পরিচয় জানবার ও তাদের হাতে পালিত হবার অধিকার রয়েছে।’ প্রত্যেক মা-বাবার উচিত শিশুর জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে তার জন্ম নিবন্ধন সম্পন্ন করা। এটি ছাড়া একজন মানুষের পরিচয় চিহ্নিত হয় না। এ আইনি পরিচয় হলো মা-বাবার পক্ষ থেকে শিশুর জন্য সর্বোত্তম উপহার। একইসঙ্গে মৃত্যুর ৪৫ দিনের মধ্যে মৃত্যু নিবন্ধন করা উত্তরাধিকারীদের বিশেষ দায়িত্ব। নাগরিক অধিকার সুরক্ষায় প্রত্যেকের উচিত রাষ্ট্রস্বীকৃত এ আইনি পরিচয় সংরক্ষণে যতœবান হওয়া। তাহলে দুর্ভোগ আর ভোগান্তির শিকার হতে হবে না।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..