দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

জমি অধিগ্রহণের ছয় বছরেও ক্ষতিপূরণ পায়নি ৪৯৪ জন

মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র

ইসমাইল আলী: কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে নির্মাণ করা হচ্ছে এক হাজার ২০০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এজন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে এক হাজার ৪১৪ দশমিক ৬৫ একর। এছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্রটির জন্য ৮৪ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণে আরও প্রায় ২০০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। ২০১৪ সালে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। এতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার দুই হাজার ৮১৯ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে এখনও ৪৯৪ জন ক্ষতিপূরণ পায়নি।

ক্ষতিগ্রস্তদের সবাই এখনও ক্ষতিপূরণ না পাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। এজন্য ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের অর্থ দ্রুত বুঝিয়ে দিতে চিঠি দেয়া হয়েছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসককে। আর এ কাজে বিলম্ব হলে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) অর্থছাড় বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও করা হয়েছে।

ইআরডির আমেরিকা ও জাপান অনুবিভাগ থেকে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ বরাবর পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘আপনি নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে, মহেশখালী মাতারবাড়ী এলাকায় জাপান সরকারের ঋণ সহায়তায় মাতারবাড়ী ৬০০ী২ মেগাওয়াট আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কোল ফায়ারড পাওয়ার প্রজেক্ট বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। প্রকল্পটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পের ভ‚মি অধিগ্রহণ এবং ক্ষতিপূরণ প্রদানসংক্রান্ত সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায় যে, উক্ত প্রকল্পের সড়ক ও জনপথ অংশে ৬১৯ জন প্রত্যক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির মধ্যে অদ্যবধি ২৮৮ জন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ করা হয়েছে; ৩৩১ জন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে এখনও ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয়নি।’

গত ১১ জানুয়ারি ইস্যুকৃত ওই চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, ‘মাতারবাড়ী কোল ফায়ারড পাওয়ার প্রজেক্টে সিপিজিসিবিএল অংশে ক্ষতিগ্রস্ত ৮৭০ জন জমির মালিকদের মধ্যে ৮৪৯ জনকে ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয়েছে; অবশিষ্ট ২১ জন ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিককে এখনও ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয়নি। এছাড়া একই প্রকল্পের ১৩৩০ জন ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক/বর্গা চাষিদের মধ্যে ১১৮৮ ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয়েছে। অর্থাৎ ১৪২ জন ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক/বর্গা চাষিকে এখনও ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয়নি।’

চিঠিতে ইআরডি জানায়, ‘বর্ণিত প্রকল্পের ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ক্ষতিপূরণ প্রদান শতভাগ সম্পন্ন করার জন্য জাইকা হতে বারবার তাগিদ দেয়া হচ্ছে। আপনি হয়ত জানেন যে, ভ‚মি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হলে এবং ক্ষতিপূরণ প্রদানে বিলম্ব হলে প্রকল্প বাস্তবায়নে হবে; ফলে ঋণ চুক্তির নির্ধারিত মেয়াদে ঋণের অর্থ ব্যবহার করতে না পারে ঋণের অর্থছাড়েও বিলম্ব হবে, যা পরবর্তীতে ঋণ প্রাপ্তিতে জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে। বিষয়টির দ্রæত সমাধান প্রয়োজন।’

এক্ষেত্রে ভ‚মি অধিগ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিষয়টি দ্রæত নিষ্পত্তির জন্য জেলা প্রশাসকের ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়।

জানতে চাইলে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘ইআরডির চিঠির বিষয়টি আমার ঠিক জানা নেই। হয়তো চিঠি এখনও এসে পৌঁছায়নি। তবে কক্সবাজারে চলমান বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের ফলে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ প্রদানে আমরা সচেষ্ট আছি। মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিষয়টিও দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থা করা হবে।’

উল্লেখ্য, কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ী ও ধলঘাটা ইউনিয়নে ৬০০*২ মেগাওয়াট আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করছে কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিপিজিসিবিএল)। এ প্রকল্পের আওতায় আমদানিকৃত কয়লা লোড-আনলোড জেটি, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, টাউনশিপ নির্মাণ, স্থানীয় এলাকায় বিদ্যুতায়ন, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নির্মাণ এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে।

প্রকল্পটির পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন/সমীক্ষা ও সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সম্পাদন করা হয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ও জাইকার মধ্যে ২০১৪ সালের ১৬ জুন একটি ঋণচুক্তি সই করে। আর ২০১৭ সালের ২২ আগস্ট বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে ইপিসি ঠিকাদার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। যদিও ২০১৪ সালে প্রকল্পটির জমি অধিগ্রহণের শুরুতেই ক্ষতিপূরণের অর্থ লোপাটের অভিযোগ উঠে। এ নিয়ে কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে মামলাও করা হয়।

উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৩৫ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২৮ হাজার ৯৩৯ কোটি টাকা প্রকল্প সাহায্য হিসাবে জাইকা দিচ্ছে। অবশিষ্ট সাত হাজার ৪৫ কোটি টাকা বাংলাদেশ সরকার ও সিপিজিসিবিএলের নিজস্ব তহবিল থেকে সংস্থান করা হবে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..