প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

জমি সংকটে ব্যাহত চট্টগ্রামের অ্যালুমিনিয়াম শিল্পের সম্প্রসারণ

 

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: জমি সংকট ও প্লাস্টিক পণ্যের কারণে সম্প্রসারিত হতে পারছে না চট্টগ্রাম অ্যালুমিনিয়াম শিল্পের বাজার। সম্ভাবনাময় অ্যালুমিনিয়ামের তৈজসপত্র শিল্পটি এখন রুগ্ণ হয়ে পড়ছে। ফলে সংকটে আছেন এ শিল্পের উদ্যোক্তারা।

উদ্যোক্তারা জানান, চট্টগ্রামের অ্যালুমিনিয়াম শিল্পের ৯০ শতাংশ নগরীর মুরাদপুরের মির্জাপুল এলাকায় অবস্থিত। মির্জারপুল ছাড়াও নগরীর কালুরঘাট বিসিক শিল্পনগরী, মাদারবাড়ী, আতুরার ডিপো ও বায়েজিদ বোস্তামি এলাকায় রয়েছে হাতে গোনা আরও কিছু অ্যালুমিনিয়াম কারখানা। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মানুষের রুচির পরিবর্তন ঘটছে। একসময়কার কাঠ বা গ্রিল বাদ দিয়ে মানুষ এখন ঘরবাড়ি কিংবা সুউচ্চ দালানে অ্যালুমিনিয়াম ও কাচের দরজা-জানালা ব্যবহার হচ্ছে। দিন দিন এসব পণ্যের চাহিদাও বাড়ছে। গত দুই দশকে এসব এলাকায় গড়ে উঠেছে দশটির অধিক আবাসিক এলাকা। চারদিকে আবাসিক এলাকা গড়ে ওঠায় অ্যালুমিনিয়াম শিল্পগুলো সম্প্র্রসারিত হতে পারছে না। পাশাপাশি শহরে শিল্প স্থাপনের নেই তেমন জায়গা। ফলে জনবহুল এলাকা থেকে শিল্প-কারখানা সরিয়ে বিশেষায়িত শিল্প এলাকায় নিয়ে যাওয়ার দাবি উঠেছে অ্যালুমিনিয়াম শিল্প মালিকদের পক্ষ থেকে।

ব্যবসায়ীরা জানান, অ্যালুমিনিয়াম শিল্পের শুরুর দিকে মুরাদপুরে মির্জাপুল এলাকায় কোনো আবাসিক ভবন ছিল না। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগের সুবিধাজনক স্থান হওয়াতে মুরাদপুরের মির্জারপুল এলাকাকে ঘিরে অ্যালুমিনিয়াম শিল্পের দ্রুত বিকাশ ঘটে। গত কয়েক দশকে মুরাদপুর ও মির্জারপুল এলাকাকে ঘিরে আশপাশের এলাকায় সুগন্ধা আবাসিক এলাকা, কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকা, শুলকবহর আবাসিক এলাকা এবং পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকা গড়ে ওঠে। ফলে আবাসিক এলাকার মধ্যে হওয়াতে নতুন করে কারখানা সম্প্রসারিত করতে পারছেন না মালিকরা। এছাড়া কারখানার ধোঁয়া ও নিয়মিত শব্দদূষণের কারণে বাড়ছে জনদুর্ভোগ। ফলে ব্যবসায়ীরা নিজেরাই চাইছেন অন্যত্র কারখানা সরিয়ে নিতে। সরকারি বিভিন্ন দফতরে বিশেষ শিল্পাঞ্চলের জন্য সুবিধাজনক স্থানে জমি পেতে চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশের অ্যালুমিনিয়ামের বাজারের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার চট্টগ্রাম। চট্টগ্রামের চাহিদা পূরণ করে দেশের অন্য অঞ্চলেও যায় এখানকার তৈরি অ্যালুমিনিয়াম। এখানকার কারখানাগুলোয় প্রতিদিন গড়ে ২৫ টন অ্যালুমিনিয়াম পণ্য তৈরি হয়। পাইকারি টনপ্রতি দুই লাখ ৬০ হাজার টাকা হিসেবে প্রতিদিন ৬৫ লাখ টাকা ও বছরে ২৫০ কোটি টাকার পণ্য উৎপাদিত হয়। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রামে উৎপাদিত অ্যালুমিনিয়াম পণ্য সারা দেশের চাহিদা পূরণে উল্লেখযোগ্য অংশীদারত্ব থাকলেও ঢাকায় অ্যালুমিনিয়াম শিল্প গড়ে ওঠায় চট্টগ্রামের অ্যালুমিনিয়াম শিল্প কিছুটা পিছিয়ে পড়ে। অ্যালুমিনিয়াম কারখানাগুলোর  বেশিরভাগই পুরোনো অ্যালুমিনিয়াম, স্ক্র্যাপ, ওষুধের বোতলের ছিপি পুড়িয়ে তরল করে অ্যালুমিনিয়ামের তৈজসপত্র তৈরি করে। হাতে গোনা কিছু কারখানা বিদেশ থেকে অ্যালুমিনিয়াম তৈরির কাঁচামাল ইনগট আমদানি করে অ্যালুমিনিয়াম তৈরি করে। পুরোনো অ্যালুমিনিয়াম পোড়াতে ধোঁয়ার কুণ্ডলীর সৃষ্টি হয়। এছাড়া তৈজসপত্র তৈরিতে ব্যবহƒত মেশিনে উচ্চ শব্দের সৃষ্টি হয়।

চট্টগ্রাম অ্যালুমিনিয়াম শিল্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক একরামুল হক শেয়ার বিজকে বলেন, চারদিকে আবাসিক এলাকা গড়ে ওঠায় নতুন প্রতিষ্ঠান কিংবা কারখানা বাড়ানো যাচ্ছে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘অ্যালুমিনিয়ামের জিনিসপত্র তৈরিতে কারখানায় ধোঁয়া ও উচ্চ শব্দের সৃষ্টি হয়। এর কারণে আবাসিক এলাকার মানুষের অসুবিধা হয়। তাই আমরা কারখানাগুলোকে অন্যত্র সরিয়ে নিতে আগ্রহী। এর জন্য ৫০ একর জায়গার প্রয়োজন হবে। তবে আপাতত ২৫ একর জায়গার জন্য আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যবসায়ী জানান, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অত্যাধুনিক তৈজসপত্র তারা তৈরি করতে পারছেন না। সেজন্য বিদেশের বাহারি পণ্য দেশে ঢুকছে। আকর্ষণীয় হওয়ায় দেশের ভোক্তারা তা কিনছেন। আর কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। পরিবেশদূষণ ও আবাসিক এলাকার দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে অ্যালুমিনিয়াম শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীরা দ্রুত কারখানা সরিয়ে নিতে চাইলেও জমি সংকটের কারণে ক্ষুদ্র কারখানা মালিকরা এখনও ইতিবাচক সায় দিচ্ছে না।

চট্টগ্রাম অ্যালুমিনিয়াম শিল্প মালিক সমিতির সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হারুনুর রশিদ বলেন, নানা কারণে অ্যালুমিনিয়াম তৈজসপত্র শিল্পটি রুগ্ণ হয়ে পড়েছে। কিন্তু সম্ভাবনাময় পরিবেশবান্ধব এ খাতটিও দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছে। তিনি বলেন, ‘কাঁচামাল আমদানিতে আমাদের অধিক পরিমাণে শুল্ক দিতে হয়। তার ওপর বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম দফায় দফায় বাড়ানো হচ্ছে। এ কারণে পণ্যের দাম হু হু করে বাড়ছে।’ তিনি এ শিল্পগুলো বাঁচাতে কাঁচামাল আমদানির ওপর শুল্ক কমানো প্রয়োজন বলে মত দেন।

সামগ্রিকভাবে অ্যালুমিনিয়াম শিল্পোদ্যোক্তারা দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে বড় ভূমিকাও রাখছেন। এক্ষেত্রে উন্নত মানের পণ্যসামগ্রী উৎপাদনে তাদের ঈর্ষণীয় সাফলতাও রয়েছে। সরকারের সুনজর পেলে দেশের চাহিদা পূরণ করে এসব পণ্য বিদেশে রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভবÑএমনটাই মনে করেন এ খাতের উদ্যোক্তারা।

উল্লেখ্য, ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর বিহার ও মধ্যপ্রদেশ থেকে এসে কয়েকজন লোক বাংলাদেশে প্রথম অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি-পাতিল তৈরি শুরু করেন। মুক্তিযুদ্ধের পর এসব কারখানা চলে আসে বাঙালিদের হাতে। নতুন অনেক উদ্যোক্তাও যুক্ত হন এর সঙ্গে। বর্তমানে মুরাদপুরের মির্জারপুল ও আশপাশের এলাকায় ১৩০টির অধিক অ্যালুমিনিয়াম কারখানা রয়েছে। কারখানাগুলোতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় তিন হাজারের বেশি শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছে। অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি দরজা-জানালার কাঠামো, পার্টিশন, বিভিন্ন ধরনের আসবাবপত্রের কাঠামোজাতীয় পণ্যকে বলা হয় ‘অ্যালুমিনিয়াম প্রোফাইল’। জানা যায়, দেশের অভ্যন্তরে এ ধরনের পণ্যের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৩০ হাজার টন। টাকার অঙ্কে যা প্রায় এক হাজার ২০০ কোটি টাকার মতো। আর এর প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশই জোগান দিচ্ছে দেশীয় শিল্পগুলো।