সম্পাদকীয়

জয় হোক কভিড টিকার দূরীভূত হোক ভীতি

ভ্যাকসিন বা টিকা আধুনিক বিজ্ঞানের এক যুগান্তকারী আবিষ্কার। গত ১০০ বছরে রোগ প্রতিষেধক টিকার কারণে কোটি কোটি মানুষের জীবনরক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। একসময় গুটিবসন্ত ছিল সবচেয়ে ভয়ানক এক সংক্রামক ব্যাধি। এই রোগ যাদের হতো তাদের মধ্যে ৩০ শতাংশের মৃত্যু ছিল অবধারিত। এ রোগ থেকে আরোগ্য লাভকারীরা হয় অন্ধ হয়ে যেত, কিংবা বাকি জীবন দেহে বিশেষ করে অবয়বে মারাত্মক ক্ষতচিহ্ন বহন করতে হতো। টিকার ব্যাপক প্রয়োগ নিশ্চিত হওয়ার গুটিবসন্ত, ম্যালেরিয়া, হাম পোলিওসহ প্রাণঘাতী অনেক রোগ বিদায় নিয়েছে।

সত্তরের দশকে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থীদের টিকা দেয়া হতো। তখন অনেক শিশুশিক্ষার্থী জানালা দিয়ে পালিয়ে যেত। এ শিশুরা পরবর্তী সময়ে বাবা হয়ে শিশুসন্তানদের টিকাদান কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন টিকা নেয়ার জন্য। ওই সময় ‘গুটিবসন্ত রোগী পাওয়া গেলে পুরস্কার দেয়া হবে’Ñএমন পোস্টারও প্রচারিত হয়েছে।

আমাদের টিকাদান কর্মসূচি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ও প্রশংসিত। শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এবং সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে বাংলাদেশ প্রতি বছর জাতীয় পর্যায়ে বেশ কয়েকটি ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা হয়। এখন শিশুমৃত্যু (৫ বছরের নিচে) হ্রাস পেয়ে প্রতি হাজারে জীবিত জšে§ ৩৬-এ দাঁড়িয়েছে; ২০০৭ সালে এ সংখ্যা ছিল ৬৫। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে অসামান্য সাফল্যের জন্য বাংলাদেশ ২০০৯ সালে এবং ২০১২ সালে গ্যাভি অ্যাওয়ার্ড লাভ করে।

কভিড-প্রতিরোধী টিকা নিতে হলে আগে নিবন্ধন করতে হয়। নিবন্ধনে সাধারণ মানুষের তেমন সাড়া পাওয়া যায়নি। এরই মধ্যে রোববার দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। সাড়া না পাওয়ার অন্যতম কারণ হয়তো ভীতি। টিকা নিয়ে সাধারণ মানুষের এ ভীতি দূর করতে উদ্যোগ নেয়া জরুরি। জনসংখ্যার একটা বড় অংশ টিকা নিলে রোগের বিস্তার প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়। এর ফলে যাদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তারাও রোগের কবল থেকে রক্ষা পান। এর আগে আমরা যেসব প্রাণঘাতী রোগের সংক্রমণ থেকে মুক্ত হয়েছি, সেগুলোর ক্ষেত্রেও প্রথম দিকে সাধারণ মানুষের ভয়ভীতি ছিল। যথাসময়ে প্রতিরোধী টিকা দেয়া গেলে যে কোনো প্রাণঘাতী রোগ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। এ বিষয়ে আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সাফল্যে সাধারণ মানুষ অনুপ্রাণিত হবে।

নিরাপদে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নির্দেশনা ও যোগাযোগ উপকরণ তৈরি করতে হবে। সময়মতো তদারকির জন্য কারিগরি সহায়তা পেতে অভিজ্ঞ ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তা নেয়া যেতে পারে। সব টিকারই প্রাথমিক প্রতিক্রয়া আছে। চূড়ান্ত বিচারে কোনো টিকাই জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়।

টিকাদান কার্যক্রমের প্রতিদিনের কার্যক্রম সম্পর্কে ঊর্ধ্বতনদের তাৎক্ষণিক জানাতে হবে, যেন লক্ষ্যচ্যুত হলে দ্রুত তা সংশোধনে করা যায়। একটি টিকাদান কেন্দ্রে জরুরি সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে সে ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উপকরণ জরুরি ভিত্তিতে নিকটস্থ কেন্দ্র থেকে পাঠানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। টিকাদান কেন্দ্রে টিকাদান চলাকালে প্রশিক্ষিত কর্মীদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। যাতে কোনোভাবে টিকাগ্রহীতারা নিরুৎসাহিত না হন। পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে এবং সবার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। কার্যক্রমে স্বচ্ছতা দৃশ্যমান হলে সাধারণ মানুষ টিকা নিতে আগ্রহী হবে। গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচার করা যেতে পারে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..