সম্পাদকীয়

জরিপের প্রতিবেদনে তথ্যের যথার্থতা নিশ্চিত করুন

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপের যে ফল রোববার প্রকাশ করেছে, তার তথ্যে বেশ কিছু অসংগতি নিয়ে এরই মধ্যে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি সংস্থাটির দেওয়া তথ্যের ব্যাপারে জনমনেও যে দ্বিধা সৃষ্টি হবে, তাতে সন্দেহ নেই। কিছুদিন আগে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মোট জাতীয় উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধিতে ব্যক্তি-ভোগব্যয় ও বিনিয়োগের যে তথ্য তুলে ধরা হয়েছিল, তাতেও অসামঞ্জস্যের একই রকম অভিযোগ তুলেছিলেন অর্থনীতিবিদরা। এটি উল্লেখ করা হয়েছিল বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ নামক বিশ্লেষণেও। এমন কর্মকাণ্ড সংস্থাটিকে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পর্যায়ে শুধু প্রশ্নের মুখে ফেলবে না, এর প্রতি আস্থাহীনতাও বাড়বে মানুষের। আমরা মনে করি, জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন তথ্য উপস্থাপনে এসবের যথার্থতা বিবিএসের নিশ্চিত করা দরকার। তাতে দেশের প্রকৃত চিত্র যেমন উঠে আসবে, তেমনি প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ নেওয়াও হবে সহজু।

বিবিএসের উপস্থাপিত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেড় বছরে দেশে কর্মক্ষম মানুষ কমেছে দুই লাখ। ২০১০ ও ২০১৩ সালের এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে দেশে মোট বেকারের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছিল ২৬ লাখ। এটি এখনও একই রকম রয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। অর্থনীতিবিদদের মতে, ২০০৯ সালের পর থেকে বাংলাদেশ যে হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, তার সঙ্গে এ তথ্য সংগতিপূর্ণ নয়। তাদের এ যুক্তি খণ্ডন করা কঠিন বলেই মনে হয়। আমরা চাইবো, এর প্রতি সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হবে। দেশে কর্মক্ষম মানুষ হ্রাস এবং বেকার জনগোষ্ঠী ২০১০ সালের তুলনায় একই অবস্থায় থাকার পেছনে সংগত কোনো ব্যাখ্যা যদি থাকে, সেটাও উপস্থাপন করুন সংশ্লিষ্টরা।

আমরা জানি, শ্রম উৎপাদনের অন্যতম উপাদান। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমে বেড়ে উঠলেও বাংলাদেশের শিল্প-কারখানাগুলো এখনও শ্রমঘন। অত্যধিক জনসংখ্যায় ভারাক্রান্ত হলেও জাতীয় অর্থনীতিকে উন্নয়নের এ পর্যায়ে নিয়ে আসার পেছনে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অবদান যে রয়েছে, তা অস্বীকার করা যাবে না। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর যে অংশ বেকার রয়েছে, সন্দেহ নেই তারাও দেশের সম্পদ। কর্মসংস্থানের মাধ্যমে তাদের কর্মক্ষমতার সদ্ব্যবহার ও একে অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজে লাগানোর জন্যও থাকা চাই যথাযথ পরিকল্পনা। এজন্য যথাযথ তথ্যের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। অযথার্থ তথ্য এক্ষেত্রে সৃষ্টি করবে পরিকল্পনাগত দুর্বলতা। এটা কর্মহীন জনগোষ্ঠীর ভাগ্যে শুধু নয়, নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে জাতীয় উন্নয়নে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কর্মক্ষম জনসংখ্যা এখনও একটি ‘বড়’ উপাদান। এর ওপরই অনেকটা নির্ভর করে আবর্তিত হচ্ছে দেশটির অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি। এ দেশ এখন ভোগ করছে জনমিতির সুফল (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড)। জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞদের মতে, এ অবস্থা বেশিদিন থাকবে না। মনে রাখতে হবে, মানুষের কর্মক্ষমতা সব বয়সে সমান থাকে না। বিদ্যমান জনসম্পদকে কাজে লাগানোর উপযুক্ত সময় এটাই। জনগোষ্ঠীর যে অংশ এখনও কর্মহীন, তাদের কর্মসংস্থানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা হোক। কর্মক্ষমতা ও দক্ষতা অনুযায়ী কাজ জোগানো গেলে জনসম্পদের সদ্ব্যবহারে তা হবে সহায়ক। বর্তমান সময়ে শিক্ষাগত যোগ্যতার চেয়ে নিম্নস্তরের কাজে যোগদান করতে দেখা যাচ্ছে অনেককে। কর্মের সংকটের কারণেই যে এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। একজন মানুষকে শিক্ষিত করার জন্য রাষ্ট্র যে বিনিয়োগ করে, তার উপযুক্ত রিটার্নও প্রত্যাশিত। কোনো মানুষ অপেক্ষাকৃত নিম্নস্তরের যোগ্যতার কাজে যোগদান করলে সে বিনিয়োগের সদ্ব্যবহার সম্ভব হয় না। জনসম্পদের মেধা ও দক্ষতার এমন অপরিকল্পিত ব্যবহার কাম্য নয়। আমরা মনে করি, জনসংখ্যা ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী সম্পর্কে সঠিক তথ্য থাকলে এসব সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব স্বল্প মেয়াদে না হলেও দীর্ঘ মেয়াদে।

 

 

 

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..