দিনের খবর বাণিজ্য সংবাদ শিল্প-বাণিজ্য

জরুরি সেবা তালিকায় নেই কাস্টমস ও ভ্যাট!

রহমত রহমান: করোনার মধ্যে ২৪ ঘণ্টা কাস্টমস হাউস, বিমানবন্দর ও শুল্ক স্টেশনে সেবা দিচ্ছেন কাস্টমস কর্মকর্তারা। ঝুঁকি নিয়ে মাঠ পর্যায়ে সেবা দিয়ে দিচ্ছেন এ বিভাগের কর্মীরা। করোনা সংক্রমণ রোধে সরকার ঘোষিত বিধিনিষেধের মধ্যেও আমদানি-রপ্তানি সচল রাখতে একইভাবে সেবা দিচ্ছে এ বিভাগ। ওষুধ ও অন্যান্য শিল্পের ভ্যাট আদায়, হোটেল রেস্তোঁরা মনিটরিংসহ রপ্তানি উৎসাহে মাঠে জরুরি সেবা দিচ্ছেন ভ্যাট কর্মকর্তারা। কিন্তু কাস্টমস ও ভ্যাট জরুরি সেবার আওতায় না থাকায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বলে জানা গেছে।

কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিধিনিষেধের মধ্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিভিন্ন সময় প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছেন। এরপরও সরকার ঘোষিত প্রজ্ঞাপনে জরুরি সেবার তালিকা ও করোনার টিকা গ্রহণে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত জরুরি সেবাদাতার তালিকায় এ দুই বিভাগের নাম নেই। এতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।

জনপ্রশাসনের জারি করা প্রজ্ঞাপনে জরুরি পরিষেবার তালিকায় কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের নাম কেন নেইÑসে বিষয়ে কিছু জানা নেই এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের। অনেক কর্মকর্তা এ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। এনবিআরের হিসাবে, করোনা আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত একজন কাস্টমস কমিশনারসহ ৯ জন কর্মী মারা গেছেন। তাদের সংস্পর্শে এসে পরিবারের বহু সদস্য মারা গেছেন। আর আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় ৫ শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী। প্রতিদিন গড়ে আক্রান্ত হচ্ছেন ১০ জনেরও অধিক। রাজস্ব আদায় আর সেবা দিতে গিয়ে করোনায় বিপর্যস্ত কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগ।

কাস্টম হাউসের একাধিক কমিশনার শেয়ার বিজকে জানিয়েছেন, পণ্য শুল্কায়নসহ খালাস প্রদান এবং পণ্য রপ্তানি ও ইপিজেডের কা?র্যক্রম সার্বক্ষণিক সচল রাখতে দেশের সব কাস্টম হাউস, শুল্ক স্টেশন ২৪ ঘণ্টা খোলা রয়েছে। তারা জানান, পণ্য খালাস সরেজমিন তদারকি, প্রিভেন্টিভ কার্যক্রম ও চোরাচালান দমন, রামেজিংয়ের জন্য গভীর সমুদ্রে বিদেশি জাহাজে গমন ও তল্লাশি করা, গেট ডিভিশন ঝুঁকিপূর্ণ কর্তব্য পালন এবং বন্দরের সঙ্গে সমন্বয় করে পণ্যের দ্রুত খালাস করতে হয়। এতে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আক্রান্ত হন। তা সত্ত্বেও এ বিভাগকে জরুরি সেবার আওতায় রাখা হয়নি।

সর্বশেষ ৪ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে সাতদিনের ‘চলাচল নিষেধাজ্ঞা’ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। তাতে ১১টি বিধিনিষেধ দেয়া হয়। প্রজ্ঞাপনে জরুরি পরিষেবা হিসেবে ত্রাণ বিতরণ, স্বাস্থ্যসেবা, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, জ্বালানি, ফায়ার সার্ভিস, বন্দর, টেলিফোন ও ইন্টারনেট, ডাক সেবাসহ অন্যান্য জরুরি ও অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ও সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অফিসসমূহ, তাদের কর্মচারী ও যানবাহন নিষেধাজ্ঞার আওতাবহির্ভূত থাকবে বলে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু জরুরি সেবার তালিকায় কাস্টমস ও ভ্যাটের নাম নেই।

কমিশনাররা জানান, বিমানবন্দরগুলোতে প্রতিদিন শত শত বিদেশি যাত্রী হ্যান্ডলিং ও সুচারুভাবে পারাপার, যাত্রীসেবা দ্রুতকরণ, শুল্কযোগ্য পণ্য পরীক্ষণ ও শুল্কায়ন এবং চোরাচালন দমনে কাজ করতে হয়। এছাড়া বিমানবন্দরের শত শত জরুরি কার্গো ব্যবস্থাপনা করতে হয়। সব ক্ষেত্রে মানুষের সংস্পর্শে আসতে হয়। এভাবে প্রচণ্ড ঝুঁকিতে কাজ করছেন কাস্টমসের কর্মকর্তারা। রাজস্ব আহরণে জীবন বাজি রাখলেও জরুরি সেবার তালিকায় কাস্টমস বিভাগের নাম উল্লেখ নেই। ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিশেষ করে রাতে চলাচলে প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছেন।

একাধিক ভ্যাট কমিশনার শেয়ার বিজকে জানিয়েছেন, উৎসে ভ্যাট আদায়, ভ্যাট নিবন্ধন ও রিটার্ন দাখিল বাড়াতে একজন কর্মকর্তাকে প্রতি মাসে অন্তত দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠানে ছুটতে হচ্ছে। ভ্যাট নিবন্ধন, রিটার্ন দাখিল ও ভ্যাট জটিলতা নিরসনে কমিশনারেটগুলো ভ্যাট মেলা করছে। এতে সেবা দিয়ে গিয়ে করদাতাদের সংস্পর্শে এসে বহু কর্মকর্তা করোনা আক্রান্ত হচ্ছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, আমদানি-রপ্তানি বন্ধ হলে সাপ্লাই চেইনে ব্যাঘাত ঘটবে। ফলে পণ্যের দাম কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। আর রাজস্ব না হলে রাষ্ট্রের চাকা অচল হয়ে যাবে। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা করোনার চরম ঝুঁকির মধ্যে কাজ করছেন। ইতোমধ্যে কয়েকজন মারা গেছেন। আক্রান্তদের সংস্পর্শে এসে পরিবারের অনেকেই আক্রান্ত হচ্ছেন ও মারা যাচ্ছেন। এরপরও তারা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে পিছপা হচ্ছেন না। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, জরুরি সেবার তালিকায় নাম নেই। ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন সময়ে ঘরে-বাইরে বিভন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় বলে আমরা খবর পেয়েছি।

তারা আরও জানিয়েছেন, করোনাকালে ‘ফ্রন্টলাইন’-এ ঝুঁকি ও বিপদসংকুল অবস্থায় জীবনবাজি রেখে মহামারি সৃষ্ট বিপর্যয় মোকাবিলা, প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনার অন্যতম প্রদান রসদ রাজস্ব সেক্টরকে কৌশলে জরুরি সেবার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না করা হতাশার বিষয়। বিষয়টি নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে আলোচনা ও ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

এনবিআর সূত্রমতে, করোনার মধ্যেও আমদানি-রপ্তানি, ভ্যাট আহরণ থেমে নেই। থেমে নেই রাজস্ব আহরণের গতি। চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্য?ন্ত (জুলাই-মার্চ) ৯ মাসে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল দুই লাখ ২৭ হাজার ৭৬৪ কোটি ৩৬ লাখ টাকা (সাময়িক)। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে এক লাখ ৭৬ হাজার ৮৮ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। গত অর্থবছরের তুলনায় আহরণ প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ। এর মধ্যে কাস্টমস খাতে আদায় হয়েছে ৫৩ হাজার ৯৯৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এ খাতে আহরণ প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ১৭ শতাংশ, যা তিন বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ। এছাড়া ভ্যাট খাতে আদায় হয়েছে ৬৭ হাজার ৪ কোটি ৭৪ লাখ টাকা, প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৮৮ শতাংশ। আয়কর খাতে আদায় হয়েছে ৫৫ হাজার ৮০৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা, প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..