বাণিজ্য সংবাদ শিল্প-বাণিজ্য

জলবায়ু অর্থায়ন বরাদ্দে জলবায়ু পরিবর্তনকেই গুরুত্ব দিতে হবে

অ্যাকশনএইডের ওয়েবিনারে বক্তারা

নিজস্ব প্রতিবেদক: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আমরা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি। এর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় যে বাজেট বরাদ্দ করা হয়, তা বর্তমান আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় খুবই অপ্রতুল। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিবাসন ও লস অ্যান্ড ডেমেজের মতো বিষয়গুলো জলবায়ু বাজেটে অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তাছাড়া নারীর ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের বৈষম্যমূলক প্রভাব সামাজিক উন্নয়ন ও রাজনীতিতে নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টিকে খর্ব করে। কার্যকর জলবায়ু কর্মপরিকল্পনা তৈরিতে অবশ্যই লৈঙ্গিক বিষয়গুলোর দিকে মনোযোগী হতে হবে। জেন্ডারভিত্তিক বাজেট নিয়ে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের ধারণা আরও বাড়াতে হবে। জেন্ডার সংবেদনশীল জলবায়ু বাজেট নিয়ে গভীর জ্ঞান এবং তা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।

অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ কর্তৃক আয়োজিত ‘স্টেকহোল্ডার কনসাল্টেশন অন বাংলাদেশ ক্লাইমেট বাজেট’ শীর্ষক এক ওয়েবিনারে জলবায়ু বিশেষজ্ঞ, পরামর্শক, আলোচক, সাংবাদিক ও স্টেকহোল্ডাররা গতকাল এসব কথা বলেন।

এ ওয়েবিনারে প্যানেলিস্ট হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক ড. মিজান আর খান, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ফেরদৌসি বেগম ও অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির।

এ ওয়েবিনারে বিশেষজ্ঞরা মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে জলবায়ু বাজেট বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেন, যেখানে তারা জলবায়ু ব্যয়ের প্রাসঙ্গিকতা ও কার্যকারিতা বোঝার জন্য বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন। এ সময় গত বছরের তুলনায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের জন্য জলবায়ু বাজেট বরাদ্দ কমে যাওয়ায় তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের ২৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের জন্য আট শতাংশেরও কম বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছে, যা ২০২১-২২ অর্থবছরের মোট জাতীয় বাজেটের ৫৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ অর্থাৎ ২৫ হাজার ১২৪ কোটি টাকা। কিন্তু এর মধ্যে অপারেটিং বাজেটের অধীনে ১০ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন বাজেটের অধীনে ১৪ হাজার ৮৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। গত বছরের বরাদ্দের তুলনায় চলতি অর্থবছরের বাজেট সাত দশমিক ৪৮ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে সাত দশমিক ২৬ শতাংশ।

তারা বলেন, চলতি অর্থবছরে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের জন্য বাজেট বরাদ্দ হয় ৩৭৯ কোটি টাকা, যা গত বছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ১৯ কোটি ৮৩ লাখ টাকা কম। তাছাড়া আগের বছরের তুলনায় বাজেটে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে ৪২৭ কোটি টাকা এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে ১১৩ কোটি টাকা বরাদ্দ কমেছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে জলবায়ু অর্থায়ন কমে যাবে বলে আশঙ্কার কথা বলেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক ড. মিজান আর খান। তিনি বলেন, জলবায়ু অর্থায়নের ৮৫ শতাংশ বরাদ্দ আসে স্থানীয় খাত থেকে, তাই স্থানীয় খাতকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে নিজেদের টাকা কীভাবে খরচ হচ্ছে, তা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মধ্যে রাখতে হবে। ন্যাশনাল অ্যাডাপটেশন প্ল্যান স্থানীয় ও আঞ্চলিক ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করাই সমীচীন। জলবায়ু অর্থায়নের ক্ষেত্রে রাজনীতি প্রভাবক হিসেবে কাজ করে বলেও তিনি জানান। তিনি বলেন, জলবায়ু অর্থায়নের ক্ষেত্রে লস অ্যান্ড ডেমেজের বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে। তাছাড়া দেশের জনমিতির লভ্যাংশকে কাজে লাগানোর জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার যুবসমাজকে প্রশিক্ষণ দেয়ার মাধ্যমে জনশক্তি রপ্তানি করা যেতে পারে বলে তিনি অভিমত দেন। পাশাপাশি সুশীল সমাজকে এক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।

ফেরদৌসি বেগম বলেন, যে কোনো দুর্যোগে নারী ও শিশুরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই আমাদের চেষ্টায় আছে কীভাবে নারী ও শিশুবান্ধব বাজেট প্রণয়ন করা যায়। উঠান বৈঠক, কর্মশালা প্রভৃতির মাধ্যমে আমাদের সঙ্গে জনমত ও জনসম্পৃক্ততা বাড়ে। এ সময় তিনি সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে জলবায়ু সংকট নিরসনে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

ফারাহ কবির বলেন, এটা সত্যি আমরা এখন করোনা, জলবায়ু ও অর্থনীতিÑএমন ত্রিমুখী সংকটের মধ্য দিয়ে আমরা সময় পার করছি। অথচ এখনো জলবায়ু অর্থায়নে বিশ্বজুড়ে নেতৃত্ব, ঐকমত্য, পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন, বিনিয়োগ ও বরাদ্দের বড় ফাঁক রয়ে গেছে। যেকোনো প্রকল্পে শুরুতেই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মাথায় রেখেই এগোতে হবে। সবার আগে আমাদের উন্নয়ন নারী ও যুববান্ধব কি না, তা বিবেচনা করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আগামীতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় করে পরিকল্পনামাফিক কাজ করার জন্য অনুরোধ জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে আলোচকরা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ডিজিটাল রিস্ক ম্যাপিং, সূচক তৈরি, লিঙ্গ সংবেদনশীলতা এবং মানবাধিকারের বিষয়সহ জনগণের মতামতকে প্রধান্য দেয়ার কথা বলেন। তাছাড়া ঝুঁকি মোকাবিলায় অভিযোজন ও সাম্যাবস্থা নিশ্চিত করতে সবাইকে আরও বেশি মনোযোগী ও একটি যৌথ টাস্ক ফোর্সের মাধ্যমে নীতিনির্ধারকদের সমবেতভাবে কাজ করার জন্য তারা আহ্বান করেন।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..