মত-বিশ্লেষণ

জলবায়ু উদ্বাস্তু ও কর্মসংস্থান সংকট

রিয়াজুল হক

উদ্বাস্তু তাদের বলা হয়, যারা আবাসস্থল ছেড়ে অন্যস্থানে চলে যেতে বাধ্য হয়। আর জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে যখন মানুষ তার বসতবাড়ি ছেড়ে অন্যস্থানে বসবাসের জন্য চলে যায় বা যেতে বাধ্য হয়, তখন তাদের জলবায়ু উদ্বাস্তু বলে। বাংলাদেশে জলবায়ু উদ্বাস্তু বাড়ছে। তারা দেশের ভেতরে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় চলে যাচ্ছে। যখনই একটি জেলার ওপর বেশি চাপ পড়ে, তখন সেই জেলার ভ্রাম্যমাণ কিংবা দৈনিক খেটে খাওয়া মানুষের কর্মসংস্থানের ওপর বাড়তি চাপ পড়বেই। ধরে নিচ্ছি, খুলনা শহরে মোট পাঁচ হাজার রিকশাচালক আছে এবং কোনো রিকশাচালকেরই নিজস্ব কোনো রিকশা নেই। সবাই মালিকের কাছ থেকে এক দিনে ২০০ টাকার বিনিময়ে রিকশাভাড়া নিয়ে থাকে। অর্থাৎ প্রতিদিন খুলনা শহরে রিকশার মোট চাহিদা পাঁচ হাজারটি। খুলনার পার্শ্ববর্তী জেলার (যেমন, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট) অনেক মানুষ বর্গাচাষি কিংবা দিনমজুর। এখন এই দুই জেলায় যদি বন্যা হয় এবং তা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে জীবিকার তাগিদে অনেক মানুষ বেকার হয়ে পার্শ্ববর্তী খুলনা শহরে চলে আসবে। ধরে নিলাম, উদ্বাস্তু সেই সংখ্যা ১০ হাজার। এখন এই ১০ হাজার জলবায়ু উদ্বাস্তুর মধ্যে যদি দুই হাজার মানুষ রিকশা চালাতে আগ্রহী হয়, তাহলে পরিস্থিতিটা কেমন হবে? মোট রিকশার সংখ্যা পাঁচ হাজার এবং রিকশাচালকের সংখ্যা সাত হাজার (যেহেতু পূর্ববর্তী রিকশাচালক পাঁচ হাজার ছিল)। স্বাভাবিকভাবেই অন্য জায়গা থেকে যারা আসবে, তারাও সেই পূর্ববর্তী বিদ্যমান রিকশা থেকেই ভাড়া নিতে চাইবে। ফলে ভাড়া রিকশার চাহিদা বৃদ্ধি পাবে এবং অর্থনীতির জোগান-চাহিদা বিধি মোতাবেক, মালিকরা দিনপ্রতি রিকশাভাড়া বাড়িয়ে দেবে। এতে খুলনা শহরের পুরনো রিকশাচালকরা অনেকেই রিকশাভাড়া না পেয়ে বেকার হয়ে থাকবে। কাজ হাতে থাকবে না। সহজে যেটা বোঝা যাচ্ছে সেটা হলো, জলবায়ু উদ্বাস্তুর সমস্যার কারণে শুধু আক্রান্ত এলাকার মানুষ বেকার হচ্ছে না, অন্য শহরেও এর প্রভাব পড়ছে। এভাবে কর্মসংস্থানের প্রতিটা ক্ষেত্রেই জলবায়ু উদ্বাস্তুর কারণে প্রভাব পড়ে থাকে। কর্মক্ষম মানুষ কাজ পায় না। বেকারত্বের হারও দিন দিন বৃদ্ধি পাবে। আইএরও’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১০ সালের পর থেকে প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কা ও ভুটান বেকারত্বের হার কমিয়ে এনেছে। ভারতে স্থিতিশীল রয়েছে। তবে বেড়েছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নেপালে। শ্রমশক্তি জরিপে সপ্তাহে এক ঘণ্টা মজুরির বিনিময়ে কাজের সুযোগ না পাওয়া কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে বেকার হিসেবে গণ্য করা হয়।

বিভিন্ন কারণে জলবায়ু উদ্বাস্তু সমস্যা তৈরি হচ্ছে। যাদের নদীতে সব ডুবে গেছে, তারা তো নিজের এলাকা ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। লবণাক্ততার ক্ষেত্রে কিছুদিন হয়তো থাকতে পারে, পরে আর পারে না। কোনো এলাকায় বছরের পর বছর ধরে বৃষ্টি যদি না হয় সেখানে থাকতে পারে না। তখন বিপদগ্রস্ত মানুষেরা উদ্বাস্তু হয়ে যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট উদ্বাস্তুকেই বলা হয় জলবায়ু উদ্বাস্তু। বাংলাদেশে জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন গবেষক বিভিন্ন রকম সংখ্যা বলছেন। সেগুলো মোটামুটি ৬০ থেকে ৭০ লাখের মধ্যে। আবার অনেকের মতে, জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যা এরই মধ্যে ৮০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টারের হিসাব অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ছয় বছরে বাংলাদেশের ৫৭ লাখ মানুষ বাস্তুহারা হয়েছে। খুলনার কয়রা, দাকোপ ও পাইকগাছা, বাগেরহাটের মোংলা ও শরণখোলা, সাতক্ষীরার আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলাসহ সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকার প্রায় দুই লাখ নারী ও কিশোরীর প্রজনন স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে। তথ্যমতে, রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানার একটি বস্তির নাম ভোলাপাড়া। ভোলার বিভিন্ন এলায় যারা নদীভাঙনের শিকার, তারা এখানে এসে আশ্রয় নেন। এই বস্তিতে ভোলা থেকে জলবায়ু উদ্বাস্তু হয়ে আসা কয়েকশ পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। তাই এই বস্তিরই নাম হয়ে গেছে ভোলাপাড়া। তারা কয়েক বছর ধরে এই ভোলাপাড়ায় আসছেন।

বিশ্বব্যাংক বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব নিয়ে ‘টার্ন ডাউন দ্য হিট: ক্লাইমেট রিজিওনাল ইমপ্যাক্ট অ্যান্ড কেস ফর রেজিলিয়ান্স’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সম্পর্কে উল্লেখ করেছে, প্রতি তিন থেকে পাঁচ বছর পরপর বাংলাদেশের দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা বন্যায় ডুবে যাবে। এতে ফসলের ক্ষতি হওয়ার পাশাপাশি গরিব মানুষের ঘরবাড়ি বিনষ্ট হবে। তাপমাত্রা আড়াই ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে বন্যায় প্লাবিত এলাকার পরিমাণ ২৯ শতাংশ বাড়বে। ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরের আঘাতে বাংলাদেশের ৩৪ লাখ ৫০ হাজার মানুষের ঘরবাড়ি ডুবে যায়। ওই ঝড়ে ক্ষতির পরিমাণ ছিল ১২ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা। ২০৫০ সালের মধ্যে এ ধরনের ঘূর্ণিঝড় আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে তিন মিটার উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস নিয়ে উপকূলে আঘাত হানবে। এত ৯০ লাখ মানুষের বাড়িঘর ডুবে যেতে পারে। ২০৮০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উপকূলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৬৫ সেন্টিমিটার বাড়লে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৪০ শতাংশ ফসলি জমি হারিয়ে যাবে। ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডরে ৮০ হাজার টন ধানের উৎপাদন কম হয়েছিল। এর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল ১৩ হাজার ২৬০ কোটি টাকা।

অবস্থা এমন হলে সাধারণ কৃষিজীবী মানুষ কী করে গ্রামে থাকবে? তার উপার্জনের কোনো পথই খোলা থাকছে না। বাংলাদেশের উপকূলীয় মানুষ এরই মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে উদ্বাস্তুতে পরিণত হতে শুরু করেছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বের প্রায় দুই কোটি মানুষ ঘরবাড়ি হারাচ্ছে। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং জলাবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের শিকার। আর বাংলাদেশে প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অন্তত চার লাখ মানুষ ঢাকায় চলে আসে। আর দিনের হিসাব করলে প্রতিদিন কম করে হলেও দুই হাজার মানুষ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে রাজধানীতে আসে কাজ ও আশ্রয়ের সন্ধানে। বস্তিতে ঠাঁইপ্রাপ্ত শতকরা ৭০ ভাগই জলবায়ু উদ্বাস্তু। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বের সবচেয়ে হুমকিতে যে ১০টি শহর রয়েছে, তার মধ্যে একটি হলো ঢাকা। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা অক্সফাম বলছে, বাংলাদেশে নদীভাঙনের শিকার ৯০ শতাংশ নারী ও শিশু গ্রামীণ জনপদ থেকে শহরে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মতে, ঢাকায় আগত এসব জনসংখ্যার মধ্যে অধিকাংশই বস্তিতে বসবাস করে, যার ৭০ শতাংশ জনগোষ্ঠীই পরিবেশগত বিভিন্ন সমস্যা ভোগ করছে।

জলবায়ু পরিবর্তন এদেশের কৃষি খাতে ব্যাপক বিরূপ প্রভাব ফেলছে। মৌসুমি বৃষ্টিপাত ও নাতিশীতোষ্ণ তাপমাত্রার কারণে এদেশের প্রধান অর্থকরী ফসল হলো ধান। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র প্রভাবে দিনে দিনে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ধানচাষ। অসময়ে বন্যা, বৃষ্টি এবং প্রবল শিলাবৃষ্টির কারণেও ধানচাষ ব্যাহত হচ্ছে। বাংলাদেশের সোনালি আঁশ পাটের উৎপাদন কমে যাওয়ায় চাষিরা পাট চাষে বিমুখ হয়ে পড়ছেন। পাট চাষের ক্রমাবনতির জন্য বিশেষজ্ঞরা জলবায়ু পরিবর্তনকেই দায়ী করছেন। শীতকালের স্থায়িত্ব কমে যাওয়ায় রবিশস্যের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ পাওয়া যাচ্ছে না। আবার শৈত্যপ্রবাহের ফলে সরিষা, মসুর, ছোলাসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসবের ফলে উৎপাদনের হার হ্রাস পাচ্ছে, উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং কৃষকের মুনাফার হারও কমছে। লোকসান এড়ানোর জন্য অনেক কৃষকই তাদের পেশা বদল করে ফেলছেন। আমাদের দেশের কৃষকদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকার কারণে অন্য ভালো কোনো পেশায়ও নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করতে পারছে না। অনেক কৃষকই বেকার হয়ে পড়ছে।

জলবায়ু উদ্বাস্তুরা সবকিছু হারিয়ে আশ্রয় নেয় অজানা জায়গায়। সেখানে অতিকষ্টে চলে তাদের জীবন। জলবায়ু উদ্বাস্তু হওয়ায় একদিকে যেমন তারা ভিটেহারা হয়ে নতুন আবাসনের দিকে ঝুঁকছে, অন্যদিকে জীবন বাঁচানোর জন্য নতুনভাবে জীবিকা নির্বাহের পথ তৈরির কথা চিন্তা করতে হচ্ছে। এতে শুধু উদ্বাস্তুরা সমস্যার শিকার হচ্ছেÑসমস্যাটা শুধু তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। উদ্বাস্তুদের কারণে শহরে আগে থেকে অবস্থিত অস্থায়ী কর্মীদের ওপরও কাজের অনিশ্চয়তা দেখা দিচ্ছে। অনেকেই কম টাকায় কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে, কারণ উদ্বাস্তুর সংখ্যাধিক্যের কারণে শ্রমিকের সংখ্যা বেড়েছে। শ্রমিকের চাহিদাও হ্রাস পাচ্ছে। বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে উন্নত দেশগুলো অনেক প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবতা হচ্ছে, এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তারা তেমন আন্তরিক নয়। কোনো কোনো প্রতিশ্রুতি প্রায় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার বিষয়টি উদ্বেগজনক। এ অবস্থায় জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার স্বল্পোন্নত দেশ তথা বাংলাদেশের জনগণের উদ্বেগ বেড়েই চলেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য যেখানে বছরে মাথাপিছু যথাক্রমে ১৭ ও ৭.১ মেট্রিক টন করে কার্বন নিঃসরণ করে, সেখানে বাংলাদেশ করে মাত্র দশমিক চার মেট্রিক টন। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি আমরা বাংলাদেশের মানুষ। জলবায়ু উদ্বাস্তু সমস্যা যেন আমাদের উন্নয়নের গতিকে রোধ করতে না পারে, সেদিকে অবশ্যই নজরদারি রাখতে হবে। আর জাতীয় উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে কর্মসংস্থান।

দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান তৈরিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে সরকার মুজিববর্ষের উপহার হিসেবে ৬৯ হাজার ৯০৪টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে জমিসহ ঘর দিচ্ছে, যে উদ্যোগ সাধারণ মানুষের কল্পনারও বাইরে ছিল। এটা অসহায় গৃহহীন সাধারণ মানুষের জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি।

এখন আমাদের নির্দিষ্ট কিছু জেলা কিংবা এলাকার ওপর জনসংখ্যার চাপ যাতে বেড়ে না যায়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। অবশ্যই মনে রাখতে হবে, সব মানুষের কর্মসংস্থান কয়েকটি শহরের মাধ্যমে করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রতিটি জেলায় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা থাকতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কোনো জেলা কিংবা কোনো জেলার মানুষ যেন পিছিয়ে না পড়ে, কিংবা খাদ্যাভাবে যেন অন্যত্র চলে না যায়, সেদিক বিবেচনায় এনে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা ও কর্মপন্থা প্রয়োজন।

যুগ্ম পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..