প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

জলবায়ু পরিবর্তনে উপকূলীয় নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে

সৈয়দ মহিউদ্দীন হাশেমী, সাতক্ষীরা: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট নেতিবাচক প্রভাবের দিক থেকে বাংলাদেশ সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর একটি। পৃথিবীর সর্বদক্ষিণের নিন্মভূমিতে অবস্থিত প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশে ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বন্যা বছরজুড়েই লেগে থাকে। আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয় ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল। দেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ বাস করে এ উপকূলে, যাদের জীবিকার প্রধান বা একমাত্র উপাদান হচ্ছে কৃষি। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবের ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষি ও জীব-বৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দিনে দিনে এ অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের অনেক এলাকা পানিতে নিমজ্জিত হচ্ছে, আর সেইসঙ্গে বৃদ্ধি পাচ্ছে লবণাক্ততা। জলবায়ু পরিবর্তনে উপকূলীয় অঞ্চলে পানি ও কৃষির ওপরে বিরূপ প্রভাব পড়ার ফলে এ অঞ্চলের নারী ও শিশুরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির শিকার হচ্ছে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকে।

দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে বেড়িবাঁধ ভেঙে সাগরের নোনা পানি প্রবেশ এবং দীর্ঘ সময় ধরে আটকে থাকার কারণে জমিতে যেমন লবণাক্ততা বাড়ছে, তেমনি প্রকট হয়েছে সুপেয় পানির অভাব। পাশাপাশি উষ্ণায়ন ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে গতানুগতিক চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে, কমে যাচ্ছে খাদ্য উৎপাদন। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক রকমের ফসল উৎপাদন এখন আর সম্ভব হচ্ছে না।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে মাত্রাতিরিক্তভাবে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে নারীরা দৈনন্দিন গৃহস্থালি কাজ, যেমন গোসল করা, কৃষিকাজ, গবাদিপশু পালন, চিংড়ির পোনা ধরাসহ অন্যান্য অর্থনৈতিক কাজে লবণাক্ত পানি ব্যবহারের কারণে লিউকোরিয়াসহ সাধারণ পানিবাহিত রোগ এবং চর্মরোগের সংক্রমণে বেশি আক্রান্ত হয়।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির দৈনিক পাঁচ গ্রামের বেশি লবণ খাওয়া উচিত নয়। কিন্তু উপকূলীয় এলাকায় জনগোষ্ঠীকে দৈনিক ১৬ গ্রামের অধিক লবণ খেতে হচ্ছে, যা দেশের অন্য এলাকার জনগোষ্ঠীর তুলনায় অনেক গুণ বেশি।

সম্প্রতি আইসিডিডিআর,বি’র এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা বলেছেন, খাবার পানির সঙ্গে যে পরিমাণ লবণ নারীদের দেহে প্রবেশ করছে, তার প্রভাবে দেশের অন্য অঞ্চলের তুলনায় উপকূলীয় অঞ্চলের নারীদের গর্ভপাত বেশি হয়। অতিরিক্তি লবণাক্ত পানি গ্রহণের ফলে নারীদের জরায়ু রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, গর্ভকালীন খিঁচুনি, গর্ভপাত, এমনকি অপরিণত শিশু জন্ম দেয়ার হার বেড়েছে। ফলে এ অঞ্চলের নারীর প্রজনন ক্ষমতা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে।

২০১২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত পরিচালিত এ গবেষণায় দেখা যায়, সমুদ্র উপকূলের ২০ কিলোমিটার এলাকা এবং সমুদ্রতটরেখা থেকে সাত মিটার উচ্চতায় যারা বসবাস করে, তাদের গর্ভপাতের ঝুঁকি অন্যদের চেয়ে ১ দশমিক ৩ গুণ বেশি।

এছাড়া উপকূলীয় অঞ্চলে যেসব নারী চিংড়ি রেণুপোনা সংগ্রহের কাজ করে, তাদেরও প্রজনন স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। মাত্রাতিরিক্ত লোনা পানির দৈনন্দিন ব্যবহারের ফলে জরায়ুসংক্রান্ত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসকারী নারীরা। সেজন্য অল্প বয়সেই জরায়ু কেটে ফেলতে বাধ্য হচ্ছে এ এলাকার অনেক নারীই। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা করানোর মতো অর্থনৈতিক সচ্ছলতা না থাকার কারণে বেশিরভাগ প্রান্তিক নারী জরায়ু কেটে ফেলাকেই স্থায়ী সমাধান মনে করছে। কিন্তু এর ফলে তাদের শারীরিক, মানসিক ও সাংসারিক সমস্যা আরও বেড়ে যাচ্ছে। এতে অনেকের সংসারই ভেঙে যায়।

২০১৮ সালে ‘সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাবে লবণাক্ততার প্রভাব’ শীর্ষক একটি গবেষণায় বলা হয়, উপকূলীয় অঞ্চলে নারী ও কিশোরীরা মাসিকের সময় ব্যবহƒত কাপড় ধুয়ে আবারও সেটি ব্যবহার করে এবং লবণাক্ত পানিতে গোসলসহ দৈনন্দিন কাজের কারণে তাদের জরায়ুসংক্রান্ত রোগের উপস্থিতি অনেক বেশি।

উপকূলীয় এলাকার নারীদের গর্ভপাতের প্রধান কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে লবণাক্ত পানি বৃদ্ধিই দায়ী। ইউএনডিপির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গর্ভবতী নারী ও কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কম বয়সীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্ধকার এ যাত্রায় নিরাপদ থাকছে না গর্ভের শিশুও। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব এখন অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে।