মত-বিশ্লেষণ

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় করণীয়

জুবায়ের আল মাহমুদ: গত দুই দশক ধরে বিশ্ববাসী যে বিষয়টি নিয়ে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত এবং ভাবছে সেটি হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের ভয়াবহতা। আমরা সবাই জানি, আবহাওয়া এবং জলবায়ুর মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। প্রকৃত অর্থে আবহাওয়া হলো তাৎক্ষণিকতা। আর জলবায়ু হলো ৩০ থেকে ৩৫ বছরের আবহাওয়ার গড়পড়তা। আরও সহজ করে বললে, আবহাওয়া হলো এখনকার সময় আর জলবায়ু হলো বেশ কয়েক বছরের গড় আবহাওয়ার ফল। আগামী ২০-২৫ বছর পর তাপমাত্রা কতটুকু বাড়বে বা কমবে, ঝড়বৃষ্টির পরিমাণই বা কতটুকু বাড়বে বা কমবে মূলত এটাই হলো জলবায়ু এবং সেই সময় আবহাওয়া যতটুকু পরিবর্তন হবে সেটাই হলো জলবায়ু পরিবর্তন।
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বিশ্বের যেসব দেশ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে তার মধ্যে বাংলাদেশ এক নম্বরে। মূলত, ভৌগোলিক অবস্থান ও ব-দ্বীপপ্রধান দেশ হওয়ায় বাংলাদেশ বিশ্বের অধিক ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় শীর্ষে। তাই দেশের প্রতিটি মানুষকে জলবায়ু ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকির বিষয়গুলোর ওপর ন্যূনতম একটা জ্ঞান রাখা জরুরি। তাই এ লেখাটির মাধ্যমে আমি পাঠকদের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি এবং সমস্যা সমাধানের উপায় সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করব।
ইদানীং বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ প্রায়ই নানা সময়ে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, দাবদাহ বা খরার মতো মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হচ্ছে। জাতিসংঘের ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি’র) তথ্য বলছে, বিশ্বের ছয়টি দুর্যোগপ্রবণ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। আগামী শতকগুলোয় বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্তে বৈশ্বিক উষ্ণতা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির জন্য বন্যা, খরা, সাইক্লোন ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির পূর্বাভাস রয়েছে।
এছাড়া জলবায়ু-সংক্রান্ত আইপিসিসির বিভিন্ন প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি ঠিক কতটা সে সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। বিশ্লেষিত তথ্য বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১০ ও ২০৭৫ সালের মধ্যে ২৭ শতাংশ বাড়তে পারে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে হিমালয় ও অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের বরফ গলার হারও অব্যাহতভাবে বাড়তে থাকবে। এর ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে এবং প্লাবিত হবে কমপক্ষে এক লাখ ২০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা।
এছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ১৪ শতাংশ এলাকা বন্যায় প্লাবিত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে সাইক্লোনের মাত্রা ও গতি ৫ থেকে ১০ শতাংশ বাড়বে। প্রকৃতঅর্থে জলবায়ু পরিবর্তনের এমন বিরূপ প্রভাব সামগ্রিকভাবে দেশের মূল অর্থনীতির ক্ষতিসাধন করবে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ খাত হবে কৃষি। উচ্চ তাপমাত্রায় আউশ, আমন ও বোরো ধানের ভালো ফলন হবে না।
ধারণা করা হচ্ছে, ২১০০ সাল পর্যন্ত দেশের গড় তাপমাত্রা এক দশমিক চার ডিগ্রি থেকে দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে। বাংলাদেশের তাপমাত্রা ২১০০ সালে যদি ১ ডিগ্রিও বাড়ে, তবে ধানের মোট উৎপাদনের প্রায় ১৭ এবং গমের উৎপাদন ৬১ শতাংশ কমে যাবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার কারণে অব্যাহতভাবে বাড়ছে মাটির লবণাক্ততা। এরই মধ্যে লবণাক্ত এলাকায় সব ধরনের ফসলের ফলন কমে গেছে। বিশেষত পটুয়াখালী জেলায় ধানের ফলন জাতীয় গড়ের চেয়ে প্রায় ৪০ এবং নওগাঁর তুলনায় ৫০ শতাংশ কম। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বছরে প্রায় ২০ লাখ টন ফসল নষ্ট হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত আরেকটি খাত হচ্ছে বনাঞ্চল। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, উচ্চ তাপমাত্রা ও ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বৃদ্ধির ফলে দেশের বনজসম্পদ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তেমনি বহু উঁচু বনভূমি এলাকার মাটি ক্ষয় ও এর গুণগতমানও হ্রাস পাবে। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সুন্দরবনে একদিকে লোনা পানির অনুপ্রবেশ বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে মিঠাপানি সুন্দরবন পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছে না। এভাবে যদি চলতে থাকে তাহলে সুন্দরবনের গাছপালা খাবারের অভাবে ধীরে ধীরে মারা যাবে। আর সুন্দরবন যদি ধ্বংস হয় তাহলে ধ্বংস হবে পুরো জীববৈচিত্র্য।
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য বনাঞ্চল বাড়াতে হবে, অল্প জায়গার বহুল ব্যবহার অর্থাৎ বহুতল ভবন এবং সবুজ শিল্প-কারখানা স্থাপন করতে হবে। শিল্প-কারখানার বর্জ্য পরিশোধন নিশ্চিত করে তা নির্দিষ্ট স্থানে জমা রাখতে হবে এবং এই বর্জ্য রিসাইকেলিং করে কীভাবে অন্য কাজে লাগানো যায় সেই পন্থা উদ্ভাবনের দিকেও নজর দিতে হবে।
এছাড়া কলকারখানা, গাড়ি, মোটরসাইকেল, ইটভাটাসহ নানা জায়গা থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। গ্রিনহাউজ ইফেক্টের ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা অব্যাহতভাবে বাড়ছে। তাই এখন থেকে সুবজ কারখানা গড়ার উদ্যোগ যেমন নিতে হবে, তেমনি যেসব অফিস আদালত বা কলকারখানা বর্তমানে রয়েছে সেগুলোকেও সবুজ করতে হবে। পাশাপাশি প্লাস্টিকজাতীয় বর্জ্য এবং পলিথিনের ব্যবহার কমাতে হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাড়াতে হবে সৌরশক্তির ব্যবহার। ট্যানারি বর্জ্যরে পরিশোধন নিশ্চিত করতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে ট্যানারির বর্জ্য যেন কোনোভাবেই খাল-বিল, নদী-নালায় গিয়ে না পড়ে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় দেশজুড়ে বৃক্ষরোপণ করতে হবে এবং বৃক্ষরোপণে সাধারণ মানুষকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করতে হবে। সুন্দরবন পরিবেশকে যেমন কার্বনমুক্ত করছে একই সঙ্গে ঘূর্ণিঝড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবেও কাজ করছে। তাই উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভের সংরক্ষণে আরও বেশি জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে।
আগাম সতর্কতার ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে। সেই সঙ্গে উপকূলীয় অঞ্চলগুলোয় বাড়াতে হবে আশ্রয়কেন্দ্র। যেন ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানলে মানুষ সেখানে আশ্রয় নিতে পারে। পাশাপাশি বজপাতের হাত থেকে রক্ষার জন্য কৃষিজমি সংলগ্ন স্থান বা খোলা মাঠে বজ পাত প্রতিরোধক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সেই সঙ্গে জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ রেডিও, টেলিভিশনে সংশ্লিষ্ট প্রামাণ্যচিত্র প্রচার করে মানুষকে সচেতন করতে হবে।

পিআইডি প্রবন্ধ

 

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..